১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্বের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ফুল

  • এনামুল হক

সেরা ফুলের তোড়া হলো সেটাই যেখানে একই সঙ্গে নানা বর্ণের, নানা আকারের ফুলের সমাবেশ থাকে। যেখানে ফুলের পাপড়িগুলো কোনটা খাঁজকাটা হলদে, কোনটা গোলাকার লাল আবার কোনটা লম্বাটে গোলাপী; যেখানে ফুলের মাঝখানটা হলদে, গোলাপী, সবুজ বা কালো। অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো, এই ফুলের তোড়ার ফুলগুলো ভিন্ন ভিন্ন জাতের নয়, বরং সবই এক জাতের। সেটা হলো দক্ষিণ আফ্রিকার এক প্রজাতির ডেইজি- নাম গরটেরিয়া ডিফিউমা। আরও অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, এই একই ফুল ১৪টি ভিন্ন ভিন্ন রূপে হাজির হয়, যার কারণে এটা বিশ্বের সবেচেয় বৈচিত্র্যময় ফুল।

একই ফুল কিভাবে ১৪টা ভিন্ন ভিন্ন রূপে হাজির হয়Ñ সে প্রশ্নের সঠিক উত্তর এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে নেই। তবে তাদের গবেষণায় দেখা গেছে যে, ডেইজির এই একটি রহস্যময় প্রজাতিই হলো এক বিবর্তনমূলক সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে কতিপয় ক্ষুদ্র মৌমাছি, যৌনক্রিয়া ও প্রতারণার বিষয় যুক্ত। আর এই সংগ্রাম থেকেই আজ একটি প্রজাতির ফুলে বিস্ময়কর রকমের ভিন্ন ভিন্ন রূপ সৃষ্টি হয়েছে।

ফুলগাছ পয়গায়নকারী কীটপতঙ্গ আকৃষ্ট করার জন্য মুকুল সৃষ্টি করে। কীটপতঙ্গ মুকুলে বসে মধু আহরণের সময় এক ফুল থেকে আরেক ফুলে পরাগ বয়ে নিয়ে যায় এবং এভাবে উদ্ভিদের প্রজনন ঘটে। ফুলগাছ যারা পালেন তারা কৃত্রিম উপায়ে নানা ধরনের ফুল সৃষ্টি করতে সক্ষম। প্রকৃতিতে নতুন নতুন পরগায়নকারীর আগমনের মধ্য দিয়ে ফুলের আকার-আকৃতির বিবর্তন ঘটে। ভিন্ন ধরনের ফুল দেখলে পরাগায়নকারী নতুন কীটপতঙ্গ আকৃষ্ট হয় এবং সেই ফুলের তখন অধিকতর বংশবিস্তার ঘটে। এতে করে নতুন বর্ণ ও আকার-আকৃতি নির্ধারণের জন্য ফুলের ওপর চাপ তৈরি হয়। কিন্তু বহু বর্ণের এই ডেইজি ফুলটি মোটেও এই ধারার মধ্যে পড়ে না। কারণ এই ফুলের ১৪টি ভিন্ন ভিন্ন রূপের সবগুলোর পরাগায়নের কাজটা একই কীটপতঙ্গের দ্বারা ঘটে। সেটা হলো মেগাপালপাস কাপেনসিস নামে ছোট জাতের এক মৌমাছি। নিশ্চয়ই এরমধ্যে অন্য কিছু চলে। কী চলে তার একটা সূত্র এই ফুলের গঠনের মধ্যে পাওয়া যাবে।

দক্ষিণ আফ্রিকার এই ডেইজি ফুলটি ১৪টি ভিন্ন ভিন্ন রূপে পাওয়া গেলেও প্রকৃতপক্ষে এই ফুলগাছটি তিন ধরনের। প্রথমটি হলো এমন ধরনের যার কাজ শুধু খাওয়ানো। এই শ্রেণীর ডেইজি ফুল মধু ও পয়াগ যোগায়। এর পাপড়িগুলো এক রঙা এবং যথেষ্ট মসৃণ। পাপড়ির পৃষ্ঠদেশ সমতলÑ এখানে ত্রিমাত্রিক কিছু নেই। পুরুষ ও স্ত্রী মৌমাছি এসব ফুলের বুকে বসে স্রেফ মধু আহরণ করে চলে যায়।

