২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাণীর শক্তি সুরের জাদু

  • সৈকত হাবিব

আমরা কি কোনোভাবেই রবীন্দ্রশূন্য পৃথিবী কল্পনা করতে পারি, তাঁর প্রয়াণের পৌনে এক শতাব্দীর পরও। বরং বিস্মিত হয়ে ভাবি, রবীন্দ্রনাথ যদি জন্মগ্রহণ না করতেন তাহলে কী হতো, অন্তত বাঙালি হিসেবে আমাদের! না, এ কোনো ভক্তির কথা হচ্ছে না, বরং প্রয়োজনলাঞ্ছিত এই একুশ শতকের আমি সর্বস্ব ব্যবহারিক জীবনের তাগিদের তাঁর প্রয়োজনের নিরিখেই বলা যায়। ‘হাজার বছরের বাঙালি’র মধ্যে আর এমন কে আছেন যাঁর ভেতর একটি জাতির অতীত ও আগামীর শিল্প-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-চিন্তা-কর্মের এমন একটি পূর্ণপোক্ত সেতু নির্মিত হয়েছে? তাতে সবারই আশ্রয় জোটে। আমাদের জাতিগত ও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হয়ে ওঠেন আশ্রয়বিন্দু।

একটি জাতি হিসেবে এ আমাদের পরম প্রাপ্তি আর সম্পদ হিসেবে অনিঃশেষ, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম আমাদের সুরক্ষা দিয়ে চলেছে। কারণ, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টি ও কাজের ভেতর দিয়েই এত বিপুল-বিচিত্র-বিস্তীর্ণ যে, মনে হয়, তাঁর পা মাটিতে প্রোথিত থাকলেও মন-মস্তিষ্ক ছিল অনন্ত নক্ষত্রবিথীতে ছড়ানো। এর থৈ পাওয়া বহু যুগের সাধনচর্চার বিষয়। বাকি সব বাদ দিয়ে কেবল তাঁর গান, তাও সব নয়, যদি শ’ তিন-চারেকও আমরা বেছে নিই, দেখা যাবে পরতে পরতে বিস্ময় লুকানো। কেবলই কি বিস্ময়, আজকের পৃথিবীতেও আমার-আপনার অন্তরের অন্তর্গত কথাও কি নয়? এই ভোগকামনা-দুঃখজটিল পৃথিবীতে আমাদের নিভৃত প্রাণের কথা এমনকি কোনো দেবতাও এভাবে অনুভব ও প্রকাশ করতে পারেননি।

