২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উৎসবের সাজ

  • অনন্যা জহির

আমি বর্ষা, আসিলাম গ্রীষ্মের প্রদাহ শেষ

করি মায়ার কাজল চোখে,

মমতার বর্মপুট ভরি -সুফিয়া কামাল

ঋতু চক্রে দ্বিতীয় এই ঋতু, বর্ষাকাল যাত্রা শুরু করে গ্রীষ্মের পিপাসার্ত বাংলাদেশকে তৃষ্ণা নিবারণের প্রতিজ্ঞা নিয়ে। আর এইবার এই বর্ষায় শুরু হয়েছে মহান আল্লাহতা’আলার রহমতের মাস রমজান। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পরই এসেছে খুশির ঈদ। তাই এই খুশির ঈদেও ছিল মেঘ-বাদলের ছোঁয়া। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলেছে ঈদের সমস্ত প্রস্তুতি। আর এই প্রস্তুতিতে একটু বাড়তি খুশির আমেজ যেন যোগ করে দেয় প্রতিটি নারী। কিশোরী থেকে বৃদ্ধা, গৃহিণী থেকে কর্মজীবী, সব ধরনের নারীই চায় নিজেকে ফুটিয়ে তুলতে অপরূপ সাজে। বর্ণিল এই ঈদকে সামনে রেখে কেউ বা মিলিয়ে নিয়েছেন নিজের পছন্দ মতো রঙে কিংবা ঢঙে, কেউ বা খুশি রেডিমেড পোশাকে। কেউ আবার নিজেকে সাজাতে চান আটপৌরে শাড়ীতে।

যারা নিজের পছন্দ এবং ডিজাইন অনুযায়ী কাপড় তৈরি করে নিতে চান, তারা অবশ্য আরও কিছুদিন আগে থেকেই শুরু করেন ঈদের পোশাক তৈরি করার কাজটি। কারণ রোজা শুরু হওয়ার আগেই ঈদের অর্ডার নেয়া শুরু হয়ে যায় দর্জিবাড়ির। আর ১৫ রোজার পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। শেষে চলে রেডিমেড পোশাক এবং আনুসাঙ্গিক কেনার ধুম। শাড়ি, যে পোশাকটি একজন বাঙালী নারীকে সর্ব প্রথম আকর্ষণীয় করে তোলে, সেটিই হচ্ছে শাড়ি। তাই একজন নারীর প্রথম পছন্দের তালিকাতেই থাকে শাড়ি। সমস্ত শ্রেণী-পেশার নারীই শাড়ি পরতে পছন্দ করেন। বৈচিত্র্যময়তার দিক থেকে সাধারণ অথবা জমকালো যে কোন ধরনের লুক দিতে পারে এই পোশাকটি। তাই ঈদের কেনাকাটায় শাড়ির প্রতি নারীদের থাকে বাড়তি ঝোঁক। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি ঈদেই এক বিশাল পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। ঈদেও তার ব্যতিক্রম নয়। ঈদে দিনের বেলার জন্য অনেকেই বেছে নেন সুতির শাড়ি। সুতির শাড়ি কেবল ঐতিহ্যবাহী এবং আরামদায়কই নয়, স্টাইলিশও বটে। যুগ যুগ ধরে সুতির শাড়ি তার রঙ-রূপ পাল্টেছে, কিন্তু এর কদর কমেনি এতটুকু। আঁচল ও পাড়ের বিভিন্নতায় এইবারের ঈদে নারীরা ঝুঁঁকেছেন তাঁত, কোটা, চেক, কুঁচি প্রিন্ট অথবা জামদানির দিকে। আবার ব্লক প্রিন্ট, বুটিক, স্ক্রিন প্রিন্ট, ভেজিটাবেল ডাই, এপ্লিক, এ্যাম্ব্রয়ডারি করে নতুন রূপ দেয়া সুতির শাড়িও রয়েছে পছন্দের তালিকায়। আবার রাতের বেলার জন্য বেছে নিয়েছেন জমকালো শাড়ি হিসেবে পাশ্চাত্যের ঢঙে তৈরি করা শাড়িগুলোকে। এসব শাড়ির বেশির ভাগই তৈরি জর্জেট, শিফন কিংবা নেটকে বেইজ করে ভারি এ্যাম্ব্রয়ডারির কাজকে ঘিরে। কেউ কেউ আবার দেশীয় শাড়ি হিসেবে খ্যাত কাতান কিংবা বেনারসিও বেছে নিচ্ছেন। ফ্যাশনসচেতন নারীরা প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে করে পোশাকটির রংও মিলিয়ে নিয়েছেন। এখন যেহেতু বর্ষাকাল চলছে, তাই এই ঈদ নারীরা শাড়ির রং হিসেবে প্রাধান্য দিচ্ছেন নীল, সবুজ, আসমানি, গোলাপি, ম্যাজেন্টাকে। বৈচিত্র্যময় শাড়ির সঙ্গে সঙ্গে এবার নারীরা মনযোগী হয়েছেন ব্লাউজের দিকেও। ঈদকে সামনে রেখে এসেছে নানা কাটের এবং নানা রকমের, হরেক ডিজাইনের ব্লাউজ। এদের ভেতর বোট নেক, হাই নেক, সিøভলেস উল্লেখযোগ্য। ফ্যাশনপ্রেমী নারীরা একটু বাড়তি বৈচিত্র্য যোগ করার জন্য যার যার পছন্দ অনুযায়ী এসব ব্লাউজ বেছে নিয়েছে এই ঈদে।

