২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কেন এই ভারতীয় চ্যানেল প্রীতি

অন্তত ২৩টি টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচারে রয়েছে আমাদের। অপেক্ষায় রয়েছে আরও প্রায় ১৮টি চ্যানেল। এর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি সংবাদভিত্তিক চ্যানেল ছাড়া সবটাতেই প্রচারিত হয় প্রচুর পরিমাণে নাটক, সিনেমাসহ অন্যান্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান। তবুও কেন দর্শক ভারতীয় চ্যানেলের প্রতি এতটা মনোযোগী? প্রশ্নটা সহজ। উত্তরটা কঠিন। খুব কঠিন। সেই কঠিন উত্তরটাই খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন সজীব রহমান

বাইরের দেশের টিভি চ্যানেলগুলোর একটা নির্দিষ্টতা আছে, নিজস্বতা আছে। যেমন- সিনেমা, নাটক, তথ্যচিত্র, খেলা, সংবাদ, গানসহ প্রত্যেকটি বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা চ্যানেল। অথচ, আমাদের অধিকাংশ চ্যানেলগুলোই পাঁচমিশালি। দুুপুর ১-২-৩-৪টা বাজলে চ্যানেল নাড়াচাড়া করতেই দেখা যায় প্রায় সবগুলোতেই একযোগে খবর শুরু হয়ে গেছে। যখন-তখন বিরক্তিকর টকশো তো আছেই। কার-ই বা সহ্য হয় এসব?

তবুও যদি রিমোট ঘোরাতে ঘোরাতে কোন একটা অনুষ্ঠান পছন্দও হয় কারোর, বিজ্ঞাপনের আধিক্যে দেখা হয় না তা আর। যেই হারে বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয় একেকটা চ্যানেলে, তাতেই চরম বিরক্তি ধরে যায় দর্শকদের। ‘চ্যানেলগুলোর অবস্থা এখন অনেকটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে নাটক দেখানো হয়।’ বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিউল আলম ভূঁইয়া।

শুধু তা-ই নয়, নির্মাণ এবং অভিনেতাদের মানের দিকেও আঙ্গুল তুললেন তিনি। বললেন, ‘বাংলাদেশে যে হারে নাটক তৈরি হচ্ছে, সে হারে অভিনেতা বা কলাকুশলী তৈরি হয়নি।’ প্রবীণ অভিনেতা এবং নির্মাতা মামুনুর রশিদও জানালেন, ‘গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রচুর নতুন টেলিভিশন চ্যানেল যাত্রা শুরু করেছে এবং নাটকের পরিমাণও বেড়েছে। কিন্তু সেই বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মান তো বাড়েইনি, বরং আরও নেমে গেছে।’ তার মানে ভারতীয় নাটকের মান ভাল আমাদের থেকে? ‘হ্যাঁ.. ভারতীয় নাটকে যারা অভিনয় করে, তাদের একটি গ্রুমিং সেন্টার আছে। কিন্তু, বাংলাদেশে এমন কোন ব্যবস্থা নেই। এছাড়াও যারা ভাল অভিনয় করে, তাদের অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। টাকাও বেশি দিতে হয় বলে ভাল অভিনেতাদেরও নির্মাতারা নিচ্ছে না।’ বলছিলেন মামুনুর রশিদ।

এ বিষয়ে অভিনেত্রী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ওয়াহিদা মল্লিক জলি জানালেন, ‘ওরা সিরিয়ালের একটি ভাষা বের করেছে। ওদের অভিনয়টা একটু উচ্চগ্রামের, কথাগুলো উচ্চস্বরের.. মোদ্দাকথা, বিস্তৃত একটা সুর আছে ওদের নাটকে। বাঙালী কিন্তু এই সুর ভালবাসে। ওরা যেভাবে গল্পটা বলতে পারে, তাতে প্রতি মুহূর্তে কৌতূহল উদ্রেক হয়।’

তবুও কিছু কিছু দর্শক দেশীয় নির্মাণই দেখতে ভালবাসেন। সেই ভালবাসাটাও ত্যাগ করতে হয় প্রধানত বিজ্ঞাপনের কারণেই। দর্শকদের এত বিরক্তি সত্ত্বেও চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপনের এই আধিক্য কেন? বাংলাভিশনের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান শামীম শাহেদ জানালেন, ‘ভারতীয় বাংলা চ্যানেলগুলো দেখার জন্য আমাদের অথবা কেবল অপারেটরদের একটি কার্ড কিনতে হয়। সেই কার্ডের টাকাটা পায় চ্যানেলের মালিক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আমাদের আয়ের অন্য কোন উৎস নেই বিজ্ঞাপন ছাড়া।’ টেলিভিশন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক শাইখ সিরাজ বললেন, ‘একটি প্রোগ্রামের মোট সময়ের ৩৩ ভাগ বিজ্ঞাপন প্রচার না করলে ব্রেক ইভেন পয়েন্টে আসতে পারবে না।’ অর্থাৎ, এক ঘন্টার প্রোগ্রামে বিজ্ঞাপন হতে হবে কমপক্ষে ৩৩ মিনিট!

