২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্লুটোর পাহাড়ের নাম তেনজিং

  • ইব্রাহিম নোমান

মাউন্ট এভারেস্টের পর এবার প্লুটোর বুকেও তেনজিং নোরগে। ১৯৫৩ সালের ২৯ মে, এডমন্ড হিলারির সঙ্গে প্রথম এভারেস্টে উঠেছিলেন নোরগে। মহাকাশযান নিউ হরাইজনের পাঠানো ছবি থেকে বামনগ্রহে ১১ হাজার ফুট উচ্চতার বরফের পর্বতমালার খোঁজ পেয়েছে নাসা। এভারেস্ট জয়ী তেনজিংয়ের নামেই সেই পর্বতমালার নাম রাখা হয়েছে নোরগে মন্টেস আর এ নামকরণ করেছে নাসা। সৌরজগতের সবচেয়ে ছোট বা বামন গ্রহ প্লুটোকে প্রথমবারের মতো পরিদর্শন করেছে মহাকাশযান নিউ হরাইজনস। আর এর জন্য নয় বছর ধরে প্রায় ৫শ’ কোটি কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে নভোচারীকে। শেষ পর্যন্ত অনুমিত সময়েই মহাকাশযানটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে অবস্থিত জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগারেও বেতার সঙ্কেত পাঠায়। মহাকাশযানটি প্লুটো থেকে ১২ হাজার ৪৭২ কিলোমিটার দূরে দিয়ে (নিউইয়র্ক থেকে মুম্বাইয়ের দূরত্ব) যাওয়ার সময় মহাশূন্যে ভাসমান কণার আঘাতে নিউ হরাইজনস ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলে অনুমান করেছিলেন ব্যবস্থাপকরা। তাদের হিসাবে এর সম্ভাবনা ছিল ১০ হাজার ভাগে একভাগ। কিন্তু সঙ্কেত পাওয়ার মাধ্যমে নিউ হরাইজনস ধ্বংস হয়নি পরিষ্কার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উল্লাসে ফেটে পড়েন প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত বিজ্ঞানী ও কর্মীরা।

প্রতি সেকেন্ডে ১৪ কিলোমিটার বেগে প্লুটোর পাশ দিয়ে উড়েছে মহাকাশযানটি। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (নাসা) বিজ্ঞানীরা বলছেন, খুব দ্রুত এবং ভালভাবেই প্লুটোর কাছে পৌঁছায় নিউ হরাইজনস। প্রথমবারের মতো মানুষের পাঠানো যানের প্লুটো অভিযানে সংগ্রহ করা তথ্যের ৯৯ শতাংশ এখনও নিউ হরাইজনসের ভাণ্ডারেই সংরক্ষিত আছে। এই অবস্থায় মহাকাশযানটি ধ্বংস না হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধ্বংস না হলে সংগ্রহ করা তথ্যগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীতে এসে পৌঁছবে। ওই দূরত্ব থেকে আলোর গতিতে পৃথিবীতে বেতার সঙ্কেত আসতে সাড়ে চার ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হয়। যাত্রা শুরু করার পর বহু দূর থেকেই একের পর এক প্লুটোর ছবি পাঠিয়ে আসছে যানটি। তবে দূর থেকে পাঠানো ছবিগুলো স্পষ্ট ছিল না। যানটি গ্রহের যত কাছে গেছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ছবিগুলো।

১৩ জুলাই সর্বশেষ প্লুটোর বৃহত্তম চাঁদ ক্যারনের ছবি পাঠায় নিউ হরাইজনস। আর ১৪ জুলাই প্লুটোর আরও স্পষ্ট ছবি প্রকাশ করেছেন নাসার বিজ্ঞানীরা। আগামীতে আরও বেশি ছবি ও নতুন নতুন তথ্য পাওয়ার আশা করছেন তারা।

প্লুটোর ১২ হাজার ৫শ’ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছানোর পর নিউ হরাইজনস তার ক্যামেরা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্লুটোর ছবি এবং অন্যান্য তথ্য জোগাড় এবং পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আর সেই সব ছবি ও তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা প্লুটো সম্পর্কে অজানা অনেক তথ্য জানতে পারবেন বলেই আশা করা হচ্ছে। সর্বশেষ প্লুটোর বৃহত্তম চাঁদ ক্যারনের ছবি পাঠিয়েছে নিউ হরাইজনস। এ ছবি থেকে প্লুটো আর এর চাঁদের অবয়বে বহু বৈপরীত্য লক্ষ্য করেছেন বিজ্ঞানীরা।

