২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশে রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য মঞ্চায়ন

  • শেখ মেহেদী হাসান

রবীন্দ্রনাথ ১৯১৯ সালে এই পূর্ববাংলায়, সিলেটের মাছিমপুর বস্তিতে মণিপুরী নৃত্য দেখে শান্তিনিকেতনে নৃত্যশিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। অতঃপর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নৃত্যগুরুদের এনে শান্তিনিকেতনে বিভিন্ন নৃত্যানুষ্ঠান প্রযোজনা করেন। তার নৃত্যনাট্যসমূহের বিষয়বস্তু হিসেবে দ্রোহ ও শ্রেণীমুক্তির প্রসঙ্গ ফুটে উঠেছে। নৃত্যনাট্যে অন্তর্ভুক্ত কাহিনী ও চরিত্র পাঠ করলে জীবনের শাশ্বত সত্য উপলব্ধি করা যায়। তাছাড়া রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যে বিশেষভাবে লোকায়ত জীবন ও মূল্যবোধ প্রাধান্য পেয়েছে। অন্যদিকে তিনি নৃত্যনাট্য রচনার অন্তে সচেতনভাবে প্রাধান্য দিয়েছিলেন সঙ্গীত। তাছাড়া নৃত্যনাট্যের আদিতে রয়েছে গীতিনাট্য। এই গীতিনাট্য একাধারে গান, নৃত্য এবং অভিনয়ের সম্মেলকশিল্প। কিন্তু নৃত্যনাট্যের ছন্দময়তা প্রত্যক্ষ এবং সুস্পষ্ট। এখানে তিনি সমসাময়িক পাশ্চাত্যের সঙ্গে প্রাচ্যসভ্যতার সমন্বয় করার চেষ্টা করেছেন। তার নৃত্যনাট্যের বিষয়বস্তু, গান, গানের সুর, নৃত্যের রূপবৈশিষ্ট্য, অভিনয়, আঙ্গিক ও পরিণতির ব্যাপক সুসম্পর্ক রচনায় বারে বারে কবি নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন। তার উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষকে সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারায় সম্পৃক্ত করা। তাছাড়া এ দেশের নৃত্যকলা ব্যবসাগত পেশায় পরিণত হওয়ায় অনেকে কলুষ ধারণা করতেন। সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ বাঙালি মেয়েদের পায়ের শিকল কেটে পরিয়েছিলেন নূপুর।

১৯২৬ সালের ৮ মে রবীন্দ্রনাথের জš§দিনে শান্তিনিকেতনের কোণার্ক ভবনে মঞ্চস্থ হয় ‘নটীর পূজা’। গীতিনাট্য ‘নটীর পূজা’য় সমগ্র নাটকের মূল সুর অবলম্বনে নৃত্যের বিন্যাস ঘটানো হয়। নটী এ নাচের ভেতর দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। নটীর পূজা পরিবেশনার মাধ্যমে শান্তিনিকেতনে আনুষ্ঠানিক গীতিনাট্য চর্চার সূচনা। অতঃপর শান্তিনিকেতনের বর্ষামঙ্গল, পহেলা বৈশাখ, শরৎ-উৎসব, হোলি উৎসব ইত্যাদি অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ হয়। তিনি বাংলা নাটকের পরিপ্রেক্ষিত ও চরিত্রের মিথস্ক্রিয়ার দর্শকদের কাছে চমৎকার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করেন। অন্যদিকে পূর্ববাংলায়, ঢাকায় প্রথম নৃত্যনাট্য ‘ইন্দ্রের সভা’ মঞ্চস্থ হয় ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এ নৃত্যনাট্যের নির্দেশক ও মুখ্য পারফর্মার ছিলেন গওহর জামিল, সহশিল্পী রওশন জামিল। সঙ্গীত পরিচালনা করেন ওস্তাদ মীর কাশেম খান। ঢাকায় রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যের প্রথম মঞ্চায়ন হয় ১৯৫৬ সালের মার্চ মাসে। ওই সময় বুলবুল ললিতকলা একাডেমির আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতন থেকে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসে। যে দলের নেতৃত্বে ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী শান্তিদেব ঘোষ। সঙ্গে ছিলেন ঠাকুর পরিবারের সুপর্ণা ঠাকুর; শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ও উমা গান্ধী। তাদের তত্ত্বাবধানে ঢাকার আরমানিটোলার ‘নিউ পিকচার হাউস’ বর্তমানে ‘শাবিস্তান’ সিনেমা হলে মঞ্চস্থ হয় নৃত্যনাট্য ‘শ্যামা’। মূলত এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে ঢাকার দর্শকরা শান্তিনিকেতনের প্রযোজনা সরাসরি দেখার সুযোগ পান। ওই সময় থেকে ঢাকাকেন্দ্রিক নৃত্যচর্চায় রবীন্দ্রনাথের ভাবনা সংক্রমিত হয়। রবীন্দ্র নৃত্য ভাবনার মূল সুর হলো রবীন্দ্রনাথের গানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন নৃত্যের বিন্যাস।

