১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মণি ও ফণির মনোবিশ্লেষণ

  • বিধান রিবেরু

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মণিহারা গল্পটি যাদের পড়ার সৌভাগ্য হয়নি তারা নিশ্চয় সত্যজিৎ রায়ের ‘তিন কন্যা’ দেখেছেন, সেখানে দ্বিতীয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি এই গল্পকে অবলম্বন করেই নির্মিত। গল্প ও চলচ্চিত্রে পার্থক্য থাকবে, সেই পার্থক্য নির্দেশ করা এই রচনার কর্তব্য নয়, বরং দুই প্রধান চরিত্রের স্বরূপ উন্মোচন করাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য সাধন করব সংক্ষিপ্ত আকারে। তবে এর আগে দু’চার কথায় গল্প ও চলচ্চিত্রের একটি পার্থক্য রেখা টানলে মন্দ হয় না।

রবীন্দ্রনাথ ভূতের মুখ দিয়ে গল্প বলিয়েছেন। আর সত্যজিৎ স্বয়ং ভূতকে গল্প শুনিয়েছেন। অন্যদিকে গল্পে মণির দূর সম্পর্কের আত্মীয় মধু আগে থেকেই নিযুক্ত ছিলেন স্বামী ফণিভূষণের ব্যবসায়িক কর্মে। আর চলচ্চিত্রে দেখা যায় মধু গ্রাম থেকে এসেছেন কাজের খোঁজে মণির কাছে। এখানে সত্যজিৎ মণির সঙ্গে মধুর পূর্বসম্পর্কের দিকে একটু ইঙ্গিত করেছেন।

মধুর প্রবেশদৃশ্যে দেখা যায়Ñ মণি ক্ষোভ নিয়ে জিজ্ঞেস করছে, সে কেন এখানে এসেছে? মধু বলেন, কাজ খুঁজছেন তিনি। ঠিক এই সংলাপ বিনিময়ের মাঝেই ফুলের কাঁটা বেঁধে মণির আঙুলে। প্রেমের কাঁটা বলে একটি কথা তো বাংলাতেই প্রচলিত আছেই। অবশ্য সেই পথ মাড়াননি রবি ঠাকুর। এই দুটি পার্থক্য ছাড়া খুব বেশি পার্থক্য চোখে পড়ে না। গল্প ও চলচ্চিত্রের দুই প্রধান চরিত্র মণি ও ফণি, তাদের চরিত্র বেশ বিশদ আকারেই দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। আর সত্যজিৎও চলচ্চিত্রের ভাষায় সেই একইরকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আরও ছোট একটা পার্থক্য অবশ্য আছে, সেটি হলো ফণিভূষণের ব্যবসা সংক্রান্ত। গল্পে ফণি হরীতকী, রেশমের গুটি এবং কাঠের ব্যবসা করেন। কিন্তু চলচ্চিত্রে ফণি করেন পাটের ব্যবসা।

আমরা দেখেছি বা পড়েছি যে, মণির স্বামী ফণি নব্য পুঁজিপতি বা ধনিকশ্রেণী। এবং তিনি স্ত্রীকে ভালোবাসেন, স্ত্রীর ওপর জোর করেন না, মানসিক দূরত্বের কথাও আমাদের অজানা থাকে না। অন্যদিকে মণি হলেন নব্যধনীর স্ত্রী, তিনি না চাইতেই অলঙ্কার পেয়ে যান। একা গুনগুন করে গান গাওয়ার পুরস্কার হিসেবেও স্বর্ণালঙ্কার পান মণি। নিঃসন্তান এই দম্পতি নিজেদের পূর্বের আবাস থেকে দূরে, নদীতীরে এক প্রাসাদ প্রমাণ ভবনে এসে নতুন জীবন শুরু করে। গল্পে ও চলচ্চিত্রে এই জায়গা পরিবর্তনের কারণে দুইরকম ব্যাখ্যা আমরা পাই। ব্যাখ্যা যাই হোক, এই কাহিনীর দুই চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কিন্তু বেশ আকর্ষণীয়। একজনের মন ব্যবসার প্রতি নিবিষ্ট, অন্যজনের নিজের গহনার প্রতি।

এই গল্পের ভেতরে এমন এক সমাজের চিত্র আমরা দেখতে পাই, যখন নব্যপুঁজিপতিদের উত্থান ঘটছে, সামন্তবাদের হাত থেকে নতুন অর্থনীতির দিকে যাত্রা শুরু করেছে নব্যবাঙালি। এবং সেটা খুব একটা পছন্দ করছেন না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমরা দেখি চরিত্রের মুখ দিয়ে ঠাকুর বলছেনÑ

