১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্থলভাগে ওঠার আগেই দুর্বল হয়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় কোমেন

  • শিশুসহ নিহত ৮, নিখোঁজ ২৭ জেলে ॥ মধ্যরাতে সন্দ্বীপের পাশ দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে;###;শিশুসহ নিহত ৮, নিখোঁজ ২৭ জেলে ॥ রাত নয়টার পর সন্দ্বীপ ও হাতিয়ার পাশ দিয়ে উপকূল অতিক্রম করছে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ স্থলভাগে ওঠার আগেই দুর্বল হয়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’। দুর্বল অবস্থায় ধীরে ধীরে ঘূর্ণিঝড়টি বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে হাতিয়া-সন্দ্বীপের ওপর দিয়ে চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করতে শুরু করে। উপকূল অতিক্রমের সময় বাতাসের বেগ ছিল ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিমি। এ সময় উপকূলজুড়ে বইছিল বৃষ্টিসহ ঝড়ো হাওয়া। উপকূল অতিক্রমের পর ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে বৃষ্টি ঝরিয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। আজ শুক্রবার সকালে সঙ্কেত কমিয়ে দেয়া হতে পারে। এর আগে ঘূর্ণিঝড়টির অগ্রভাগ বুধবার মধ্যরাতেই কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন ও টেকনাফ উপকূলে আঘাত হেনে উত্তর-পূর্ব দিকে চট্টগ্রাম উপকূলের দিকে এগোতে থাকে। এতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেন্ট মার্টিনসহ উপকূলীয় অনেক জেলা। দেয়ালধস, ট্রলারডুবি, বৃষ্টি ও গাছ চাপায় এক শিশুসহ ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে ২৭ জেলে। বিধ্বস্ত হয়েছে কয়েক শ’ ঘরবাড়ি। পানিতে তলিয়ে গেছে অনেক এলাকা। বাঁধ ভেঙ্গেছে অনেক এলাকায়। বৃহস্পতিবার ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপককূীয় এলাকা ও দ্বীপগুলোতে বৃষ্টিসহ ঝড়ো হাওয়া বইছিল। উপকূলীয় এলাকায় সব ধরনের নৌযান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। খবর নিজস্ব সংবাদদাতা, স্টাফ রিপোর্টার ও আবহাওয়া অফিস সূত্রের।

আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক মোঃ শাহ আলম বৃহস্পতিবার রাতে জনকণ্ঠকে জানান, ঘূর্ণিঝড় কোমেন বৃহস্পতিবার রাত নয়টার দিকে চট্টগ্রাম উপকূল দিয়ে স্থলভাগে উঠে আসতে শুরু করেছে। যেহেতু দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, তাই উপকূল অতিক্রম করতে তিন থেকে চার ঘণ্টা বা এর বেশিও সময় লাগতে পারে। এর আগের খবরে বলা হয় বৃহস্পতিবার সকালে সেন্টমার্টিন- টেকনাফ উপকূল ছুঁয়ে চট্টগ্রাম উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছায় ঘূর্ণিঝড়টি। সাগর রয়েছে উত্তাল। ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাতটায় সাগরের একই জায়গায় স্থির অবস্থায় ছিল। ঘূর্ণিঝড়টির অগ্রভাগ বুধবার মধ্যরাতেই কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন ও টেকনাফ উপকূলে আঘাত হেনে উত্তর-পূর্ব দিকে চট্টগ্রাম উপকূলের দিকে এগোতে থাকে। ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেন্ট মার্টিনসহ অনেক উপকূলীয় জেলা। দেয়ালধস, ট্রলারডুবি, বৃষ্টি ও গাছচাপায় এক শিশুসহ ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে ২৭ জেলে। বিধ্বস্ত হয়েছে কয়েক শ’ ঘরবাড়ি। বাঁধ ভেঙ্গে পানিতে তলিয়ে গেছে অনেক এলাকা। বৃহস্পতিবার ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা ও দ্বীপগুলোতে বৃষ্টিসহ ঝড়ো-হাওয়া বইছিল। সন্ধ্যা সাতটায় ‘কোমেন’ চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৫০ কিমি দক্ষিণ পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ১০৫ কিমি উত্তর-পশ্চিমে, মংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ২শ’ কিমি পূর্ব-দক্ষিণ পূর্বে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ১২৫ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থান করছিল। এটি আরও উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে মধ্য রাত নাগাদ সন্দ্বীপের কাছ দিয়ে চট্টগ্রাম অতিক্রম করতে পারে। উপকূল অতিক্রম করার পর পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে বৃষ্টি ঝরিয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। উপকূলীয় এলাকায় সব ধরনের নৌযান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। খবর স্টাফ রিপোর্টার নিজস্ব সংবাদদাতা ও আবহাওয়া অফিস সূত্রের। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টার আবহাওয়া দফতরের বুলেটিনে বলা হয়, উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ সামান্য উত্তর দিকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও কক্সবাজারে ৭ নম্বর বিপদ সঙ্কেত এবং মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরসমূহকে ৫ নম্বর বিপদ সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রে ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, ভোলা জেলাসমূহ এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো ৭ নম্বর বিপদ সঙ্কেতের আওতায় থাকে। মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ৫ নম্বর বিপদ সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়। উপকূলীয় জেলা বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ পাঁচ নম্বর বিপৎসঙ্কেতের আওতায় থাকে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আবহাওয়া অফিস জানায়, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় কোমেন ইতোমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এটি ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে রাতের মধ্যে চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করার কথা রয়েছে। এর ফলে উপকূলীয় চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা এবং জেলাগুলোর অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরাঞ্চলের এলাকাগুলো ৩ থেকে ৫ ফুট জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।

