২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্যারিসের পথে পথে

  • ফকির আলমগীর

পর্তুগালে অনুষ্ঠিত অল ইউরোপীয়ান বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশনের (আয়বা) দ্বিতীয় গ্রান্ড কনভেনশনে যোগদানের জন্যই এবার আমার ইউরোপ সফর। পাশাপাশি প্যারিস, এথেন্স এবং বার্সোলোনা প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিশেষ আমন্ত্রণে সঙ্গীত পরিবেশনারও পরিকল্পনা ছিল। আটলান্টিকের পাড়ে অবস্থিত পর্তুগালের ‘আয়বা’ সম্মেলনের মিলনমেলায় আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে বহুদাবিভক্ত ইউরোপের বাংলাদেশী কমিউনিটিকে ‘ইউনিটি ও একতার’ পতাকা তলে সমবেত করার উদ্যোগ। যা হোক, সম্মেলন শেষে আমরা ১ জুন লিসবন শহরটি ঘুরে দেখি প্রথমেই ছুটে যাই ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের পর্তুগীজ অভিযাত্রীদের স্মৃতিসৌধে। পাশেই মিউজিয়াম। আমার সঙ্গে ছিল প্যারিসের স্বপন আর মোমেন শরীফ। পর্তুগালে বসবাসরত মোমেন শরীফের ভাগিনা রিজন সংক্ষিপ্ত সময়ে আমাদের সবকিছু ঘুরিয়ে দেখায়। শহরের পৌর এলাকা, প্রাচীন রাজার বাড়ি, সমুদ্র অভিযাত্রীদের স্মৃতিসৌধ, দুপাড়ে রক্ষিত নাবিকদের বিভিন্ন স্মৃতি সামগ্রী। তাছাড়া তাগাস নদীটি পূর্ব থেকে পশ্চিম অভিমুখে প্রবাহিত হয়ে রাজধানী লিসবন ছুঁয়ে আটলান্টিকে মিশেছে। তাগাস নদীর দক্ষিণে পাহাড় আছে অনেক। প্রাচীন সভ্যতা আর ভৌগোলিক পরিবেশের অনেক ছাপ রাজধানী লিসবনকে দেখলে বোঝা যায়। এবার সদলবলে প্যারিসে ফেরা। লিসবন থেকে প্যারিসে ফেরার ফ্লাইট ছিল বিকেল ৭টা ২৫ মিনিটে। গ্রীস্মের সময় এখন সূর্য ডোবে রাত ৯টার পরে। তাই শেষ বিকেলে চমৎকার আবহাওয়ার মাঝে, আয়বার সম্মেলনের প্রাণপুরুষ, প্যারিসে বাঙালীদের বন্ধু কাজী এনায়েত উল্লাহ ইনু সাহেবের নেতৃত্বে, মোমেন শরীফ, শুভ, স্বপন কামাল, কাজল, মাহিন, ফেরদৌসসহ অনেকে এক সঙ্গে ২ ঘণ্টার ফ্লাইটে প্যারিসে ফিরি। প্রায় ২৩ বছর পর আমার প্যারিসে ফেরা। সেই ১৯৯২ সালে ইতালি সফরের একপর্যায়ে আমি প্যারিস ভ্রমণ করি। যদিও ২০০০ সালে বেলজিয়াম সফরের সময়ে প্যারিস বিমানবন্দর হয়ে ব্রাসেলস যাওয়া আসা করি। ব্যস্ততা আর সময়ের অভাবে তখন প্যারিস সফর করা হয়নি। এবার প্যারিস সফর করার একটি বিশেষ কারণ ছিল। সদ্যপ্রয়াত ভাস্কর নভেরার স্মৃতিঘেরা বাড়িটি দেখা এবং তার সমাধিতে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করা। এছাড়া ফ্রান্সের রাজধানী, পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পসমৃদ্ধ নগর প্যারিস আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয় নগরী। প্রায় ২৩ বছর আগে পৃথিবীখ্যাত আইফেল টাওয়ার, প্যারিসগেট (সঞ্জুলে) লুভ্যর মিউজিয়াম ভার্সাই, মমার্তসহ অনেক স্থাপত্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তখন ছিল শীতকাল। আর এবার যেন বসন্তে প্যারিস দেখা।