‘নবসভ্যতার শিক্ষামন্ত্রে পুরুষ আপন স্বভাবসিদ্ধ বিধাতাদত্ত সুমহৎ বর্বরতা হারাইয়া আধুনিক দাম্পত্যসম্বন্ধটাকে এমন শিথিল করিয়া ফেলিয়াছে। অভাগা ফণিভূষণ আধুনিক সভ্যতার কল হইতে অত্যন্ত ভালোমানুষটি হইয়া বাহির হইয়া আসিয়াছিলÑ ব্যবসায়েও সে সুবিধা করিতে পারিল না, দাম্পত্যেও তাহার তেমন সুযোগ ঘটে নাই।’

গল্পে দেখা যায়, ধারদেনা থাকায়, বাজারে নতুন কাঁচা টাকা দেখানোর প্রয়োজন পড়ে ফণিভূষণের। কিন্তু নগদ অর্থ সেসময় পাওয়া খুব সহজ ছিল না। কাজেই স্ত্রী মণি মনে করেন, স্বামী বোধহয় তার গহনার দিকেই হাত বাড়াবেন এবং কেড়ে নেবেন। তার ধারণা ভুল ছিল। তারপরও সেই ধারণার বশবর্তী হয়ে সে বাপের বাড়ি পাড়ি জমায়, গহনা সমেত, দূরসম্পর্কের আত্মীয় মধুর সাথে। ঘটনা বুঝতে বাকি থাকে না, পথেই মৃত্যুকে বরণ করতে হয় মণির। এখন মধুই কি সেই খুনি নাকি অন্য ডাকাত এই কর্মটি সাধন করেছে সেই বয়ান কোথাও নেই। এই গোয়েন্দাগিরিতেও আমরা যাব না, আমাদের প্রশ্ন হলো, মণির কাছে গহনা এতো প্রিয় হয়ে উঠল কেন?

ফ্যাটিসিজম অব কমোডিটি বা পণ্যপূজা ব্যাখ্যার ছলে স্বর্ণ জাতীয় পদার্থের প্রতি মানুষের লোভ ও এসব পণ্যের রহস্যজনক আচরণ, সেটার সঙ্গে সমাজের নানা স্তরের মানুষের সম্পর্ক নিয়ে কার্ল মার্কস অবশ্য কথা বলেছেন পুঁজির প্রথম খণ্ডেই। পণ্যের রহস্যময় হয়ে ওঠা কিন্তু পণ্যের গুণে নয়, হয়ে ওঠে মানুষের গুণেই। একটু ভিন্ন দিক থেকে একই কথা বলার চেষ্টা করেছেন, আরেক মহাত্মা জাক লাকাঁ। মানুষই নির্ধারণ করে কোন বস্তু হয়ে উঠবে তার আকাক্সিক্ষত। লাকাঁ মনে করেন, ফ্যালাসের অনুপস্থিতিই সিম্বলিক অর্ডারে নারীর মনে ফ্যাটিশের প্রতি প্রেম জাগিয়ে তোলে। বলা বাহুল্য নয়, মণির অলঙ্কার হলো সেই ফ্যাটিশ। ফ্যালাস বলতে আমরা পেনিস নয় বরং বুঝবো ক্ষমতা। মণি ভালো করেই জানেন, তিনি নিজে ব্যবসায়ী নন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তার নেই, অর্থাৎ তিনি উপার্জন করেন না। ফলে তার একমাত্র সম্বল ওই স্বর্ণালঙ্কার। ভুলে গেলে চলবে না, তিনি নিঃসন্তান।

অন্যদিকে লাকঁাঁর মনোবিশ্লেষণ থেকে আমরা এও জানি, কর্তন ভীতির কারণে ইমাজিনারি অর্ডারে পুরুষের একধরনের ফোবিয়া বা ভীতি কাজ করে। গল্পের ফণিভূষণের কাছে এই ক্যাসট্রেশন বা কর্তন হলো ব্যবসায়িক ক্ষতির সমান। অর্থাৎ তিনি যদি অর্থকড়ি হারান তো সেটাই তার কাছে কর্তনের সমান। এবং এটাকে তিনি ভয় পাবেন সেটাই স্বাভাবিক। ভাষার মাঝেই কি সুন্দর মেটাফোর লুকানো থাকে, লক্ষ্য করে দেখুন বাংলা ভাষায় ‘ধন’ শব্দটি দুই অর্থেই প্রকাশিত। ফণিভূষণ এই গল্পে অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েন এবং তার সন্তান নেই, মানে তিনি অনুর্বর। ধনসম্পদ ফণির কাছে ফ্যালাস বা ক্ষমতার প্রতীক। মণির কাছে ফ্যালাস স্বর্ণালঙ্কার আর ফণির কাছে ফ্যালাস হলো ব্যবসা ও ধনসম্পত্তি। কাজেই এই দু’জন তাদের নিজ নিজ ফ্যালাস ছাড়তে নারাজ।