১৯৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি নিউ পিকচার হাউসে মঞ্চস্থ করে নৃত্যনাট্য ‘চন্ডালিকা’। চন্ডালিকা নৃত্যনাট্যের প্রধান চরিত্র প্রকৃতির ভূমিকায় অঞ্জলি চক্রবর্তী, মায়ের ভূমিকায় মেহের আহমেদ (বড় খুকী) এবং বৌদ্ধ ভিক্ষু আনন্দের ভূমিকায় মন্দিরা নন্দী রূপ দিয়েছিলেন। দইওয়ালা ছিলেন শাহেদা আহমেদ, চুড়িওয়ালা রাহিজা খানম ঝুনু, ফুলওয়ালী ও সখী হয়েছিলেন রাহিজা খানম, শীলা রায় চৌধুরী ও সেলিনা বাহার। কিছু দৃশ্যে অংশ নিয়েছিল বাফার শিশু-কিশোর শিল্পীরা।

১৯৬১ সালে পালিত হয় রবীন্দ্র জš§শতবার্ষিকী। তৎকালীন সরকার রবীন্দ্র জš§বার্ষিকী উদ্যাপনে বাধা সৃষ্টি করে। তার প্রতিবাদ জানিয়েছিল তৎকালীন তরুণ লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীরা। ওই সময় কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ গ্রেফতার হয়। সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বিচারপতি মাহবুব মোর্শেদকে সভাপতি, অধ্যাপক খান সারওয়ার মুর্শেদকে সম্পাদক করে ঢাকায় রবীন্দ্র জš§শতবার্ষিকী সমিতি গঠিত হয়। ওই বছর ৭, ৮, ৯ ও ১০ মে ৪ দিনব্যাপী মহাসমারোহে রবীন্দ্র জš§শতবার্ষিকী উদ্যাপিত হয়। উৎসবের উদ্বোধন করেন প্রধান বিচারপতি ইমাম হোসেন চৌধুরী। রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান ছাড়াও অজিত সান্যাল পরিকল্পিত ভক্তিময় দাসগুপ্তের পরিচালনায় পরিবেশিত হয় নৃত্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’ ও ‘চন্ডালিকা’। ঘোর আইয়ুব আমলে রবীন্দ্রবিরোধিতা সত্ত্বেও সরকারী কর্মকর্তার স্ত্রী জিন্নাত গনি ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্যে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন। অথচ তিনি পেশাদার নৃত্যশিল্পী ছিলেন না। অন্যদিকে ‘চন্ডালিকা’ নৃত্যনাট্যে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রূপ দেন মন্দিরা নন্দী। আর আনন্দ সেজেছিলেন আমিনুল ইসলাম তুলা। উভয়ের পরিবেশনা ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এছাড়া রবীন্দ্র জš§শতবার্ষিকীতে ঢাকার গোপীবাগ ও প্রেসক্লাব অঞ্চলে আরও দুটি কমিটি গঠিত হয়। তাদের উদ্যোগে আলোচনা সভা, আবৃত্তি ও সঙ্গীতানুষ্ঠান এবং নৃত্যনাট্য ‘তাশের দেশ’ ও ‘শ্যামা’ মঞ্চস্থ হয়। এ সময় ছায়ানটের সূচনা হয়। ছায়ানট মঞ্চস্থ করে নৃত্যনাট্য ‘শ্যামা’। নৃত্য নির্দেশনা দেন মন্দিরা নন্দী ও সঙ্গীত পরিচালনা করেন রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী আতিকুল ইসলাম।