কী আছে রবীন্দ্রগানে? উপরিতল থেকে দেখলে বাণীর গভীর শক্তি ও সুরের আশ্চর্য জাদু। কিন্তু এ শক্তি ও জাদু কি সবার কাছেই ধরা দেয়? কেবল শ্রোতার কথা হচ্ছে না, এমনকি সব শিল্পীর কণ্ঠেও সব সুর ধরা দেয় না, সব বাণী সমান ফোটে না। এ এক আশ্চর্য রহস্যময় মধু, যা সবাই পান করতে পারেন না, না শ্রোতা-না পাঠক, না শিল্পী-না গবেষক। কারণ এ কেবল কথা আর সুরের সম্মিলনমাত্র নয়, শুধু সুকণ্ঠ আর বিচিত্র যন্ত্রের কারুকাজ নয়, এর ভেতর লুকিয়ে আছে গোপন-গভীর চিরবহমান জীবনসূত্র। কিন্তু বাণীর গভীর শক্তি বলতেই বা আমরা কী বুঝতে চাইছি? বাংলা গান ভারত-উপমহাদেশের রাগসঙ্গীতের ঐতিহ্য ধারণ করলেও এবং সুরের বিচিত্র ধারা থাকলেও বাণীতে যে আমরা অনেক দরিদ্র ছিলাম, রবীন্দ্রনাথের পূর্বসূরিদের বাণী দেখলেই টের পাওয়া যায়। সেগুলো ছিল, সামান্য ব্যতিক্রম বাদে, প্রধানত ধর্মাশ্রিত, ভক্তি ও করুণরসে জারিত, তা বাউল-সুফি-বৈষ্ণব-কীর্তন-শ্যামা যা-ই হোক না কেন। এর বাইরে আর যা কিছু সবই তুলনায় ছিল প্রান্তিক বা কেজো (যেমন বিয়ের গান)। এবং অনেক সময়ই কথা ও সুরকে আলাদা করে ফেললে হয় সুর কিংবা কথা তাদের নিজস্বতা হারিয়ে ফেলত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথই প্রথম সবচেয়ে তীব্রভাবে বাণীর শক্তিকে সুস্পষ্ট করলেন, গানের কথা যে কেবল সুরের সহযোগী নয়, বরং তারও যে রয়েছে সূর্যের মতোনই নিজস্ব আলো, সেটি তিনি বাংলা গানকে বড় প্রাণময়ভাবে চিনিয়ে দিলেন। বাণী যে সুর ছাড়াও নিজেই কথা বলে ওঠে, প্রাণ পায়, নিজস্ব মহিমায় প্রতিষ্ঠালাভ করে, এটি রবীন্দ্রগানের বাণীর আগে অনেকটাই ছিল অজ্ঞাত (এই বাণীর শক্তি নিয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর-নিবিড় বিশ্লেষণ করেছেন কবি শঙ্খ ঘোষ, রণজিৎ গুহসহ অনেকে)। শুধু তাই নয়, বাণীর যে বিচিত্রগামিতা, বহু অর্থবোধকতা, কাব্যোপম রহস্যময়তা ও সৌন্দর্যÑ এসব অধরাকে রবীন্দ্রনাথই প্রথম গানে ধরেছেন তাঁর শব্দের জালে। এর মধ্যদিয়ে গানের বাণীর বৈচিত্র্য-বিস্তৃতি আর ইলাসসিটির আস্বাদ তিনি বাঙালিকে বড় গহন করে টের পাওয়ালেন। আর এ কথা তো বহু উচ্চারিত যে, কবি রবীন্দ্রনাথ বিপুলভাবে প্রস্ফুটিত গীতিকার রবীন্দ্রনাথে (এমনকি তিনি নিজেও দৃঢ় বিশ্বাসে বলেছেন, আর কিছু থাকুক বা না-থাকুক, তাঁর গান বেঁচে থাকবে)। তাই গীতাঞ্জলি গানমাত্র নয়, নিবিড়ভাবে পঠনযোগ্য কবিতাও। আমরা যখন পাঠ করি আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে, সকল অহঙ্কার আমার ডুবাও চোখের জলে... তখন তার সুর মাথায় না রাখলেও চলে, এমনকি ঘোর অবিশ্বাসীর অন্তরকেও স্নাত করে। পশ্চিম-পৃথিবীকেও তাই তাদের সম্পূর্ণ অপরিচিত গীতাঞ্জলি আস্বাদন করতে সুরের সাহায্য নিতে হয়নি। এখানেই তাঁর বাণীর গভীরতা ও শক্তি।

আর তাঁর সুরের আশ্চর্য জাদু হচ্ছে কী রাগ, কী নাগরিক, কী লোকজÑ ভারতীয় প্রতিটি গানের ধারাতেই সুরের একটি নিজস্ব দেয়াল ছিল, যা রবীন্দ্রনাথ ভেঙে দিয়ে একের ভেতর অনেক আর অনেকের মধ্যে এক-এর বিস্ময়কর সেতু নির্মাণ করলেন। ভারতীয়/বাংলা গানের প্রতিটি ধারা বা ঘরানায়, তা সে যা-ই হোক, সুরের একটি নিজস্বতা ছিল। সুর শুনেই বোঝা যেত তার রূপ-স্বরূপ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুর ব্যাহত না করেই কথা বদলে দেওয়া হতো। ধ্রুপদী-লোকজ-মারফতি-মুর্শিদি ইত্যাদি গানে এখনো এই ধারা প্রবহমান। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রতিটি গানেই কথার সঙ্গে সুরের এমন বৈচিত্র্য তৈরি করলেন যে, তিনি নিজেই যেন নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন। আর তাই কথা বা বাণীর ক্ষেত্রেই রবীন্দ্রসঙ্গীত কথাটি বেশি সার্থক, কারণ সুরে সে বহু ও বিচিত্র, সেখানে রবীন্দ্রনাথকে চেনা বেশ কঠিন। কারণ, তিনি কেবল সুরস্রষ্টাই নন, বরং অনেক বড় সুর সংগ্রাহকও। তাই রবীন্দ্রগানের একই অঙ্গে এত রূপ। তিনি যেমন বাণীতে সুর দিয়েছেন, আবার সুরের জন্যও বাণী সৃষ্টি করেছেন। তাই দেখা যায়, একই সঙ্গে রাগ, বাউল ও কীর্তনাঙ্গের সুর, গগন হরকরার সৃষ্ট সুর, উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় সঙ্গীতের সুর নয় কেবল, এশিয়া-ইউরোপের বহু নামি-অনামি সুরকে তিনি নিজের বাণী দিয়ে এমনভাবে গেঁথেছেন, খুব বড় সঙ্গীতবোদ্ধার জন্যও এসব অনেকটা বিস্ময়ের। এভাবে কথার সঙ্গে সুর আর সুরের সঙ্গে কথার বন্ধন দিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন সুরের এক আশ্চর্য জাদুপৃথিবী। রবীন্দ্রনাথের আগে বাংলা সঙ্গীতে এমন দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে।