রবীন্দ্রনাথ গল্প কথকের মুখ দিয়ে প্রশ্ন করছেন (পরে জানা যায় এই গল্পকথকই ফণিভূষণ, বর্তমানে ভূত), স্ত্রীকে কেন ফণিভূষণ নিজের সাথে জোড় করে নিয়ে গেল না? ফণি যখন অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে পুনঃউদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন তখন? উত্তর হলো ঐ ফ্যালাস, মেটাফোর হিসেবে যদি আপনি ফ্যালাসকে এক্ষেত্রে পেনিসও ধরেন তো সেটাই হলো ফণির ধনসম্পত্তি, নিজের স্ত্রী মণি নয়। আর তাই মণি তার কাছে গৌণ। মণিকে ফেলে ফণি এজন্যই চলে যেতে পারেন দূরদেশে। অপরদিকে স্বামীর অর্থবৈভব নিয়ে মণি চিন্তিত নন, কারণ স্বামী মণির কাছে ফ্যালাস নয়, মণির আকাক্সক্ষা ও বাসনার বস্তু হলো ওই স্বর্ণালঙ্কার, যা তাকে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয়, পরিষ্কার করে বললে অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দেয়।

মণির কাছে অবজেক্ট অব ফ্যালাস হলো স্বর্ণালঙ্কার আর ফণির কাছে অবজেক্ট অব ফোবিয়া হলো ধনসম্পত্তি হারানো। গল্পে যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ফণিকে স্ত্রীর প্রতি বেশ সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন, স্ত্রীকে সম্মান করে চলা, স্ত্রীর ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়া এবং স্ত্রীকে খুশি রাখাই ফণির ধর্ম এমনটাই দেখানো হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের বরাত দিয়ে সত্যজিৎ বলছেন, স্বামী এমন নরমসরম ‘কলাগাছের’ মতো দেখেই স্ত্রী তাকে বিশেষ ভালোবাসে না। ঠাকুরের ভাষায় : ‘যদি জিজ্ঞাসা করেন কেন এমন হইল, আমি এ সম্বন্ধে অনেক কথা ভাবিয়া রাখিয়াছি। যাহার যা প্রবৃত্তি এবং ক্ষমতা সেটার চর্চা না করিলে সে সুখী হয় না। শিঙে শান দিবার জন্য হরিণ শক্ত গাছের গুঁড়ি খোঁজে, কলাগাছে তাহার শিং ঘষিবার সুখ হয় না। নরনারীর ভেদ হইয়া অবধি স্ত্রীলোক দুরন্ত পরুষকে নানা কৌশলে ভুলাইয়া বশ করিবার বিদ্যা চর্চা করিয়া আসিতেছে। যে স্বামী আপনি বশ হইয়া বসিয়া থাকে তাহার স্ত্রী-বেচারা একেবারেই বেকার, সে তাহার মাতামহীদের নিকট হইতে শতলক্ষ বৎসরের শান-দেওয়া যে উজ্জ্বল বরুণাস্ত্র, অগ্নিবাণ ও নাগপাশবন্ধনগুলি পাইয়াছিল তাহা সমস্ত নিষ্ফল হইয়া যায়।’

ভূতের কাহিনীর আড়ালে রবীন্দ্রনাথ যেন পুরুষদের মন্ত্রণা দিলেন একটু অধিকার চর্চা করার, স্ত্রীর ওপর। মন্ত্রণা না আক্ষেপ? তো ঠাকুর আক্ষেপ বা যে পরামর্শই দেন না কেন, সেটা আমাদের ফোকাস নয়, এমনকি নারীবাদীরা এটা নিয়ে কি বলবেন সেটাও ভিন্ন জায়গায় আলাপের সুযোগ আছে, এই রচনায় আমি শুধু মণি ও ফণির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের একটি মনোবিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি মাত্র।