২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজধানীতে শিবিরের বোমা তৈরি কারখানার সন্ধান

রাজধানীতে শিবিরের বোমা তৈরি কারখানার সন্ধান
  • বোমা, বিস্ফোরক জিহাদী বই, সিডি উদ্ধার

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানী ঢাকায় আবারও ছাত্র শিবিরের বোমা তৈরির কারখানার সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। কারখানা থেকে উদ্ধার হয়েছে প্রায় শখানেক বোমা, বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, জিহাদী বই ও বোমা তৈরির কলাকৌশল সমৃদ্ধ সিডি (কম্পিউটার ডিস্ক)। গ্রেফতার হয়েছে কারখানা স্থাপনের মূল উদ্যোক্তা ছাত্র শিবিরের খিলক্ষেত থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন। ঢাকায় বড় ধরনের নাশকতা চালাতে বিস্ফোরকগুলো মজুদ করা হয়েছিল। ছাত্র শিবিরের বোমা তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়ায় নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ছাড়া রাজনৈতিক কর্মসূচীর আড়ালে বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কা করছে গোয়েন্দারা। রাজধানীতে নাশকতা এড়াতে গত তিন দিন ধরে টানা তল্লাশি অভিযান চলছে।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে এগারোটায় খিলক্ষেত থানায় গুলশান বিভাগের উপকমিশনার এসএম মোস্তাক আহমেদ খান এক সংবাদ সম্মেলনে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বুধবার ভোর সোয়া পাঁচটার দিকে রাজধানীর খিলক্ষেত থানাধীন নামাপাড়ার ক/২১২ নম্বর পাঁচ তলা বাড়ির পঞ্চম তলার দুই কক্ষ বিশিষ্ট একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় খিলক্ষেত থানা পুলিশ। অভিযানে ফ্ল্যাট থেকে গ্রেফতার হয় মোঃ ইমরান হোসেন (২০)। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ইমরানের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।

ইমরানের তথ্যমতেই ওই বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় ৭০টি বোমা, বোমা তৈরির কাজে ব্যবহৃত ১০টি কৌটা, বোমা তৈরিতে ব্যবহৃত দেড় কেজি গন্ধক, ২৫০ গ্রাম সোডা, দেড় কেজি উচ্চমাত্রার গান পাউডার, বোমায় ব্যবহারের জন্য আনা ৬ কেজি ছোট পাথর, ১৪টি গুলতি, বোমায় ব্যবহৃত ছয় মাথা বিশিষ্ট তারকাঁটা, ২টি ব্যানার, একটি ল্যাপটপ, ছাত্র শিবিরের ৭টি বই, চাঁদা আদায়ের ৪টি রশিদ বই, ছাত্র শিবিরের কর্মী হওয়ার ফরম ও ৪টি বিভিন্ন সভা ও মিছিলের ভিডিও সিডি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত সিডি ও ল্যাপটপে বোমা তৈরির কলাকৌশলও রয়েছে।

ইমরান হোসেন ঢাকার মহাখালী সরকারী তিতুমীর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষ সম্মান শ্রেণীর ছাত্র। পাশাপাশি খিলক্ষেত থানার ছাত্র শিবিরের সাধারণ সম্পাদক। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরে।

খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জনকণ্ঠকে জানান, মাত্র এক মাস আগে প্রায় সাত হাজার টাকায় দুইকক্ষ বিশিষ্ট ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয় ইমরান। ইমরানের সঙ্গে আরেকজন ছিল। অভিযানকালে ইমরানের সহযোগী বাসায় ছিল না। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, ইমরান মূলত ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়ে বোমা তৈরির কারখানা স্থাপন করে। ইমরান ও তার পলাতক সহযোগী সেখানে থাকত। তারা সুযোগ বুঝে বোমা তৈরি করে তা মজুদ করত। পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মসূচীতে নাশকতা চালাতে মজুদকৃত বোমা দলীয় লোকজনদের কাছে সরবরাহ করত তারা। এ দু’জন ছাড়াও শিবিরের বোমা প্রস্তুতকারীরা সেখানে অবস্থান করে বোমা প্রস্তুত করে মজুদ করত। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। গ্রেফতারকৃত ইমরান বোমা তৈরি ও মজুদ করার বিষয়ে বিশেষভাবে পারদর্শী। ঢাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচী ছাড়া যে কোন মুহূর্তে বড় ধরনের নাশকতা চালাতেই বোমা তৈরির কারখানাটি স্থাপন করা হয়েছিল। গ্রেফতারকৃত ইমরানের কাছ থেকে চারটি চাঁদা আদায়ের রশিদ উদ্ধার হয়েছে। তাতে জামায়াতপন্থী অন্তত ২০ ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে। যারা নিয়মিত চাঁদা দিত। তাদের চাঁদা ছাড়াও ছাত্র শিবিরের চাঁদার টাকায় বোমা তৈরির কারখানাটি স্থাপন করা হয়েছিল। চাঁদা প্রদানকারী ও বোমা তৈরি এবং মজুদকারীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।

এর আগে গত ৭ জুন রাজধানী থেকে অস্ত্রগোলাবারুদসহ গ্রেফতার হয় নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন হুজি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নয় সদস্য। তাদের তথ্যমতে গত ১৮ জুন জঙ্গীদের কাছে বিস্ফোরক সররবাহের কারণে গ্রেফতার হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণাগারের সহকারী গাজী মোহাম্মদ বাবুল, রাসায়নিক পদার্থ ব্যবসায়ী রিপন মোল্যা, মহিউদ্দিন ও মোঃ নাসির উদ্দিন। সেই সূত্রধরেই গত ৫ জুলাই ডিবি পুলিশের যৌথ অভিযানে ঢাকার লালবাগ ও চট্টগ্রামের সদরঘাট থেকে ১২শ’ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার হয়। গ্রেফতার হয় আউয়াল (৫২), জাহাঙ্গীর আলম (৪২) ও শরিফ (২৮) নামে তিনজন। উদ্ধারকৃত বিস্ফোরক দিয়ে ১২ লাখ বোমা তৈরি সম্ভব ছিল বলে ডিবির বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা জানান।

এর আগে গত ৫ জানুয়ারি থেকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের প্রায় তিন মাসব্যাপী ডাকা টানা অবরোধের মধ্যে ২০ জানুয়ারি রাজধানীর বনানীতে ছাত্র শিবিরের বোমা তৈরির কারখানা আবিস্কৃত হয়। কারখানা থেকে ১৩০টি শক্তিশালী তাজা বোমা, পেট্রোলবোমা, গান পাউডার, জিহাদী বই ও চাঁদা প্রদানকারী জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের তালিকা উদ্ধার হয়। গ্রেফতার হয় ছাত্র শিবিরের বনানী থানা শাখার সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানসহ পাঁচজন। পরদিন ২১ জানুয়ারি লালবাগ থানাধীন ঢাকেশ্বরীতে বোমা তৈরির সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিউমার্কেট থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বাপ্পীর মৃত্যু হয়। আহত হয় তিনজন। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি হাজারীবাগের একটি বাড়িতে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে নিহত হয় যুবদল নেতা জসিম উদ্দিন। আহত হয় হাজারীবাগ থানা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক রাজু হোসেন ও তার ভাই জিসান। নতুন করে ঢাকায় বড় ধরনের নাশকতা চালাতে আবার বোমা তৈরির কারখানা স্থাপন করা হতে পারে বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে।