২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঈদের আনন্দ-বেদনা

  • মেধা নম্রতা

ঈদ মানে খুশি, আনন্দ। দীর্ঘ এক মাসের সংযম রোজা পালনের পর সারাবিশ্বের মুসলমানরা ঈদের দিন আনন্দে মেতে ওঠে। এদিন সকালে ঈদের নামাজ আদায় করে বিশ্বের সকল মুসলিম। এরপর শুরু হয় ঈদের কোলাকুলি এবং হাত মেলানো। তারপর মিষ্টি মুখ। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নতুন কাপড় পরে প্রজাপতির মতো ছোটাছুটি করে। মুসলমানদের সব চেয়ে বড় অনুষ্ঠান হল ঈদ। এ দিন ধনী-গরিবের কোন ভেদাভেদ থাকে না। সকলেই সমান। রাসূলে পাক হযরত মুহাম্মদ (সা) যখন প্রথম মদিনায় আসেন, তখন মদিনাবাসী দুটো উৎসব পালন করত। নবী করিম মদীনাবাসীর কাছে জানতে চাইলেন, ‘এই দুটি দিনের তাৎপর্য কী?’ তারা জানাল, ‘জাহিলিয়াতের আমরা এই দুটি দিনে আনন্দ উৎসব পালন করতাম।’ রাসূলুল্লাহ (সা) তখন তাদের বললেন, ‘মহান আল্লাহ তোমাদের আনন্দ করার জন্য এই দুই দিনের পরিবর্তে আরও উত্তম কিছু দিয়েছেন, তা হলোÑ ইয়াওমুদ্দুহা ও ইয়াওমুল ফিতর।’ -আনাস ইবন মালিক (রা)

সারাবিশ্বের ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা পবিত্র রমজানের রোজা পালন করেছেন। বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদা এবং ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায় এই সংযমের মাসটিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রাসূলে নবী (সা)-এর শিক্ষা অত্যন্ত সহবতের সঙ্গে পালন করেছে। মসজিদে পবিত্র কোরআনের খতম পাঠ করা হয়েছে। প্রতিদিনের তারাবীহ নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে সারা জাহানের মানুষদের জন্য শুকরিয়া আদায় করা হয়েছে। এর সঙ্গে সারা বছরের গুনাহের মাফ চেয়ে আল্লাহর দরবারে করুণ প্রার্থনা করা হয়েছে। গরিব ও এতিমদের জন্য দান খয়রাত করা হয়েছে। এই সময় মুসলমানরা তাদের ওপর ধার্য করা যাকাত দিয়ে পরিবারের গরিব আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী দুস্থদের এমনকি দূরের গরিব চেনাজানা পরিচিতদের সাহায্য করে থাকে। যাকাত দেয়া ইসলামে ফরজ বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। ঈদের সময় ধনী মুসলিমরা তাদের সম্পদ এবং ব্যবসার লাভের ওপর এবং স্ত্রীলোকের অলঙ্কারের ওপর ধার্য করা যাকাত দান করে আল্লাহর নিকট ঋণমুক্তির জন্য প্রার্থনা করে। অনেকেই ঈদের পরে হজে যায়। এ সময় তারা পার্থিব পৃথিবীর যাবতীয় ঋণ শোধ করে তবেই হজ উপলক্ষে পবিত্র কাবা শরীফের উদ্দেশে রওনা হয়। ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এগুলো হচ্ছেÑ ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাত। এ পাঁচটি স্তম্ভ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাই ঈদের আনন্দের সঙ্গে ধনীদের প্রতি আল্লাহ ফরমান করেছেন যে, যাকাত দানের মাধ্যমে গরিব মুসলমানরাও যেন ঈদে আনন্দ করতে পারে। ঈদে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ‘ফিতরা’ হিসেবে দান করা হয়। এই ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় ইসলামী বিধান মতে। ফিতরা গরিব বা গৃহকর্মীকে দেয়া হয়।

ইসলাম একটি সাম্যের ধর্ম। ঈদের দিন নবী করিমের নিজের বাড়িতে অতি সামান্য আয়োজন হতো। এরপরও তিনি এতিম, দুঃখী, গরিব শিশুদের তার বাড়িতে নিয়ে খাইয়ে দিতেন। কথিত আছে, একবার নবীজী ঈদের নামাজ পড়তে বেরিয়ে দেখেন কয়েকটি শিশু নতুন কাপড় পরে খেলা করছে আর খেলার মাঠের পাশে দুটি এতিম শিশু পুরাতন কাপড়ে বসে কাঁদছে। তিনি তাদের সঙ্গে করে বাসায় নিয়ে আসেন এবং নতুন কাপড় পরিয়ে হযরত আয়শাকে (রা) দেখিয়ে বলেন, আজ থেকে আমি তোমাদের বাবা আর ইনি তোমাদের মা। তারপর বিবি ফাতেমাকে (রা) বলেন, মা ওদের কিছু খেতে দাও। এই আনন্দের দিনে এতিমরা না খেয়ে থাকলে কোন মুসলমানের ঈদ আনন্দপূর্ণ হতে পারে না। অথচ নবীজীর এই শিক্ষা আমরা গ্রহণ না করে ঈদের দিনে অঢেল আনন্দ উল্লাসে ভুলে যাই। এই দেশে বেশির ভাগ মানুষ ঈদের দিনে একটু ভাল রান্না করতে পারে না, ভাল খাবার খেতে পারে না, নতুন জামাকাপড় পায় না। একটু ভাল খাওয়ার আশায় তারা ধনীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়। কখনও কিছু পায়, আবার কখনও লাথি চড় খেয়ে ফিরে আসে।

সম্প্রতি বাংলাদেশকে নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশে এখন কেউ না খেয়ে মরে না। সকলেই শিক্ষা এবং চিকিৎসার সমান সুযোগ পাচ্ছে। এটি সত্য যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভাল। দেশে ধনী লোকের সংখ্যাও কম নয়। এই ধনীদের মোট সম্পদকে গড় করেই আজ বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ। সেক্ষেত্রে ধনীদের সম্পদে গরিবের অধিকার রয়েছে। ইসলাম ঠিক এ কথাটিই বলেছে যে, ধনীরা যেন যাকাত দেয়ার মাধ্যমে তাদের সম্পদের ওপর প্রাপ্য গরিবের অধিকারকে পূর্ণ মর্যাদা দেয়।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, দেশে ভোগীদের সংখ্যা প্রকটভাবে বেড়ে গেছে। নারী পুরুষরা ইচ্ছামতো টাকা খরচ করেছে তাদের নিজস্ব চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে। অনেকে লক্ষ, অর্ধলক্ষ টাকার জামা জুতো শাড়ি প্রসাধনী কিনেছে। বসুন্ধরা শপিংমল, আড়ং, প্রিন্স প্লাজা, নিউমার্কেট, হকার্স মার্কেট ছাড়িয়ে বনানী গুলশানের ভাসাবি, নাবিলা, জারা, আর্টিস্টিতে বিক্রি হয়েছে লাখ লাখ টাকার শাড়ি গয়না, শার্ট-প্যান্ট, পাঞ্জাবি, ফতুয়া। অথচ গরিবের ছেলেমেয়েরা সাধারণ দামের একটি নতুন জামা কিনতে পারে না। ঈদ এলেই পাইকারি ব্যবসায়ীরা ফুটপাথে দোকান সাজিয়ে বসে। তাতে থাকে কম দামের জামা-কাপড়, শাড়ি-চুড়ি। হাল ফ্যাশানের জামার গরিবী সংস্করণ। অথচ তাই কেনার টাকা থাকে না গার্মেন্ট শ্রমিক, রিক্সাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, তরকারি ফেরিওয়ালা, মাছওয়ালা, গৃহকর্মী এবং স্বল্পআয়ের বা অনিয়মিত আয়ের লোকদের। এতিমদের দেখার কেউ নেই। তারা এখনও ধনীদের জন্য বানানো শপিংমলের সামনে সাহায্য পাওয়ার আশায় ভিক্ষে করে। তাদের ছেলেমেয়েরা নতুন কাপড় পায় না। পুরনো কাপড়ে অসন্তুষ্ট অসুখী মনে ঈদ করে। এদের ছেলেরাই দুটো পয়সার জন্য হাইজ্যাক করে। গ্রামে মা-বোনকে ঈদে কিছু দেবে বলে চুরি-চামারী করে ধরা খায়; মার খায়। কিন্তু আবার অভাবের কাছে দারিদ্র্যের লজ্জা জমা রেখে অন্যায় পথে নেমে পড়ে। বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত যত চুরি, পকেটমারী হয়েছে তাদের অধিকাংশ গরিব। কাজ নেই, খাবার নেই, থাকার জায়গা নেই, অথচ এই উন্মুল মানুষদের জীবনেও ঈদ আসে। ঈদ তো সবার জন্য। অভাবী দরিদ্র মানুষের জীবনে ঈদ হাহাকার আর দুঃখ নিয়ে আসে।

অথচ ইসলামে বলা আছেÑ তোমার প্রতিবেশী কেউ না খেয়ে থাকলে তোমার অন্ন ভাগ করে নাও। গরীবরা তো আর প্রতিবেশী হয় না। তারা ধনীদের দুয়ারের বাইরেই থাকে। তারা ধনীদের ভাইবোন আত্মীয়স্বজন নয় যে, ধনীরা তাদের খোঁজখবর তত্ত্বতালাশ নেবে। কিন্তু ইসলামের নবী এমন-ই একজন এতিম দীন ছিলেন। তাই তিনি সমাজের দলিত শ্রেণীর সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতেন। ঈদের দিন তিনি সকলের খোঁজখবর নিতেন। এমনকি এই পবিত্র ঈদের দিনে তিনি পুরনো ঝগড়া ভুলে গিয়ে সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকার কথা বলে গেছেন। আমাদের দেশের ধনীরা কেবল নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ এই ধনীরা যে কোন একটি গরিব পরিবারকে আর্থিক সাহায্য করলে তারা উঠে দাঁড়াতে পারে।

বলা হয় নারী হচ্ছে মাতৃরূপী। পবিত্র ঈদে নারীরা তাদের মায়াময় হাতে গরিবদের জন্য দান করলে খুশি হয় গরিবরা। অনেকে যাকাতের শাড়ি দেয়। এই কাপড় পরেই অনেক দুস্থ মহিলা সারাবছর পার করে। অনেক মহিলা আছে তারা তাদের গয়নার ওপর যাকাত দেয়। আবার অনেক মহিলা আছে যারা এতিমদের জন্য খাবার পাঠায় বিভিন্ন এতিমখানায়। তাই মহিলাদের উদার হাতে দান করে স্বামী-সন্তান-সংসার এবং নিজের জন্য গরিবদের কাছ থেকে বেশি বেশি দোয়া গ্রহণ করা উচিত।