২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বাম দিকে ঝুঁকছে!

  • মূল : হ্যারল্ড মেয়ারসন ;###;অনুবাদ : এনামুল হক

মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভিত্তি বা কেন্দ্র ভাগ বাম দিকে সরে এসেছে। এ বিষয়ে কারো মনে কোন সন্দেহ থাকলে সম্প্রতি অর্থনীতির ওপর হিলারি ক্লিনটনের প্রদত্ত ভাষণ থেকে তা দূর হয়ে যাবে বলে পর্যবেক্ষকরা মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, দলটা যে বাম দিকে সরেছে হিলারির ওই ভাষণ তার ইতিবাচক প্রমাণ।

বলা হচ্ছে, হিলারির সেই ভাষণে একবিংশ শতকের মার্কিন পুঁজিবাদ সম্পর্কে ডেমোক্র্যাট দলের বিশ্লেষণের সমস্ত উপাদানই রয়ে গেছে। যেমন এই পুঁজিবাদে অর্থনৈতিক পুরস্কারটা শুধু ধনীদের হাতেই যায় এবং হিলারির ভাষায় এরা হচ্ছে সফল সিইও ও আর্থিক ব্যবস্থাপক। কর্পোরেশনগুলো বিনিয়োগ ও কর্মচারীদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে শেয়ারহোল্ডার ও শীর্ষস্থানীয় নির্বাহী কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করে। ইউনিয়নগুলো বহুলাংশে দুর্বল হয়ে পড়ায় শ্রমিকরা যে তাদের উৎপাদিত পণ্য থেকে অর্জিত আয়ের হিস্যা দাবি করবে সে ক্ষমতা তাদের নেই। বিনিয়োগ, শ্রমিকদের আয় ও ভোগ-ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্মিলিত যে মন্থরতা ও আলস্য দেখা দিয়েছে, তাতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেহারাটা হয়ে পড়েছে পা-ুর ও রুগ্ন।

এ অবস্থায় হিলারির প্রস্তাবিত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থায় দেখা যায় যে, বাজার অর্থনীতির সমস্যা সমাধানের জন্য তার দলের অবস্থান রিগ্যান যুগের বাজারমুখী অবস্থান থেকে সরে এসেছে। পদ্ধতিগতভাবে কম বিনিয়োগ ও কম কর্মসংস্থান হওয়ার ফলে এখন প্রয়োজন একটা সরকারী-বেসরকারী অবকাঠামো ব্যাংক স্থাপন করা এবং মূলধন লাভের ওপর আরোপিত কর সংস্কার করা, যাতে করে দীর্ঘদিন ধরে শেয়ার ধরে রাখা শেয়ার মালিকদের পুরস্কৃত করা এবং সেসব বিনিয়োগকারীকে নিরুৎসাহিত করা যায়, যারা কর্পোরেট বোর্ডের সদস্যদের শেয়ারের দাম বাড়িয়ে তোলার জন্য বিপুল সংখ্যায় শেয়ার কিনতে উৎসাহিত করে থাকে। হিলারির প্রস্তাব হলো- ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে কর্মচারীদের মুনাফার অধিকতর হিস্যা দিতে উৎসাহিত করার ব্যবস্থা, কর্পোরেট ট্যাক্সনীতি পুনর্বিন্যাস এবং শ্রমিকদের ইউনিয়ন গঠন সহজতর করে আমেরিকানদের আয় বাড়াতে হবে। এই হলো নতুন ক্লিনটনোমিক্স বা ক্লিনটন অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য।

নয়া ক্লিনটন অর্থনীতির ভিত্তি এ বছর সেসব অর্থনীতিবিদ ও নীতি নির্ধারক প-িতের রচিত নিবন্ধে পাওয়া যাবে, যারা পুরনো ক্লিনটন অর্থনীতি রচনায় সাহায্য করেছিলেন। বিল ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট থাকাকালে অধিকতর বাজারমুখী নীতিগুলোর প্রবল প্রাধান্য ছিল। গত জানুয়ারিতে ক্লিনটন আমাদের অর্থমন্ত্রী লরেন্স সামার্সের সভাপতিত্বে সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেসের এক সভায় সামার্স সবাইকে অবাক করে দিয়ে মুনাফার অধিকতর হিস্যা শ্রমিকদের দেয়ার আহ্বানই শুধু জানাননি, উপরন্তু কঠোরতর শ্রম আইন প্রণয়ন এমনকি ওয়ার্ক কাউন্সিল গঠনেরও আহ্বান জানিয়েছেন। সেখানে শ্রমিক ইউনিয়ন থাকুক আর নাই থাকুক, শ্রমিকরা চাকরিবিষয়ক সমস্যাদি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে পারবে।