বহু চিত্রশিল্পী, নাট্যকার, দার্শনিক, লেখক, চিত্রপরিচালক, সঙ্গীতকার, স্থাপত্যশিল্পী এখানে বসবাস করেন। এছাড়া সিন নদীর তীরে রেস্তরাঁ, নাইট ক্লাব, লুভ্যর মিউজিয়াম এবং শিল্প সংস্কৃতির পীঠস্তান হিসেবে প্যারিসের খ্যাতি বিশ্বময়। ১৭৮৯ সালে ১৪ জুলাই এখানে বাস্তিলদুর্গ আক্রমণের মাধ্যমে ফরাসি বিপ্লবের দাবানল জ্বলে উঠেছিল। উনিশ শতকে এখানে রেলপথের সূচনা হয়। আধুনিক প্যারিস গড়ে ওঠে তৃতীয় নেপোলিয়ানের আমলে। এখানকার অন্যতম প্রধান দর্শনীয় ৩০০ মিটার উঁচু আইফেল টাওয়ার। গুস্তাভ আইফেলের নক্সা অনুযায়ী এই টাওয়ার নির্মাণ হয়েছিল। তাই বহুদিন পর আইফেল টাওয়ারের দেশে এসে অনেক পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে। বিশেষ করে মালেক ভাইয়ের কথা। যিনি আমার প্যারিসে প্রথম একক কনসার্টের আয়োজন করেছিলেন। মনে পড়ে আরশাফ, বারেক ভাই, মিজান, ওয়াহিদ ভাই ও কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ ওয়াহিদুর রহমানের কথা। আগেই শুনেছিলাম, সংস্কৃতিমনা প্যারিসের অনেকের প্রিয় মুখ তবলাবাদক ওয়াহিদ ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ। বিশেষ করে ১৯৮৬ সাল থেকে প্যারিসে বসবাস করা প্যারিস বন্ধু খ্যাত শহিদুল আলম মানিকের প্রয়ানের কথা। তাদের শূন্যতা আমি অনুভব করি। বন্ধুবৎসল, সদালাপি ও নিরহঙ্কার এ দুজনের মৃত্যুতে প্রবাসীদের হৃদয়ের গভীরে এখনও শোক অনুভব করলাম। এরই মাঝে কথা হয় প্রখ্যাত মূক অভিনেতা পার্থপ্রতীম মজুমদার, শিল্পী শাহাবদ্দিন আহমেদ তার স্ত্রী আনা ইসলামসহ অনেকের সঙ্গে। দেখা হয় শিল্পী তারুণ্য কাব্য কামরুল, আবৃত্তিকার রবিশঙ্কর মৈত্রী, নির্মাতা মিঠু, ওবায়দুল, নোভা, ওয়াহিদ, দ্বীপসহ অনেকের সঙ্গে। এছাড়া ইতালি প্রবাসী সাংবাদিক-নির্মাতা নাসিম সার্বক্ষণিকভাবে আমাকে সহযোগিতা করে। তবে কর্মব্যস্ততার মধ্যেও কাজী এনায়েত উল্লাহ ভাই আমার সমস্ত স্ক্যাজুয়াল নির্ধারণ করায় আমি বিস্মিত হই। নিজের ব্যবসাসহ সর্বপ্রকারের কর্মকা-ে তিনি সিনসিয়ার এবং পাংচুয়াল। এক ব্যতিক্রম ব্যক্তিত্ব হিসেবে সহজেই তিনি সবার মন জয় করতে পারেন। অন্যদিকে স্বপন কামাল সবসময় আমার সান্নিধ্য দেন। ৪ জুন তারাই আমাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যান। দূতাবাসের কনসাল জেনারেল হযরত আলী খান আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের প্যারিস সফরের খবর অবগত করেন এবং মন্ত্রীর সঙ্গে এপয়েন্টমেন্ট নির্ধারণ করেন। আমরা সময়মতো মাননীয় রাষ্ট্রদূত শহিদুল ইসলামের সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাসে দেখা করি। এবং পরবর্তী পর্যায়ে দূতাবাসের কাছাকাছি সম্মেলন কেন্দ্রে, কনফারেন্স শেষে মাননীয় মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করি। তিনি আমাকে প্রবাসে দেখে আনন্দিত হন এবং আমরা সম্মেলনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সফলতার সঙ্গে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশনার মধ্যে বাংলাদেশী প্রবাসীদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং আমাকে আশীর্বাদ করেন। এরপর সবাই মিলে ছবি তুলি। দূতাবাসে ঘিরে একত্রে চা পান করি। ঐদিনই তোফায়েল ভাইয়ের দেশে ফেরা। তাই ইনু ভাইসহ দূতাবাসের গেটে সবাই তাঁকে বিদায় জানাই।