১৯৬৪ সালের ১৪ ও ১৫ জুলাই সন্ধ্যায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বুলবুল ললিতকলা একাডেমির উদ্যোগে মঞ্চস্থ হয় রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য ‘মায়ার খেলা’। নৃত্যে প্রধান দুটি চরিত্র প্রমদার ভূমিকায় অভিনয় করেন রাহিজা খানম, সঙ্গীতে কণ্ঠ দেন নাসরীন চৌধুরী, শান্তার ভূমিকায় ছিলেন ডালিয়া নিলুফার। মায়াকুমারী ছিল ঝুলা রশীদ, ডালিয়া সালাউদ্দীন, মিলি কাজী, শামসুন্নাহার, নাজমা চৌধুরী, শাহীন নাসের ও নাসরীন রহমান। ওই বছর লক্ষেèৗর মরিচ কলেজের ছাত্র বারীন মজুমদার (১৯১৯-২০০২) প্রতিষ্ঠা করেন সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়। এখানে পদ্ধতিগত কত্থক নৃত্যচর্চা শুরু করেন জীনাৎ জাহান (১৯৪০-২০০২)। তিনি নির্দেশনা দেন ‘শ্যামা’ ও ‘মায়ার খেলা’। ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী আতিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে বাবু রাম সিং ও লায়লা হাসানের নৃত্য সংযোজনে কারিগরি মঞ্চে মঞ্চস্থ হয় ‘চিত্রাঙ্গদা’। আলপনা মুমতাজ (১৯৪৮-২০০৪) প্রতিষ্ঠিত ‘কথাকলি সঙ্গীত বিদ্যালয়’ ১৯৭২ সালে দর্শনীর বিনিময়ে মঞ্চস্থ করে ‘চ ালিকা’ নৃত্যনাট্য। তৎপরবর্তীকালে যোগেশ চন্দ্র দাশ, লায়লা হাসান, শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়, শুক্লা সরকার, লুবনা মারিয়াম, শামীম আরা নীপা, শিবলী মহম্মদ প্রমুখ শিল্পী ‘মায়ার খেলা’, ‘শ্যামা’, ‘চ ালিকা’, ‘নটীর পূজা’ নৃত্যনাট্যের নির্দেশনা দেন। এক্ষেত্রে বুলবুল ললিতকলা একাডোম, ধ্রুপদ ললিতকলা কেন্দ্র, নৃত্যাঞ্চল, নৃত্যনন্দন, উপমহাদেশীয় সঙ্গীত প্রসার কেন্দ্র সাধনা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।

রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, সত্য কাজ ব্যক্তিকেই সম্পন্ন করতে হয় এবং সত্য ছাড়া ধর্ম নিষ্প্রাণ। আর এজন্য তিনি বৌদ্ধকাহিনীনির্ভর ‘চিত্রাঙ্গদা’ কিংবা ‘চ ালিকা’ নৃত্যনাট্যে মানুষের জীবনের জটিলতা, কলুষতা, অস্পৃতা দূর করে সাম্যের কথা বলেছেন। বাংলাদেশে মঞ্চস্থ রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যসমূহের মধ্য দিয়ে সে সাম্যের বাণী ছড়িয়ে গেছে সবখানে।