গত মাসে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন থেকে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। লিখেছিলেন উইলিয়াম গালস্টোন ও এলাইন কামার্ক। এরা দু’জনেই ক্লিনটন প্রশাসনের মধ্য-দক্ষিণ উপদেষ্টা ছিলেন। নিবন্ধে বলা হয়েছে, আমেরিকার কর্পোরেশনগুলোকে এমন এক মেশিনে রূপান্তরিত করা হয়েছে যা কিনা বিনিয়োগ ও মজুরি থেকে অর্থায়নকে দক্ষতার সঙ্গে শেয়ারহোল্ডার ও শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করার কাজে ব্যয় করে। তারা লিখেছেন, ‘বিগত দশকে নগদ অর্থ প্রবাহের অংশ হিসেবে শেয়ারহোল্ডারদের প্রদত্ত নগদ অর্থ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড উচ্চতায় পেঁৗঁছেছে এবং অন্যদিকে মূলধন বিনিয়োগ বিষয়ক মুনাফার ভাগ রেকর্ড নিম্নে নেমে এসেছে।’ তারা আরও বলেন, গত দুই বছরে এসএ্যান্ডপি ৫০০ কোম্পানির বিক্রয়ের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২.৬ শতাংশ এবং শেয়ারপ্রতি আয় বৃদ্ধি পায় ৬.১ শতাংশ। মূলত এর কারণ হলো বিক্রীত শেয়ার পুনরায় কিনে নেয়ার ফলে অবিক্রীত শেয়ারের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে যাওয়া। উৎপাদনশীল বিনিয়োগের ক্ষতিসাধন করে সমাজের ওপরের স্তরে আয়ের এই পুনর্বণ্টনের প্রতিকার করার জন্য গালস্টন ও কামার্ক রিগ্যান আমলের সিকিউরিটজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সেই রুলিংটি রহিত করার আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে নিজেদের বিক্রীত শেয়ার পুনরায় কিনে নিয়ে শেয়ারের দাম বাড়ানো সত্ত্বেও কর্পোরেট ম্যানেজারদের নিজস্ব কোম্পানির শেয়ার কেনার সুযোগ দেয়া হয়েছে।

সিএপি এবং ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিভিন্ন সমীক্ষা ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থিতার সম্মুখ কাতারে থাকা হিলারির প্রার্থীপদ লাভের সম্ভাবনাকে স্পষ্টতই প্রভাবিত করেছে। তবে পুঁজিবাদের গলদগুলোকে দূর করতে হলে হিলারি ক্লিনটনকে তিনি এ যাবত যেসব প্রশংসনীয় নীতিমালা তুলে ধরেছেন সেগুলোকে ছাড়িয়ে যেতে হবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। কর্পোরেট করনীতিতে শুধু মুনাফার ভাগবাটোয়ারা ব্যবস্থাটিকে পুরস্কৃত করলে চলবে না, উপরন্তু যেসব কোম্পানিতে শ্রমিকদের আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সেগুলোকেও পুরস্কৃত করতে হবে। আয় বণ্টনের বিষয়টা যেহেতু চূড়ান্তভাবে ক্ষমতা বণ্টনের দ্বারা নির্ধারিত, তাই কর্পোরেট করনীতিতে সেসব কোম্পানিকেও পুরস্কৃত করা উচিত, যেগুলো তাদের কর্পোরেট বোর্ডকে শ্রমিক ও শেয়ারহোল্ডার-কর্তৃপক্ষীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে বিভক্ত করার জার্মান মডেল অনুসরণ করে থাকে। ডেমোক্র্যাটদের এই অবধি ঠেলে দিতে প্রচুর কাঠ-খড় পোড়াতে হবে। তথাপি একটা বলিষ্ঠ অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং হিলারির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব সফল করে তোলার জন্য এই চাপ সৃষ্টি একান্তই প্রয়োজন।

আমেরিকার কর্পোরেশনগুলো এবং অথর্নীতির এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আমেরিকানদের যথেষ্ট দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের এখন এই দুর্ভোগের প্রতিকার করতে হবে। তবে এই রূপান্তর বিষয়ক যাবতীয় জ্ঞান ও ধারণাগুলো কেমন করে যেন রিপাবলিকানদের মস্তিষ্ককে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছে। তাদের অর্থনীতি বিষয়ক ধ্যানধারণা ও দৃষ্টিকল্প সেই ১৯৮১ সাল অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবে রিগ্যানের কার্যকালের প্রথম বছরেই আটকে আছে। এটা এক ধরনের ব্রেন ডেথের নামান্তর, যার প্রতিদান ভোটারদের কাছ থেকে না পাওয়ারই সম্ভাবনা।

সূত্র : ওয়াশিংটন পোস্ট

নির্বাচিত সংবাদ