২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জীবনযাপন ॥ ঈদের আগে-পরে

  • অঞ্জন আচার্য

কাজী গুলশান আরা দিপা, গৃহিণী

রমজান মাসকে ঘিরে বাঙালীর নিজস্ব একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। আর আমাদের দেশের গৃহিণীদের জন্য রমজান মাসটা সত্যিকার অর্থেই বেশ আয়োজনের ব্যাপার। শৈশব-কৈশোরে ঈদ-আনন্দের হাতছানিতে রোজার দিনগুলো ছিল স্বপ্নবিভোর। পরিবারের সবাই মিলে দিনশেষে ইফতার পর্ব বা সুবেহ্ সাদিকের আগে সেহ্রি পর্ব রীতিমতো উৎসবমুখর ছিল। কিন্তু সংসার ব্যবস্থাপনায় পরিবারের আর সকলের নির্বিঘœ রমজান মাস নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব গৃহিণীকেই কাঁধে নিতে হয়। শব-ই-বরাত-এর আগ থেকেই পরিকল্পনা করে গুছিয়ে নিতে হয় সবকিছু। কেননা, রমজান মাসের বাজার-সদাই অন্যান্য মাস থেকে ভিন্ন প্রকৃতির হতে হয়। ইফতারে তেলে ভাজা খাওয়া আমাদের রেওয়াজে পরিণত হওয়ায় চালের গুঁড়া, ডালের বেসন, ছোলা, নিমকীর ময়দা, তেল, পেঁয়াজ ইত্যাদি আগে থেকেই কিনে রাখতে হয় দাম বেড়ে যাওয়ার ভয়ে। সঙ্গে দৈনন্দিন কাঁচাবাজারের তালিকাটিও বুঝে-শুনে করতে হয়; যেন রাত আর সেহ্রির খাবারটি স্বাস্থ্যকর হয়Ñ সে কথা মাথায় রেখে। এই আয়োজনের ডামাডোলে পরিবারের শিশুটি যেন অবহেলায় অসুস্থ হয়ে না পড়ে, সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হয়। যে যা-ই বলুক না কেন প্রত্যেক গৃহিণীই এ মাসে বাড়তি চাপে থাকেন। তবে হ্যাঁ, আনন্দও আছে; পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে ইফতার করা বা সেহ্রিতে খাওয়াÑ সে এক অন্যরকম অনুভূতি। আর তার ব্যবস্থাপক স্বয়ং আমি। পরিবেশনার আনন্দ। আমি একে বলি বাঙালীর আনন্দ, বেশ একটা শান্তি ভাবের আনন্দ। এই আনন্দ বহুগুণ বেড়ে যায় যদি পরিবারের সঙ্গে যোগ হয় আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব। এদিকে রমজান মাসে জীবনযাত্রাও খানিকটা পাল্টে যায় গৃহিণীদের। পরিবারের সকলকে আগে আগে ঘুমোতে পাঠাতে তাড়া দিতে হয়, নিজেকেও ঘুমোতে হয় সকাল-সকাল সেহ্রিতে উঠতে হবে বলে। স্বাস্থ্যের জন্য ভালই। অন্য সময়তো আমাদের মধ্যরাতে সন্ধ্যা হয়। শহুরে জীবনে রাত জাগাটাই যেন নিয়ম! রমজানে সকালবেলায় সাংসারিক কাজের চাপ বেশ কম থাকে। সকালের নাস্তা বানানোতে তদারকি নেই, বাচ্চার স্কুল নেই। তাই সকালটা বেশ শান্ত, নির্মল, উপভোগ্য বলে মনে হয়। আসলে রমজান মাসজুড়ে সকলেরই প্রতীক্ষা থাকে ঈদের চাঁদ দেখার। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী সকলের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে পরিতৃপ্ত হওয়ার মাধ্যমেই রমজান মাস শেষ হয়। আমার তাই মনে হয়, বাংলাদেশের প্রত্যেক গৃহিণীই তার সর্বোচ্চ ত্যাগ ও চেষ্টার মাধ্যমে রমজান ও ঈদকে তাদের পরিবারের সকলের কাছে ধর্মীয় এবং সামাজিক উৎসবে পরিণত করতে ভূমিকা রেখে চলেছে।