এসবই কি রবীন্দ্রগানের এখন পর্যন্ত প্রবহমান থাকার প্রধান উপাদান? তাত্ত্বিকভাবে এমনটাই মনে হয়। কিন্তু প্রাণের দাবির সঙ্গে তত্ত্বের যে সবসময় ঐক্য হয়, তো নয়। বরং সমকালীনতা এবং চিরমানবের আকাক্সক্ষা, বেদনা ও সংবেদ যখন বাণী ও সুরে বহমান থাকে, তখন তা হয়ে ওঠে সকলের, এবং সর্বকালের। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের ভেতর দিয়ে এভাবে তাঁর বহু পরের প্রজন্মকেও আচ্ছন্ন, মুগ্ধ আর রসগ্রাহী করে রেখেছেন।

তিনি একই সঙ্গে প্রেম ও পরম, পূজা ও প্রকৃতি, দাস ও দেবতা, স্বদেশ ও সময়, বিশ্ব ও ব্রহ্মাণ্ড, নিজের আমির ভেতর দিয়ে সর্বমানবের অন্তর্গত আমিকে এমন এক মহাকালীন ভাষায় প্রকাশ করেছেন, যার সঙ্গে হয়তো, বিশশতকী জটিল মানুষের অন্তর্গত আবেদনের বিচারে, জীবনানন্দের কবিতার তুলনা করা যায়। কারণ এমন দৃশ্য ও ঘ্রাণসমেত অন্তরবিস্তারী কাব্যসুষমা, সুর বাদ দিলে, এমনকি রবীন্দ্র-কবিতায়ও খুব সুবিস্তৃত নয়। অথচ তা জীবনানন্দে প্রবল-প্রতাপে উপস্থিত।

রবীন্দ্রনাথ যখন সুরে সুরে বলেন : গগনে গগনে বাজে দেয়া, ছায়া ঘনাইছে বনে বনে কিংবা ঝর ঝর ঝরিছে বারিধারা তখন প্রকৃতি তার পুরো প্রাণ নিয়ে আমাদের অন্তরে জেগে ওঠে। অথবা আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্বভরা প্রাণ বা আলোকের এই ঝর্ণাধারায়, কিংবা এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ তখন আঁধার ও আধেয়র ভেতর এক অনুপম বন্ধন তৈরি হয়।

আবার যখন বলেন, মাথার ’পরে খুলে গেছে আকাশের ওই সুনীল ঢাক্না... তখন কবিতার এমন এক দৃশ্যপ্রতিমা তৈরি হয় যে, মনে হয় আমাদের মন-মস্তিষ্কের ঢাকনাও খুলি ছাড়িয়ে আকাশবিস্তারী নীলের সঙ্গে একাত্ম হয়।

এভাবে রবীন্দ্রনাথ সুরের ভেতর কবিতা আর কবিতার ভেতর সুর প্রবেশ করিয়ে এমন এক কথা ও সুরের বিশ্ব গড়ে তোলেন, যার ভেতর আমরা জীবনের আনন্দ-বেদনায় মুহুর্মুহু অবগাহন করতে থাকি, নিজেদের অজান্তেই। নিজের গভীর ভেতরে প্রবেশ করে অন্তরের আমিকে খুঁজে পাই। আমি যে কেবল আমি নই, আমার ভেতরেও যে একটা বিশাল ব্রহ্মাণ্ড আছে, তাকে আবিষ্কার করি আর বিস্মিত-শিহরিত হই...

তখন আমরাও নিজের ভেতরটাকে উন্মোচিত করে, দু হাত শূন্যে ধরে, এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে একীভূত হয়ে অন্তরের গহিন থেকে গেয়ে উঠি : চোখের আলোয় দেখেছিলাম চোখের বাহিরে..., অরূপ তোমার বাণী...,অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো... কিংবা হৃদয় আমার প্রকাশ হল অনন্ত আকাশে...

aikathabib@gmail.com