তোফায়েল ভাইকে বিদায় দিয়ে ফেরার পথে আমরা, মিষ্টি বিকেলে বিশ্বখ্যাত আইফেল টাওয়ার, প্যারিসগেট (সঞ্জুলে) পরিদর্শনে যাই। দীর্ঘ ২৩ বছর পর আমি আবার আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়াই। সেকালের সঙ্গে একালের অনেক পার্থক্য। সেই সময়ের সঙ্গী দুই বন্ধু হয়ত আজ বৃদ্ধ। আর এবার আমাকে সঙ্গ দেয় তরুণ বন্ধু কামাল আর স্বপন। দেখলাম আইফেল টাওয়ার এলাকা আরও আকর্ষণীয় করার জন্য সংস্কার কাজ চলছে। তবে সব বদলে গেলেও একটুও বদলায়নি আইফেল টাওয়ারের আকর্ষণ। হাজার হাজার পর্যটকদের ভিড় যেন গ্রীষ্মের রৌদ্রাকরোজ্জ্বল বিকেলকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছিল। এখানে দাঁড়িয়ে অনেকগুলো ছবি তুলি। আইফেল টাওয়ারের নিচে বয়ে চলা নদীর বুকে জাহাজ, নানা বর্ণের বোট, দুপাড়ের অসংখ্য হোটেল রেস্তরাঁ ক্যাফে, নাইট ক্লাবগুলো যেন আইফেল টাওয়ার অঙ্গনকে মোহনীয় করে তুলেছিল। তারপর ছুটে যাই প্যারিস গেট (সঞ্জুলে)। পড়ন্ত বিকেলে পর্যটক পরিবেশিত প্যারিস গেটকে তখন অনিন্দ সুন্দর দেখাচ্ছিল। আসলেই অপূর্ব প্যারিস। যে দিকেই চোখ যাচ্ছিল সেদিকেই এক শৈল্পিক সৌন্দর্য যেন সবাইকে মুগ্ধ করে।

সে কারণেই এক সময় অনেকের চোখে ফ্রান্স ছিল স্বর্গের সমতুল্য। অগণন শিল্পী সাহিত্যিক-কবিদের লীলাভূমি। কে যেন বলেছিলেম প্রত্যেক শিল্পীরই দুটি মাতৃভূমি, একটি যেখানে সে জন্মেছে, অন্যটি হলো ফ্রান্স অর্থাৎ প্যারিস। এখানেই ছিলেন দেগা, মোনো, মানে, গগ্যাঁ, মাতিস, রুয়োর মতন মহান শিল্পীরা। এখনও এখানে ছবি আঁকছেন বাংলাদেশের গৌরব শিল্পী শাহাবদ্দিনসহ অনেকে। সদ্য প্রয়াত ভাস্কর নভেরাও এই ফ্রান্সে কাটিয়েছেন বহু বছর। ভাস্কর্য শিল্পের প্রদর্শনী করেছেন এবং শেষ শয্যা পেতেছেন এই ফ্রান্সেই। মূক অভিনেতা পার্থ প্রতীম মজুমদার এই ফ্রান্স থেকেই আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। মাইকেল মধুসূদনের স্মৃতিঘেরা ভার্সাই আজও বাঙালীকে মনে করিয়ে দেয় অনেক ইতিহাস। পিকাসোর ছবি আঁকা ফ্রান্সকে করেছে সমৃদ্ধ। লুভ্যর মিউজিয়ামে রক্ষিত ‘মোনালিসার’ ছবি আজও প্যারিসকে ব্যতিক্রম করে তোলে। যখন ভাবি র‌্যাবো-ভোর্লেন-বদলেয়ার, মালার্মে-ভালেরি, আঁরি সিসোর মতন কবিদের এই দেশে আমি সত্যি সত্যি ঘুরে বেড়াচ্ছি বিশ্বাসই হয় না। ভাবতে ভাল লাগে সেই সুদূর বাংলাদেশ থেকে আমি এসেছি জাঁ ককতোর শহরে। এক সময় বলা হতো প্যারিস শহরের দুটি দ্রষ্টব্য-একটি আইফেল টাওয়ার অন্যটি জাঁ ককতো। তিনিই এখানকার এক নম্বর নাগরিক।