ইসরাত জাহান শুভ্রা

মার্কেটিং এ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট

কো-অর্ডিনেটর

স্কয়ার হাসপাতালস লিমিটেড

একজন কর্মজীবী নারী হিসেবে রমজানের দিন যেন অল্পসময়ে অধিক কাজের দিন। এবারে ভরা বর্ষার বড় দিনে রোজা এলেও দৈনন্দিন অফিস ও বাসার কাজের তুলনায় তাকে আর বড় মনে হয় না। ভোরবেলা ঘরের কাজ সেরে অফিসের উদ্দেশে বেরোলে পথে ঘুমঘুম ভাব চোখ টেনে ধরে। রোজায় দুপুরের পরে শরীরে খানিকটা ক্লান্তি আসে, জটিল বিষয়গুলোকে ধারণ করার জন্য মাথা কম খাটুনি খাটতে চায়। তাই চেষ্টা করি যে সমস্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়া বা নেয়ার প্রয়োজন, সেগুলো দিনের প্রথমাংশেই করে ফেলতে। এরপর সাধারণ নিয়মমাফিক কাজ। অফিস থেকে বের হবার পর রাস্তার ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যামের কথা মনে পড়লে নিজেকে খুব অসহায় লাগে। মহাবিরক্তির পথটুকু পার হওয়ার পর ঘরে ফিরে সবার সঙ্গে ইফতারির আয়োজন, ইফতারি, রাতের খাবার এবং সেহ্রির আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়া। বিশ্রামের সময় তেমন নেই। এদিকে রোজার পরপরই আসে ঈদ। সে উপলক্ষে নানা ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। তবে এবারের ঈদের দিন বর্ষণমুখর থাকায় বাড়িতেই কেটেছে বেশির ভাগ সময়।

তাহমিনা আকতার মুনিয়া, গৃহিণী ও ব্যবসায়ী

জীবনযাত্রার গতি বারো মাসের মধ্যে এগারো মাস প্রায় এক রুটিনে চললেও রোজার মাসে এসে সে রুটিনে একটি পরির্বতন হয়ে যায়। প্রথম দু’একদিন পরিচিত রুটিনের বাইরে যেয়ে জীবনযাত্রার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে আমাদের মতো গৃহিণী প্লাস কর্মজীবী নারীদের বেশ একটু সমস্যাতে পড়তে হয়। কেননা রোজার মাস শুধু পরিবারের রুটিনে পরিবর্তন আসে না, পরিবর্তন আসে পরিবারের ছোটবড় সবার জীবনযাত্রায়। যেমন পরিবর্তন আসে সন্তানদের স্কুল-কোচিং এবং ওদের একান্ত লাইফ স্টাইলেও। পরিবারের বড় সদস্যদের মধ্যে রোজা রাখা আর বাড়তি এবাদতের প্রভাব ছোট সদস্যদের ওপরও পড়ে। আর ছোটদের এই রোজা এবং প্রার্থনার প্রাক্টিসের মধ্যে দিয়ে ধর্মের প্রতি যেমন তারা অনুপ্রাণিত হয়, তেমনি মায়ের মমতা থেকে তাদের পুরস্কৃত করার জন্য অনেক সময় তাদের জন্য বাড়তি কিছু রান্না করতে হয়। সংসারের কাজ, বাইরের কাজ এবং রোজা রাখা, ইফতারি আর সেহ্রির জন্য বাড়তি কিছু আয়োজন, সন্তানদের ধর্মের প্রতি অনুগামী করে তোলাÑ এসব কিছু মিলে রোজার মাসের প্রতিটি দিন খুবই কর্মব্যস্ততার ভেতর দিয়ে চলে যায়। তাছাড়া এ মাসে আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুদের দাওয়াত করে ইফতারি খাওয়ানো বা তাদের ইফতারির দাওয়াত গ্রহণ করা তো আমাদের সামাজিকতার একটি অংশ, এজন্য আমাদের মতো সময় এবং বাজেট মেনে চলা গৃহিণীদের বাড়তি খরচ হয়ে যায়। এই বাড়তি খরচও কিন্তু আমাদের জন্য আনন্দ বয়ে আনে। এর মাধ্যমে ব্যস্ত নাগরিক জীবনে আত্মীয় বা বন্ধুদের সঙ্গে বছরে একবারের জন্য হলেও দেখা হয়। এদিকে সংযমের রোজার মাসের পরে আসে খুশীর ঈদ। ঈদের জন্যও চাই প্রস্তুতি। সে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, বন্ধু বা দরিদ্র স্বজনদের জন্যও উপহারও কেনাকাটার সারতে হয় রোজার মাসেই। তাই বলা যায়, রোজার মাস আমাদের জন্য ব্যস্ততা নিয়ে আসে। তবে এই ব্যস্ততা আমাকে ক্লান্ত করে তোলে না। এই ব্যস্ততা আমাকে রোজার মতো সংযম পালনের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা দেয়। তেমনি সবার সঙ্গে আনন্দ-খুশী ভাগ করে নেবার মধ্যে যে অমলিন প্রশান্তি, তাও শেখায়।