দ্বিতীয়টি হলো পর্যবেক্ষণ রূপে। এই ফুলও পুরুষ ও স্ত্রী মৌমাছিকে মধু ও পরাগ যোগায়। তবে এটা ছাড়াও তারা অন্য একটা কিছুও করে। ফুলগুলো পাপড়ির গায়ে এমন দাগ তৈরি করে, যা দেখতে লাগে স্ত্রী মৌমাছির মতো। এই দাগগুলো সূর্যালোকে জ্বল জ্বল করে ওঠে পুরুষ মৌমাছিদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে। তারা তখন উড়ে এসে ওই কালো দাগের উপর বসে এবং তারপর আবার উড়ে চলে যায়। তবে ওই দাগ দেখে তারা এতটা বোকা বনে যায় না যে, সেগুলোর সঙ্গে সঙ্গমের চেষ্টা করবে।

তৃতীয় ধরনের ডেইজি ফুল সবচেয়ে বেশি ভাঁওতার আশ্রয় নিয়ে থাকে। এরও পাপড়ির গায়ে দাগ থাকে। তবে প্রতিটির গায়ে নয়। দাগগুলোও সত্যিকারের স্ত্রী মৌমাছির মতো দেখায়। পাপড়ির গায়ে স্ত্রী মৌমাছি বসার কারণে একটা দাগ পড়ে। তবে পাপড়ি যেহেতু একেবারে সমতল নয় বরং ত্রিমাত্রিক তাই দাগটিও জটিল রূপ ধারণ করে। এটি উপরিতল থেকে খানিকটা উঁচু হয়ে থাকে এবং তাতে খাঁজও থাকে। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে দাগগুলোকে সত্যিকারের মৌমাছি বলে মনে হবে।

কিন্তু এই দাগ দেখে সত্যিই কি পুরুষ মৌমাছি আকৃষ্ট হয়? এর উত্তর পাওয়ার জন্য উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা একটি গবেষণা চালান। তাঁরা এ দাগওয়ালা ফুল ও দাগবিহীন ফুলগুলোকে পরস্পর থেকে আলাদা করেন এবং মৌমাছিকে তাদের পছন্দমতো ফুলের গায়ে বসার সুযোগ দেন। দেখা যায় যে, সেসব ফুলে ওই দাগ নেই সেখানে খুব কম মৌমাছি গিয়ে বসেছে এবং দাগযুক্ত ফুলের গায়ে মৌমাছিও ভিড় জমিয়েছে। তা থেকে প্রমাণ হয় যে, ওই দাগ পুরুষ মৌমাছির মধ্যে যৌন আকর্ষণ সৃষ্টি করে। তারা এসে ওই দাগের উপর বসে এবং যৌন মিলনের চেষ্টা করে। এতে করে ওই ফুলের পরাগায়নের সুযোগ ও সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

ডেইজি ফুলের গায়ে এমন দাগের উপস্থিতি এক অসাধারণ ব্যাপার। এর আগ পর্যন্ত মনে করা হতো উদ্ভিদ জগতের মধ্যে একমাত্র অর্কিডই পরাগায়নের জন্য কীটপতঙ্গকে যৌনতার দ্বারা প্রতারিত করে আকৃষ্ট করে থাকে। এখন দেখা গেল ডেইজি ফুলও তা করে থাকে।

উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে আরও একটি পরীক্ষা চালান। তাঁরা একটি ইলেক্ট্রনিক মাইক্রোস্কোপ দিয়ে ডেইজি ফুলের গায়ের ওই দাগগুলো স্ক্যান করে দেখেন, মৌমাছির দেহ থেকে যেভাবে অতিবেগুনী রশ্মি বিকীরিত হয়, পাপড়ির ওই দাগ থেকেও একই ভাবে ওই রশ্মির বিকিরণ ঘটে।