জীবনে অনেক শহর ঘুরেছি, অনেক দেশ দেখেছি, কোথাও প্যারিসের তুলনা খুঁজে পাইনি। এই শহরের একটা মস্তগুণ হচ্ছে, কোন কিছু না করলেও, কোন গন্তব্যে বা বিশেষ বিশেষ স্থানে না গেলেও এমনি এমনিই ভাল লাগে। শরীর মনে শিহরণ জাগে। তাছাড়া বিশেষ বিশেষ স্থানে প্রচ- ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যেও আলাদা ভাল লাগা রযেছে। শহরটাতে যেন সারা পৃথিবীর ভ্রমণকারীরা ধেয়ে এসেছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মের সময় পর্যটকদের ভিড় একটু বেশি থাকে। এই সময় ঝকঝকে রোদ ওঠে, সাদা সাদা মেঘের আকাশ দেখা যায়, দিনের বেলায় বাতাসে শীতের প্রকোপ নেই, অথচ স্নিগ্ধ শীতল হাওয়া, বিদেশীরা তো প্যান্ট আর গেঞ্জি গায়ে ঘুরে বেড়ায়। এই সময়ের আবহাওয়া তারা খুব পছন্দ করে। এ সময়টির জন্য তারা সারা বছর অপেক্ষা করে। দেখলাম, প্যারিসে পার্কের অন্ত নেই, সব কটি পার্কে ছলেমেয়েরা ঘাসের ওপর গড়াগড়ি দেয় আর সারা দিন ধরে রোদ শুষে নেয় গায়ে। বলাবাহুল্য, এ সময় সমুদ্রতটে রোদ শুষে নেয়াদের ভিড় একটু বেশি থাকে। এবারে প্যারিসে আমি একজন চমৎকার মানুষের তত্ত্বাবধানে, অসাধারণ একটি জায়গায় ছিলাম, একদম শহরের কেন্দ্রস্থলে, চমৎকার লোকেশন, অতি সহজে সবখানে চলাফেরা করা যায় অনায়াসে। আমি পূর্বেই তার কথা উল্লেখ করেছি, তিনি প্রবাসী বন্ধু, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী কাজী এনায়েত উল্লাহ যিনি তার রেস্টেুরেন্ট ‘কাপে ডি লুনার’ দোতালায় চমৎকার পরিবেশে আমার থাকার ব্যবস্থা করেন। নিচেই ‘কাপে ডি লুনার’ বিভিন্ন স্বাদের, নানা ধরনের ইউরোপীয় খাবারের আয়োজন। আমার সঙ্গে ছিলেন ইতালির সাংবাদিক নাসিম, ‘যার সান্নিধ্য আমাকে মানসিক স্বস্তি দিয়েছে। অন্যদিকে কাফে ডি লুনায় কর্মরত ফরিদ, সদরুল ভাই, ফ্রাঙ্কো ওয়াং, জন, হাসান এবং বিজয়ের আন্তরিকতাপূর্ণ আপ্যায়নের কথা আমার অনেক দিন মনে থাকবে। বিশেষ করে ফ্রাঙ্কো একদিন সন্ধ্যায় বিশ্ববিখ্যাত মোলিন রৌগ গ্র্যান্ড শো দেখার ব্যবস্থা করে। চোখ ধাঁধানো নাচ, গান, এ্যাক্রোবেটিক আর অবিশ্বাস্য সব পারফর্মেন্স দেখে মুগ্ধ হই। মঞ্চের আলোয় উদ্ভাসিত সব নৃত্যশিল্পীদের দেখে এক স্বর্গীয় আনন্দে যেন সারা মিলনায়তন ভাসছিল। শো শেষে একাই ফিরি। কারণ মোলিন রৌগ কাছেই কাফে ডি লুনা। বলতে গেলে এটাই পর্যটকদের প্রধান স্থান। ঐ নির্জন রাতেও পর্যটকদের ভিড়। রাস্তার ওপরেই অনেক রেস্তরাঁয় অনেক চেয়ার-টেবিলে পর্যটক কফি নিয়ে বসে আছে। কাপে ডি লুনাসহ অনেকগুলো রেস্তরাঁয় তখনও অনেক গ্রাহকের আনাগোনা। সামনের পার্কটার বেঞ্চে তখনও অনেক পর্যটকদের ভিড়......... (চলবে)

লেখক : গণসঙ্গীত শিল্পী