স্টাফ রিপোর্টার চট্টগ্রাম অফিস থেকে জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়টি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দুর্বল হয়ে গেছে বলে আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানানো হয়েছে। তবে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও দমকা হাওয়া অব্যাহত রয়েছে। সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জারি করা হয়েছে এলার্ট-৩। চট্টগ্রামেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৃহস্পতিবার বন্ধ ঘোষিত হয়। সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়।

ঘূর্ণিঝড় ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের উপকূলীয় পাঁচটি উপজেলায় অস্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয়েছে ২৩৯ আশ্রয় কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে আশ্রয় দেয়া হয়েছে নারী-পুরুষসহ ৬০ হাজারেরও অধিক মানুষকে। সেখানে তাদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ। এছাড়া জরুরী পরিস্থিতি মোকাবেলায় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১শ’ মেট্রিক টন চাল ও নগদ অর্থ।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (এডমিন এ্যান্ড প্লানিং) জাফর আলম জানান, ঘূর্ণিঝড় কোমেনের গতি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিপদ সঙ্কেত ৭ নম্বরে উন্নীত হওয়ার পরই কর্তৃপক্ষ ৩ নম্বর এলার্ট জারি করেছে। বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ দুদফা জরুরী বৈঠক করেন কর্মকর্তাদের সঙ্গে। সার্বিক বিবেচনায় বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বন্দর বহির্নোঙ্গর এমনকি জেটিতেও পণ্য ওঠানামা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ছোট লাইটার জাহাজগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে এবং বড় জাহাজগুলোকে শক্তভাবে নোঙ্গর করে ইঞ্জিন অন রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ম্যানেজার উইং কমান্ডার নুরে আলম জানান, সকাল সাড়ে আটটার পূর্বে চারটি বিমান অবতরণ করেছে। তবে এরপর পরিস্থিতি বিবেচনায় ফ্লাইট উঠানামা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অবস্থার উন্নতি হলে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হবে।

আবহাওয়াবিদ শেখ ফরিদ আহমেদ জনকণ্ঠকে জানান, ঘূর্ণিঝড়টির গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ থেকে ৮৮ কিমি। এটি ক্লাসিক্যাল সাইক্লোন নয়। এর শক্তিও তীব্র নয়। অনেকটা মাঝারি ধরনের। তিনি বলেন, সাধারণত মৌসুমী নি¤œচাপ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয় না। বর্ষা মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নি¤œচাপ ও লঘুচাপগুলো ভারি বর্ষণ ঘটিয়ে থাকে। কিন্তু যেহেতু অব্যাহত বর্ষণের কারণে দেশের একটি বড় অংশ এমনিতেই প্লাবিত সেহেতু ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’কে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয়েছে। স্থলভাগের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে এটি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে।

নিজস্ব সংবাদদাতা পটুয়াখালী থেকে জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ আতঙ্কে পটুয়াখালীর উপকূলের মানুষ বুধবার রাত জেগে থাকে। ঘূর্ণিঝড়টি দুর্বল হওয়ার খবরে বৃহস্পতিবার বেলা এগারোটার পর উপকূলবাসীর মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। বৃহস্পতিবারও থেমে থেমে এখনও বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া বইছিল। ঝড়ে গাছ চাপা পড়ে গলাচিপার কল্যান কলস গ্রামে নুর ইসলাম (৫২) নামের একজন মারা গেছেন। জেলার অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার সকল রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকে।