জুয়েইরিয়াহ মৌলি, নৃত্যশিল্পী

তেমন কোন পরিবর্তন তো লক্ষ্য করা যায় না এদিনগুলোতে। যেহেতু নাচ নিয়েই দিনগুলো কেটে যায়, তাই এ অঙ্গনের ব্যাপারে বলতে পারি সন্ধ্যার আগে রিহার্সেল শেষ করে দেয়ার এক প্রবণতা দেখা যায়। এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়েও আলাদাভাবে ভাবতে হয় রোজার সময়। দেশের সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই সেটা জরুরী হয়ে পড়ে। আর যানজট এক ভয়াবহ শব্দ হয়ে ওঠে এ দিনগুলোতে। রিহার্সেল শেষ করে ইফতারের আগে দেখা যাচ্ছে বাসায় ঢুকতে পারছি না অনেক সময়। রাস্তাতে বসে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হয় মায়েদের জীবনটা একটু ঝামেলাপূর্ণই হয়ে ওঠে বটে। যেমন সেহ্রীর জন্য জাগতে হচ্ছে, আবার নিত্যনৈমিত্তিক কাজগুলোও তাঁদের থেমে নেই। এর মধ্যে বাড়তি এক আয়োজন থাকছে ইফতারের। সব মিলিয়ে মায়েদের দিনযাপন নিয়ে ভাবলে কিছুটা বিষণœ হয়ে যায় মন। এরপরও আমার মনে হয় মায়েরা যতটা পারেন তাদের জায়গায় আমরা অতটা পারতাম কী না সন্দেহ! আর রোজা শেষে ঈদের আনন্দটা তো অন্য সব কিছুর থেকেই আদালা। নিজের জামা-কাপড়, অলঙ্কার-প্রসাধন কেনা তো আছেই, সেই সাথে বাড়ির ছোটদের জন্য থাকে টুকটাক কেনাকাটা। তাই সময় থাকতেই সেটা সেরে নিই সবসময়। এবার ঈদ কেটেছে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে।

