২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিকল্প তৃতীয় শক্তি গড়ে জাতীয় চার্টার তৈরি করতে চান ড. কামাল

  • চা চক্রে বুদ্ধিজীবী রাজনীতিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতবিনিময়

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বিকল্প তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। লক্ষ্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বৃদ্ধিজীবীসহ সব শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিদের নিয়ে জাতীয় চার্টার তৈরি করা। যেখানে জাতীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হবে। এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া! অনেক দিন রাজনৈতিকভাবে অনেকটা নিষ্ক্রিয় থাকার পর ফের সকলের সামনে হাজির হলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় চা চক্রের আয়োজন করেন সাবেক এই আইনমন্ত্রী। সোমবার রাজধানীর কাকরাইলে রাজমনি-ঈশা খা হোটেলে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন সেক্টরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন ড. কামাল। অনুষ্ঠানে সবাই তাদের মতামত তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে সংবিধান বিশেষজ্ঞ কামাল হোসেন বলেন, খুন, গুম আর অপহরণের ভয়ে মানুষ এখন ভীত। এ দেশ কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দেশ নয়, দেশ সকলের। এক ব্যক্তি ও এক রাজতন্ত্রের কাছে আমরা বন্দী থাকতে পারি না। গণতন্ত্র হলো সকলের সম্মিলিত প্রয়াস। তিনি বলেন, আমরা কখনও অন্যায়ের কাছে মাথানত করিনি। এ দেশের মানুষ কোনদিন অন্যায় মেনে নেয়নি। ভবিষ্যতেও নেবে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে এত দল ও এক ব্যক্তির শাসন কোন দিন মেনে নেইনি। এক ব্যক্তির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করাও ভুল।

ড. কামাল বলেন, রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের অর্থ লোপাট ও বিদেশে পাচারের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও পুলিশের দুর্নীতি ও অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণহীন চলছে। যারা সরকারী দায়িত্বে আছেন, তারা স্বীকার করেছেন রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশ্রয়ের কারণে দুর্নীতিবাজ-অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তি দেয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে গণতন্ত্র সমূলে ধ্বংস হতে বাধ্য। রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে কার্যকর গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা দেশে সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে পারি। সে লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, দেশ এভাবে চলতে পারে না। কারো জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই।

চলমান রাজনীতি থেকে উত্তরণের পথ তৈরি করতে হবে একথা উল্লেখ করে সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল সেলিম বলেন, সব মিলিয়ে একটি পরিবর্তন জরুরী। দেশে এখন অনেক অন্যায় অবিচার চলছে। তিনি বলেন, সেনা শাসনে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে না। তাছাড়া রাজনীতি ও দলীয়করণ এক জিনিস নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষকে নিয়ে একজন যোগ্য নেতার নেতৃত্বে সবাইকে এগিয়ে চলার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, দেশে সমস্যার অন্ত নেই। সকল সমস্যা ঢেলে সাজাতে হবে। সামগ্রিক জাগরণের মধ্য দিয়ে রাজনীতির নতুন অধ্যায় সূচনার বিকল্প নেই।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডয়াম সদস্য জি এম কাদের বলেন, রাজনীতির প্রতি এখন মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই মানুষের মত নিয়ে রাজনীতি করা উচিত। আমাদের সামনে আবারও আরেকটি সংগ্রাম এসে উপস্থিত। প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির অনুপস্থিতির কারণে সমাজে দিন দিন সঙ্কট বাড়ছে।

সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা আছে। কিন্তু রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের কেউ এখন সম্মান করে না। এজন্য দায়ী তারা নিজেই। এই আমূল সংস্কার জরুরী।

ডাঃ মিলনের মা সেলীনা আক্তার বলেন, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের অভাবে আমরা এখন জনবিচ্ছিন্ন হতে চলেছি। গণতন্ত্র আজ যে অবস্থায় আছে এতে ব্যথিত-আশাহত ও হতাশায় ভোগী। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক ও সকলের মধ্যে বিভাজন দূর হোক। তিনি বলেন, দুর্নীতি না থাকলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু এখন দুর্নীতির সীমা পরিসীমা নেই।

ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি লিটন নন্দী বলেন, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে নারী নির্যাতনের ঘটনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছিলাম। এ কারণে তদন্ত কমিটি আমাকে বলেছিল, ছাত্ররাজনীতি না করলে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে দেয়ার কথা। আমি মনে করি, ডাকসুর নির্বাচন না হওয়ায় ছাত্র রাজনীতির বিকাশ হচ্ছে না। ছাত্র নেতা তৈরি হচ্ছে না।

বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মেজর (অব) মান্নান, আমরা যারা দেশের প্রয়োজনে রাজনীতি করি তাদের কাজ শেষ হয়ে যায়নি। তাছাড়া বর্তমান অবস্থায় কারও কিছু করণীয় নেই একথা ঠিক নয়। গণতন্ত্র রক্ষা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা জরুরী বলে মনে করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মোহাম্মদ মনসুর বলেন, দেশে এখন ভোটারবিহীন গণতন্ত্র, সংসদ সদস্য ও সরকারসহ মন্ত্রীরা কাজ করছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে জাতীয় ঐক্য জরুরী।

সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, সরকার তথা আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে বলে গুম, হত্যাসহ গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠাতে পারে না। অন্যদিকে রাজাকারদের নিয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটানো, পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যা করে বিএনপির পক্ষে গণতন্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব নয়। এটা কোন কৌশল হতে পারে না। তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য ইতিবাচক কর্মসূচী জরুরী। রাজপথে রাজাকার ও স্বৈরাচার নিয়েও লড়াই হয় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এস এম আকরাম বলেন, সময় হয়েছে তৃতীয় কোন ধারা সৃষ্টির। এজন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, বড় দুই দল রাজনৈতিক দলের মতো আচরণ করে না। জনস্বার্থে তাদের কাজ কম। এজন্য দেশে সুশাসন, গণতন্ত্রের উপস্থিতি কম। বিচারহীনতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকার প্রবণতা বাড়ছে। সংবিধান পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, সামনের পথ চলার জন্য জাতীয় চার্টার তৈরি করা উচিত। সংবিধানকে সামনে রেখে অসাংবিধানিক কাজ বন্ধ করারও তাগিদ দেন তিনি। তিনি বলেন, জনগণ ও রাজনৈতিক দল মিলিয়ে সরকার চাই।

অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান বলেন, দেশ গড়ার জন্য নেতা ও নীতির অভাব দূর করতে হবে। সুষ্ঠু পরিবেশের অভাব থাকলেও আমাদের দেশ নিজেদেরই গড়তে হবে। জেএসডি সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বলেন, মায়ের পেটে শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ইতিহাস পৃথিবীতে নেই, যা আমাদের দেশে হয়েছে। সম্পদের লুণ্ঠন, নারী নির্যাতনসহ সামাজিক অপরাধ বাড়ছে। এর একমাত্র কারণ হলো বিচারহীনতা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রচলিত রাজনীতি। সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মানুষের সরকার প্রতিষ্ঠান দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। রাজনীতি এখন জনগণের সঙ্গে নেই। তাই ক্রান্তিকাল তৈরি হয়েছে। রাজনীতি পশ্চাৎমুখী।

চা-চক্রে উপস্থিত ছিলেন সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাসদ সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ, নাগরিক ঐক্যের সদস্য শহীদুল্লাহ কায়সার ও আইটি বিশেষজ্ঞ হাবিবুল্লাহ করিম প্রমুখ।

নির্বাচিত সংবাদ