২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ উমর ইবনে আবদুল আযীয (র)

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

ইসলামের ইতিহাসে উমাইয়া খলিফা উমর ইবনে আবদুল আযীয দ্বিতীয় উমর নামে সমধিক পরিচিত। আমরা জানি, প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা মুকাররমা থেকে মদিনা মনওয়ারায় হিজরত করেন। সেখানে মসজিদুন নববীকে কেন্দ্র করে একটি আদর্শ নগররাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য মদিনার সনদ নামে একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করেন। এটাই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান।

৬৩২ খ্রিস্টাব্দে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর রফিকুল আলা আল্লাহ জাল্লা শানুহুর কাছে চলে গেলে খুলাফায়ে রাশেদীন যুগের সূচনা হয় হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাদি আল্লাহু তা’আলা আনহুর মাধ্যমে। তাঁর ইন্তিকালের পর খলিফা হন হযরত উমর (রাদি)। তিনি ১০ বছর ২ মাস খিলাফত পরিচালনা করেন। তিনি শহীদ হলে হযরত উসমান (রাদি) খলিফা হন। তিনি ১২ বছর খিলাফত পরিচালনা করেন। ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন একটা বিদ্রোহী ঘাতকগোষ্ঠী তাঁর বাসভবনে প্রবেশ করে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই সময় তিনি কুরআন মজীদ তিলাওয়াত করছিলেন। পরে খলিফা হন হযরত আলী (রা.)। ৬৬১ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি তিনিও কুফার মসজিদে উগ্রপন্থী খারেজিদের পাঠানো আবদুর রহমান ইবনে মুলজাম নামক এক ঘাতকের ছুরির আঘাতে শাহাদাত লাভ করেন। তার ইন্তিকালে খুলাফায়ে রাশেদীনের খিলাফত আমলের পরিসমাপ্তি ঘটে।

৬৬১ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া বংশীয় বিশিষ্ট সাহাবী হযরত মু’আবিয়া (রাদি) উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রজাতন্ত্র ও গণতন্ত্রের পরিবর্তে মুসলিম বিশ্বে সর্বপ্রথম বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের প্রবর্তন করেন। ৭১৭ খ্রিস্টাব্দে উমর ইবনে আবদুল আযীয উমাইয়া খিলাফত পরিচালনার দায়িত্বভার প্রাপ্ত হন। উমাইয়া খিলাফতের ইতিহাসে উমর ইবনে আবদুল আযীযের মসনদ লাভ প্রকৃত অর্থেই একটি যুগান্তকারী ঘটনা। বর্বরতা, ষড়যন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, অনাচার ও অধর্ম যখন সমগ্র উমাইয়া খিলাফতকে কলুষিত করেছিল তখন তিনি খিলাফতের শাসনভার প্রাপ্ত হন। প্রশাসনিক হিসেবে তিনি অভিজ্ঞ ছিলেন। খলিফা ওয়ালীদের আমলে তিনি হেজাজের গবর্নর ছিলেন। এ সময়ে তিনি যথেষ্ট কৃতিত্ব অর্জন করেন। ন্যায়পরায়ণতা, সরলতা, চারিত্রিক মাধুর্য, ধর্মপরায়ণতা, প্রজাবাৎসল্য দ্বারা তিনি অত্যাচারী উমাইয়া খলিফাদের স্বেচ্ছাচারী নীতি বর্জন করে খুলাফায়ে রাশেদীনের মৌলিক ইসলামী আদর্শগুলো পুনর্প্রতিষ্ঠিত করেন। যে কারণে তাঁকে উমাইয়া সুফি খলিফা অভিধায় অভিহিত করা হয়। তিনি ইসলামের সর্বজনীন মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিরপেক্ষ শাসননীতি প্রবর্তন করেন এবং খিলাফতে সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের জন্য পূর্ববর্তী উমাইয়া খলিফাগণের স্বৈরাচারী ও স্বার্থান্বেষী নীতি বর্জন করেন। তাঁকে খলিফা মনোনীত করেছিলেন তাঁর পূর্ববর্তী খলিফা সুলায়মান। এই মনোনয়ন ছিল গণতন্ত্র পরিপন্থী। তিনি এভাবে খলিফা হতে রাজি ছিলেন না। তাই তিনি তাঁর ভাষণে জনগণের উদ্দেশে বলেন, আমার প্রতি বায়’আতের (আনুগত্যের) যে বেড়ি তোমাদের গলায় পরিয়ে দেয়া হয়েছে আমি নিজে তা উন্মুক্ত করে দিলাম। এখন তোমরা যাকে ইচ্ছে খলিফা নির্বাচিত কর। তখন উপস্থিত সবাই বলেছিল, আমরা আপনাকেই খলিফা নির্বাচিত করলাম।

খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পূর্বে তিনি সেকালের সেরা সৌখিন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি স্বেচ্ছায় সাদাসিধে জীবন গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে খুবই সজাগ থাকতেন। অনেক সময় তিনি তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে কোনরূপ শিথিলতা হচ্ছে কিনা তা ভেবে ক্রন্দন করতেন। একবার তাঁকে কাঁদতে দেখে তাঁর বেগম সাহেবা ফাতিমা বিনতে আবদুল মালিক এই ক্রন্দনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, হে ফাতিমা! আমাকে মুসলিম-অমুসলিমের শাসক বানিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি ভাবছি তাদের কথা যারা দারিদ্র্যহেতু অভুক্ত, যারা দুস্থ ও রোগাগ্রস্ত, যারা বিবস্ত্র ও বিপদগ্রস্ত, যারা উৎপীড়নের আঘাতে জর্জরিত, যারা অজানা-অচেনা অথচ অকারণে কারাগারে আবদ্ধ, যারা শ্রদ্ধার পাত্র অথচ সহায়হীন অবস্থায় বার্ধক্যে উপনীত এবং যাদের বড় পরিবার রয়েছে অথচ রুজি-রোজগারে কোন ব্যবস্থা নেই। এদের মতো আর যে কত দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ খিলাফতের নিকট ও দূরপ্রান্তে রয়েছে। আমি ভাবছি, আমার রব শেষ বিচারের দিনে তো এসব মানুষের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন এবং ভয় করছি, তখন আমার আত্মরক্ষার কোন পথ থাকবে না। উমর ইবনে আবদুল আযীয খুলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শ ও নীতি অনুসরণ করেন। খলিফার দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি তাঁর প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, আমি বিধানদাতা নই। আমি শুধু আল্লাহর দেয়া বিধানের প্রয়োগকারী।

তাঁকে খুলাফায়ে রাশেদীনের পঞ্চম খলিফা বলা হয়। তাঁকে মহান মুজাদ্দিদ অর্থাৎ সংস্কারকও বলা হয়। তাঁর প্রায় ৩ বছরের খিলাফত আমলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধিত হয়। তিনি সরকারী তহবিল থেকে কোনরূপ ভাতা গ্রহণ করতেন না। তিনি সন্তান-সন্ততিদের জন্য কোন উল্লেখযোগ্য সম্পদ রেখে যাননি। তিনি ৭১৯ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ৪০ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর, উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট

অব হযরত মুহম্মদ (সা), সাবেক পরিচালক

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