নাসরীন আক্তার নাজু, গৃহিণী

রমজানের প্রকৃত শিক্ষা কোথাও এখন আর নেই। সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে যে সংযম সাধনার কথা বলা হয়েছে, সেটা কেউ মানে না। চারদিকে শুধু অসংযমের চর্চা। তবু ঐতিহ্যগত কারণেই হয়ত রোজার মাসটা আমার ভালই লাগে। এই মাসে চারদিকে একটা উৎসব উৎসব ভাব বিরাজ করে। বিকেলে পাড়ার মোড়ে মোড়ে ইফতারির দোকান বসে। লোকজন ইফতারি কিনছে। ইফতারির গন্ধ চারদিকে। বিকেল থেকে বাসার গৃহিণীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন ইফতারি তৈরির কাজে। আমার ব্যস্ততাও কম থাকে না। আমি তো সাধারণত মেয়ে সাকিকে নিয়ে বাসায় একা থাকি। সাকির আব্বু তো সকালে অফিসে চলে যায়, ফেরেন সন্ধ্যায়। আমার আর কী কাজ! পত্রিকার রান্নার পাতাগুলো আমি পড়ি। নানা রকম রেসিপি থাকে। নির্দেশনা অনুযায়ী বাসায় আমি সেসব রান্না তৈরি করি। নানা মজাদার সব খাবার। রান্নাবান্নায় কেটে যায় পুরো বিকেলটা। যানজটের কারণে সাকির আব্বু ইফতারের আগে বাসায় ফিরতে পারেন না। তবু যেদিন পারেন, কিংবা যেদিন ছুটিতে থাকেন সেদিন একসঙ্গে ইফতার করি। খুব মজাই লাগে। ইফতার করে রাতে আর ভাত খাওয়া হয় না। রোজা পনেরটা শেষ হলে শুরু হয়ে যায় ঈদের প্রস্তুতি। মার্কেটগুলোতে ভিড় লেগে থাকে। অন্য সময়ের তুলনায় এই মাসটায় সাধারণত আমি মার্কেটে বেশি যাই। পছন্দসই জিনিস খুঁজি। কিনি। শুরু হয় গ্রামের বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি। প্রথম ঢাকায় আসার পর প্রায় প্রতি ঈদেই বাড়ি যেতাম। এখন খুব একটা যাওয়া হয় না। তবে এবারের ঈদ কেটেছে গ্রামের বাড়িতে, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে মজা করে।

নাহার উইলী, সাংবাদিক, মাছরাঙা টেলিভিশন

প্রতিবছর চেষ্টা করি রমজানের সময় রোজা রাখতে। একজন টেলিভিশন সাংবাদিক হিসেবে আমাদের বেশিরভাগ সময় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে রোদের মধ্যে কাজ করতে হয়। যা রোজা রেখে মাঝে মাঝে খুবই কষ্ট হয়। তার ওপর যতক্ষণ এ্যাসাইনমেন্ট থাকে সেগুলো ভালভাবে শেষ করা গেলেও, রাস্তার জ্যামে বসে থাকতে হয় অনেকক্ষণ। যার জন্য বাড়তি দুর্বলতা যোগ করে দিন শেষে। তবে আমার পরিবার আমাকে বাইরে কাজের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তাই আমাকে আসলে বাড়িতে গিয়ে রান্নার বাড়তি চিন্তা করতে হয় না। কিন্তু তারপরও রাতে বাসায় গিয়ে নিজের কাজ শেষ করতে করতে একটু ঘুমাতে যাইÑ সেহ্রির সময় হয়ে যায়। তাই রাতে ঘুমাতে একটু সমস্যা হয়। আর সকালে উঠতেও দেরি হয়ে যায়। তবে আমার যেসব সহকর্মী আছেন তাঁদের দেখতে পাই, রোজায় অফিসের কাজ শেষে বাড়ির কাজ বেড়ে যায় অনেকগুণ। যা বাড়তি চাপ তৈরি করে।

এত কিছুই বাইরে আনন্দও কিন্তু কম হয় না রমজানে। সাংবাদিকতা পেশার কারণে পরিবারকে ওভাবে সময় দিতে পারি না, বিশেষ করে আমার মাকে। তার সঙ্গে ঈদের মার্কেট করতে যাওয়া হয় না একেবারে। তবে রোজার পুরোটা সময় আমাকে বেশ কয়েকবার মার্কেটে যেতে হয়। কারণে একবারে গিয়ে সবকিছু কেনার সময় পাই না।

যেদিন বাসায় থাকি, সেইদিন চেষ্টা করি মাকে সংসারের কাজে সাহায্য করার। এই সঙ্গে ঈদের প্রস্তুতি তো থাকেই। ঈদকে আনন্দমুখর করার জন্য একটু বাড়তি সময় তো বের করতেই হয়। ঈদের নামাজ পড়ে একটু বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা না দিলে কি চলে। তা যত বৃষ্টি-বাদলের দিনই থাকুক না কেন!