স্টাফ রিপোর্টার বরিশাল থেকে জানান, মেঘনা তীরবর্তী মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার অধিকাংশ স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা হয়। বরিশালের সকল নদীতে ছোট-বড় সকল প্রকার নৌ-যান চলাচল বন্ধ থাকে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বরিশাল নদীবন্দরের জন্য তিন নম্বর এবং পায়রা সমুদ্র বন্দরের জন্য ৫ নম্বর সতর্ক সঙ্কেত রয়েছে। নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে ২ থেকে ৩ ফুট পানি বৃদ্ধি পায়। বরিশাল নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের উপ-পরিচালক আবুল বাশার মজুমদার জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই অভ্যন্তরীণ রুটে সকল প্রকার লঞ্চ চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। ঢাকাগামী লঞ্চও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে। সতর্ক সঙ্কেত পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত ঢাকাগামী লঞ্চ চলাচলও বন্ধ থাকবে।

নিজস্ব সংবাদদাতা কলাপড়া থেকে জানান, কলাপাড়ার পায়রা বন্দর সংলগ্ন পুরো উপকূলীয় এলাকা বৃহস্পতিবার সকাল থেকে থেমে থেমে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি হতে থাকে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীরা উপস্থিত হলেও ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ছুটি দেয়া হয়। কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর উত্তাল রয়েছে।

নিজস্ব সংবাদদাদা বাঁশাখালী থেকে জানান, বুধবার গভীর রাত থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকার ২ শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় পাঁচটি ইউনিয়ন ৪ থেকে ৫ ফুট উচ্চতা জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়। অনেক গাছপালা ভেঙ্গে পড়ে।

নিজস্ব সংবাদদাতা নোয়াখালী থেকে জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ হয়। সকল ধরনের যাত্রীবাহী ও মাছধরা ট্রলার চলাচল বন্ধ থাকে।

স্টাফ রিপোর্টার মুন্সীগঞ্জ থেকে জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘কোমনে’ উপকূলের দিকে এগিয়ে আসার খবরে বৃহস্পতিবার শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি নৌ-রুটে ফেরি ছাড়া সকল ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। বিআইডব্লিউউিটএর শিমুলিয়া ঘাট কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার সকাল নয়টা থেকে লঞ্চ, সিবোট, ট্রলার জাতীয় নৌ-যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। চাঁদপুরের নদী বন্দরগুলোতে ৫ নম্বর সতর্কতা সঙ্কেত চলছে। চাঁদপুর থেকে নদীপথে শিমুলিয়া ঘাটের দূরত্ব মাত্র ১৫ কিমি। শিমুলিয়া ঘাটে ১ নম্বর সতর্কতা সঙ্কেত চলছে। তাই ঝুঁকি এড়াতে পূর্ব সতর্কতা হিসেবে এ ব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বিআইডব্লিউটিএর শিমুলিয়া ঘাট বন্দর কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন জানান, আগাম সতর্কতা হিসেবে নৌ-যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যাত্রীবাহী লঞ্চ, সি-বোট, ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলোকে ঘাট এলাকায় অথবা মূল নদী থেকে শাখা নদীতে গিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখার পরার্মশ দেয়া হয়েছে।

শিমুলিয়াস্থ বিআইডব্লিউটিসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) এসএম আশিকুজ্জাম জানান, বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। ফেরি চ্যানেলে নাব্য নিরসনে ড্রেজার কাজ করায় রাতে ফেরি চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পরার কারণে ফেরি বন্ধ রাখা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় কোমনের কারণে অবহাওয়া খারাপ হলে অবস্থা বুঝে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হবে। এদিকে পারাপারের জন্য দুই শতাধিক ছোট-বড় যানবাহন ঘাটে অপেক্ষায় রয়েছে। দ্রুতই এ যানজট হালকা হবে বলে জানান এসএম আশিকুজ্জামান।

নিজস্ব সংবাদদাতা চরফ্যাশন (ভোলা) থেকে জানান, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ভোলা চরফ্যাশনের মনুরা ঘাটের দুই মাছ ধরার ট্রলারের ২৭ মাঝি মাল্লা নিখোঁজ রয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত তাদের সন্ধান মেলেনি। মনুরা ঘাটের আড়ৎদার জাফর রাড়ি জানান, চরফ্যাশনের আবদুল্লাহপুর গ্রামের মহিউদ্দিন মাঝির একটি ট্রলার ১৪ জন মাঝিমাল্লা নিয়ে এবং বোরহান উদ্দিনের গঙ্গাপুর গ্রামের গনি পোদ্দারের একটি ট্রলার ১৩ জন মাঝিমাল্লা নিয়ে পাঁচ দিন আগে মনুরা মৎস্য ঘাট থেকে সাগরে মাছ ধরতে যায়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সাগরে যাওয়া অন্যান্য ট্রলার ও জেলেরা তীরে ফিরে এলেও ওই দুটি ট্রলার বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত ফিরে আসেনি।

নিজস্ব সংবাদদাতা হাতিয়া (নোয়াখালী) থেকে জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ভারি বর্ষণ ও মাঝারি ধরনের দমকা হাওয়া বিরাজ করে। সকাল এগারোটার দিকে নদীতে আসা জোয়ারের পানিতে হাতিয়ার নলচিরা, সুখচর ও কেরিংচরের নিম্নাঞ্চাল প্লাবিত হয়। দিনভর দমকা হাওয়ায় তার ছিঁড়ে বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ থাকে।

স্টাফ রিপোর্টার গলাচিপা থেকে জানান, প্রবল ঝড়ে উপড়ে পড়া গাছচাপায় পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের কল্যাণকলস গ্রামে নূর ইসলাম ফকির (৫২) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। বৃহস্পতিবার বেলা বারোটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। কলাগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ দুলাল চৌধুরী মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঘটনার সময় প্রবল বেগে বাতাস বইছিল। নূরুল ইসলাম ফকির এ সময় বাড়ি থেকে সদর রাস্তায় যাচ্ছিল। হঠাৎ রাস্তা পাশের চাম্বল গাছ উপড়ে ওই ব্যক্তির ওপর পড়ে। মারাত্মক আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

নিজস্ব সংবাদদাদা ভোলা থেকে জানান, ঘূর্ণিঝড়ে ভোলার লালমোহন উপজেলার পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়নের চর কচুয়াখালীর গ্রামে গাছচাপায় সোবাহান মোল্লার স্ত্রী মনজুমা বেগম (৫৫) নামে এক বৃদ্ধার মৃত্যু ঘটে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বুধবার রাত থেকে থেমে থেমে দমকা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। বৃহস্পতিবার সকাল চরফ্যাশন উপজেলার পর্যটন এলাকা কুকরী মুকরী ও ঢাল চরে রাতে ঝড়ো-হাওয়ায় গাছপালা বিধ্বস্ত হয়। চরাঞ্চলগুলোতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে কয়েক ফুট পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ভোলা থেকে লক্ষ্মীপুর রুটে বিআইডব্লিউটিসির সি ট্রাকসহ সকল রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। অনেক যাত্রী ইলিশা ফেরিঘাটে এসে লঞ্চ সি ট্রাক না চলায় দুর্ভোগে পড়ে।

স্টাফ রিপোর্টার কক্সবাজার থেকে জানান, প্রবল ঝড়ো হাওয়ায় প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন ল-ভ- হয়ে গেছে। মহেশখালীতে দেয়াল ধসে, ট্রলার ডুবিতে এবং সেন্টমার্টিনে গাছ চাপা পড়ে এক শিশুসহ চার জনের মৃত্যু হয়েছে। গাছ-বাঁশ দিয়ে তৈরি স্থানীয়দের অন্তত ৩০টি ঘরবাড়ি উড়ে গেছে। ধসে পড়েছে দ্বীপের অধিকাংশ গাছগাছালি। গাছ চাপা পড়ে দ্বীপের পশ্চিমপাড়ার মোঃ ইসলাম (৫০) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু ঘটেছে। আহত হয়েছে কমপক্ষে ২০ জন। নোঙর ছিঁড়ে সমুদ্রে তলিয়ে গেছে সাগরতীরে অবস্থানরত অর্ধশত নৌকা ও ফিশিং ট্রলার।

কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়া কর্মকর্তা একেএম নাজমুল হক জানান, বুধবার বিকেল ৩টা থেকে সাগর উত্তাল হয়ে ওঠে। ঘূর্ণিঝড় কোমেনের প্রভাবে উপকূলের নিকটবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা থাকায় নিম্নাঞ্চলের মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান নিয়েছে বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে। ঘূর্ণিঝড় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, রামু, পেকুয়া, শহরের কুতুবদিয়া পাড়া, সমিতি পাড়া, জেলা সদরের পশ্চিম গোমাতলী, খানঘোনা, রাজঘাট, ভারুয়াখালী ও ইসলামপুরসহ উপকূলীয় এলাকার স্থানীয় লোকজন ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নেয়।