শুধুমাত্র এই অতিরিক্ত বিজ্ঞাপনের কারণে হতাশ হয়ে নাটক নির্মাণই ছেড়ে দিয়েছেন অমিতাভ রেজা। বললেন, ‘টেলিভিশন ফিকশন আমি বন্ধ করে দিয়েছি। এখন আর নাটক নির্মাণের প্রতি কোন আগ্রহ নেই।’

এ সময়কার দর্শকপ্রিয় এই টেলিফিল্ম ও বিজ্ঞাপন চিত্র নির্মাতা আরও জানালেন, ‘টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও এখন আর মানসম্মত নাটকের প্রতি ততটা আগ্রহী নয়। তারা এখন টকশো এবং সংবাদের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।’

তিনি মনে করেন, ‘পণ্য বাজারজাত করার জন্য বিজ্ঞাপন দরকার। তার একটি মাধ্যম টেলিভিশন। অন্যদিকে, রেভিন্যু সংগ্রহের জন্য টেলিভিশনেরও বিজ্ঞাপন দরকার। কিন্তু, তার তো একটা নীতিমালা থাকতে হবে!’

এই নীতিমালার বিষয়ে গত ২৫ জুলাই রাজধানীতে বিবিসি সংলাপে দর্শকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী জানালেন, ‘বিজ্ঞাপন প্রচার করার একটা নিয়ম আছে। এটা আমাদের এখানে পালন করা হয় না। এজন্য আমরা সম্প্রচার নীতি করেছি এবং আইন করতে যাচ্ছি। আগামী ছয় মাসের মধ্যে যে সম্প্রচার আইন হবে, সেখানে এক ঘণ্টায় কতটুকু বিজ্ঞাপন দেখানো হবে, সে বিধানটা থাকবে। সম্প্রচার কমিশন সেটা নিয়ন্ত্রণ করবে। যদি কোন চ্যানেল এ আইন অমান্য করে, তাহলে সেই চ্যানেলের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

একটা সময়, যখন চ্যানেলের সংখ্যা কম ছিল, তখন কিন্তু সবাই দেশী চ্যানেলগুলোই দেখত বেশি। সাধের সেই বিটিভির সিনেমা দেখার জন্য সবাই অপেক্ষায় থাকত পুরোটা সপ্তাহ, কবে বৃহস্পতিবার আর শুক্রবার আসবে। এখন হয় না আর তেমনটা। পুরো আগ্রহই কেড়ে নিয়েছে ভারতীয় সিরিয়ালগুলো। আমাদের চ্যানেলগুলোর এই দূরবস্থার পেছনে অনেকেই দায়ী। সরকার, হিন্দি পাগল দর্শকগণ এমনকি ক্যাবল অপারেটররাও এই দায় এড়াতে পারবে না। এরা সবাই মিলে দেশীয় চ্যানেলগুলোর পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়েছে।

আমাদের চ্যানেল আর ভারতীয় চ্যানেলগুলোর মূল পার্থক্য কী? কেন তারা দর্শক টানতে পারছে? অথচ, আমরা পারছি না! একটু তুলনা করা যাক।

১। প্রত্যেকটি বাংলাদেশী চ্যানেলেই প্রতি ঘণ্টায় সংবাদ পরিবেশিত হয়; ভারতীয় চ্যানেলে এমনটা হয় না।

২। আমাদের চ্যানেলে থাকে অসহ্য বিজ্ঞাপন বিরতি; ভারতে সেটা সহিষ্ণু পর্যায়ে আছে।

৩। প্রায় সারাদিনই বাংলাদেশী চ্যানেলগুলোতে চলে একঘেয়ে টকশো; ভারতীয় চ্যানেলে তা নেই।

৪। আমাদের প্রায় প্রত্যেকটি নাটকই একঘেয়েমি রম্য টাইপের, জগাখিচুড়ি মার্কা আঞ্চলিক ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় তৈরি, অনুষ্ঠানের মধ্যে কোন ভিন্নতা নেই; ভারতীয় নাটক-সিরিয়াল ও অনুষ্ঠানগুলোতে সভ্য ও রুচিশীল ভাষার ব্যবহারের সঙ্গে প্রতিটা অনুষ্ঠানের ভিন্নতা লক্ষণীয়।

৫। ক্যামেরা, লাইট, লোকেশন, সেট, গল্পসহ সবমিলিয়ে নির্মাণের মানের দিক থেকেও আমরা যথেষ্ট পিছিয়ে।

এভাবে ধরে ধরে অভিযোগের আঙ্গুল তুলতে গেলে হাজারটা আঙ্গুলের দরকার হবে। তবুও শেষ হবে না অভিযোগ। তারচেয়ে বরং সরকার, চ্যানেল মালিক, নির্মাতা, ক্যাবল অপারেটর, দর্শকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই যার যার যায়গা থেকে চেষ্টা করে যাক নিজস্ব চ্যানেলগুলোর উন্নতির জন্য। নতুবা, বাংলাদেশের নিজস্ব কোন চ্যানেল যে আছে, পরবর্তী প্রজন্ম তা জানতেই পারবে না...।