সালওয়ার-কামিজ, কিশোরী থেকে তরুণী, এবারের ঈদে প্রায় সকলেরই পছন্দের তালিকায় ছিল লং কামিজ। এসব লং কামিজ তৈরি হয় হরেক রকমের কাট আর বাহারি ডিজাইনকে সমন্বয় করে। জর্জেট এবং চিকেনের কামিজ তৈরি হয়েছে বাহারি কারুকাজ নিয়ে, কিংবা কামিজের নিচের দিকটায় থাকছে পুতি-চুমকি বসানো বাড়তি নক্সাদার লেস অথবা এ্যাম্ব্রয়ডারি। এসব সালওয়ার-কামিজ তৈরি এবং বিক্রি হয়েছে বর্ষাকালের প্রাধান্য পাওয়া রংগুলোকে মাথায় রেখেই। সালওয়ার-কামিজের স্টাইলে এবারের ঈদে বিশেষ সংযোজন ‘কোটি’র ব্যবহার। ডিজাইনে বৈচিত্র্য আনতেই কামিজে কোটি যুক্ত করা হয়েছে। এমনটাই জানালেন আমাদের দেশীয় ফ্যাশন ডিজাইনারা। অপর দিকে ভারতীয় ডিজাইনে তৈরি কিছু পোশাকও জায়গা করে নিয়েছে এই বারের ঈদ বাজারে। ‘সারারা’, ‘ফ্লোর টাচ গাউন’, ‘কিরনমালা’, ‘ভিনয় কোশিশ’ ইত্যাদি নামে পরিচিত পোশাকগুলো দামে একটু ভারি হলেও ডিজাইন, সুতা ও কারুকাজের মান ভেদে জমকালো এবং নজরকাড়া। এই পোশাকগুলো মূলত বিয়ে ও পার্টি আমেজে পরা হয়ে থাকে। একারণেই এই পোশাকগুলো তরুণীদের মনে জায়গা করে নিয়েছে।

ওয়েস্টার্ন পোশাক, এবারের ঈদে ওয়েস্টার্ন পোশাকও কিনেছে তরুণীরা। অন্যান্য ওয়েস্টার্ন পোশাকের পাশাপাশি এবার বেশি চলেছে হালকা সিøভলেস টপস ও স্কিন টাইট প্যান্ট। অনেকে লং-স্কার্টও কিনেছেন। এছাড়াও চলেছে ‘ম্যাক্সি গাউন’ নামের এক ধরনের ওয়েস্টার্ন পোশাক। গয়না, গয়না নারীর সৌন্দর্যে যোগ করে এক অনন্য মাত্রা। প্রতিবার ঈদ এলেই সোনা, রুপার মতো মূল্যবান ধাতববস্তুর তৈরি গয়নার চাহিদা বেড়ে যায়। ঈদেও তার ব্যতিক্রম না। আবার সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ কেউ কিনে থাকেন হিরার তৈরি গয়নাও। কিন্তু এবার এসব মূল্যবান গয়নার পাশাপাশি তরুণীদের মনে জায়গা করে নিয়েছে অন্যান্য ধাতব, মুক্তা, মাটি, কাঠ, পুতি কিংবা কাপড়ের তৈরি নানা রকমের, হরেক ডিজাইনের আকর্ষণীয় এবং জমকালো গয়নাগুলো। এসব গয়না একদিকে যেমন নজরকাড়া, অপরদিকে তেমনই সাধ্যের নাগালে। শিশুদের পোশাক, বড়দের পাশাপাশি ছোটদের জন্যও সেজেছে এইবারের ঈদ বাজার। ফ্রক, ঘাঘরা-চোলি, স্কার্টের পাশাপাশি বড়দের অনুকরণের সকল পোশাক পাওয়া গেছে এবারের ঈদ বাজারে। ইস্টার্ন কিংবা ওয়েস্টার্ন, সকল পোশাকই তৈরি করা হয়েছে শিশুদের কথা মাথায় রেখেই। তাই পোশাকগুলো একদিকে যেমন আরামদায়ক অন্যদিকে তেমনি জমকালো এবং নজরকাড়া। ছোটবড় সকলের জন্য ঈদ আসে আনন্দের বন্যা নিয়ে। নতুন কাপড় ছাড়া এই ঈদের আনন্দ যেন প্রায় অসম্পূর্ণ। আর এই আনন্দের বহির্প্রকাশ ঘটে নতুন কাপড় কেনার মাধ্যমে। তাই রোজার পুরো এক মাসজুড়েই চলে এই কেনাকাটা। এতে করে দেশের অর্থনীতি যেমন পায় এক নতুন মাত্রা, তেমনি আনন্দের বহির্প্রকাশও ঘটে পুরোপুরি।

মডেল : স্পর্শিয়া, ছবি : আরিফ আহমেদ