তবে ১৪ জুলাইয়ের তোলা ছবিগুলো যে আগের ছবির চেয়ে ৫শ’ গুণ ভাল ছবি, এ ব্যাপারে আশাবাদী বিজ্ঞানীরা। এসব ছবি বিশ্লেষণ করে সমাধান করা যাবে একাধিক রহস্যের। কিভাবে তৈরি হয়েছে সৌর পরিবারের গ্রহগুলো? কিভাবেই বা তাদের একেকটি উপগ্রহ থাকে (পৃথিবীর বেলায় যেমন চাঁদ)? এত দূরের লক্ষ্যে পৌঁছতে নিউ হরাইজনস যাত্রা শুরু করেছিল প্রায় নয় বছর আগে, ২০০৬ সালে।

মঙ্গলগ্রহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পাঠানো মহাকাশযানের তুলনায় প্লুটোতে পাঠানো নিউ হরাইজনস ৫ হাজার গুণ বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে বলেই দাবি বিজ্ঞানীদের। সৌর জগতের ‘বামন গ্রহ’ প্লুটোর বুকে পৃথিবীর মতোই সুউচ্চ বরফের পাহাড় আছে। নিউ হরাইজনস মহাকাশযান থেকে পাঠানো প্লুটোর ছবিতে এমনটিই দেখা গেছে। প্লুটো ও এর চাঁদ ক্যারনে ভৌগলিক সক্রিয়তার লক্ষণও ছবিতে ধরা পড়েছে। প্লুটো অভিযানের এক বিজ্ঞানী জন স্পেনসার বলেন, প্রথম কাছ থেকে তোলা প্লুটোর ভূপৃষ্ঠের ছবিতে গত ১০ কোটি বছর ধরে বেশকিছু ভৌগলিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এর ভূমি পুনর্গঠিত হয়েছে।

ফলে এটি পরিষ্কার যে, প্লুটো নিস্তেজ এবং মৃত গ্রহ নয়। তাছাড়া, প্লুটোতে তেমন কোন গর্তও দেখা না যাওয়ায় বিজ্ঞানীদের ধারণা, এ গ্রহ ও এর চাঁদ এখনও সক্রিয় রয়েছে।

প্লুটো অভিযানের প্রধান বিজ্ঞানী এ্যালান স্টার্ন বলেছেন, ‘আমরা এখন এমন এক বিচ্ছিন্ন, ছোট গ্রহ পেয়েছি, যেটি সাড়ে ৪শ’ কোটি বছর পরও সক্রিয় রয়েছে।’

বিজ্ঞানীদের প্রদর্শিত ছবিটিতে প্লুটোয় হৃদপি- আকৃতির একটি এলাকার একপ্রান্তে পাহাড়ও দেখা গেছে, যার উচ্চতা ১১ হাজার ফুট। বিজ্ঞানীরা একে উত্তর আমেরিকার পাথুরে পাহাড়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

বিজ্ঞানী জন স্পেনসার বলেন, প্লুটোর ভূপৃষ্ঠে মিথেন, কার্বন মনোক্সাইড এবং নাইট্রোজেন আইসের প্রলেপ পাতলা হওয়ার কারণে তা পাহাড় সৃষ্টি হওয়ার উপযোগী নয়। ফলে এ পাহাড় সম্ভবত পানি জমাট বাঁধা বরফের স্তর দিয়েই গড়ে উঠেছে। আর প্লুটোর তাপমাত্রাও এ ধরনের বড় বড় পাহাড়ের জন্য উপযোগী।প্লুটোয় এ সফল অভিযান মানবজাতির ইতিহাসে যুক্ত হল আরেকটি মাইলফলক। এতে সৌরজগতের সব গ্রহেই মানুষের পাঠানো যানের সফলতা নিশ্চিত। মহাকাশযান পাঠিয়ে মানুষ যেভাবে এর আগে সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ সম্পর্কে জানতে পেরেছে, সে পথে প্লুটোই ছিল শেষ গ্রহ, যার কাছে পৌঁছতে পেরেছে মানুষের তৈরি কোন মহাকাশযান।

তবে বিজ্ঞানীদের একাংশ প্লুটোকে পূর্ণাঙ্গ গ্রহ হিসেবে মানতে নারাজ। এখন দেখার বিষয় নিউ হরাইজনের পাঠানো তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা কি সিদ্ধান্ত নেন।

সূত্র : নাসা, বিবিসি