১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাঙ্গামাটির হ্রদের জলে ...

  • লিয়াকত হোসেন খোকন

রাঙ্গামাটি যাওয়ার রাস্তাটি অসম্ভব সুন্দর। মসৃণ পথটিকে ছায়ায় ঘিরে রেখেছে অসংখ্য বড় বড় গাছ। দু’পাশে পাহাড় আর ঘন জঙ্গল। বাস চলছে। পাশাপাশি বসা আমি আর গৌতম চাকমা। সে আমার ফেসবুকের বন্ধু। কক্সবাজার থেকে রাঙ্গামাটির উদ্দেশে ভ্রমণ। কক্সবাজার থেকে রাঙ্গামাটির দূরত্ব ১৯০ কিলোমিটার। গৌতম বলল, ‘ওই যে জঙ্গল দেখছেন, ওখানে হাতি ও অন্য বুনো জন্তুর আনা গোনা যথেষ্ট।’ পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে চলছে বাস। মনে হলো, আমরা যেন উর্ধশ্বাসে ছুটে চলেছি কাপ্তাই হ্রদ লক্ষ্য করে। প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে মন চলছে, এই পথ শেষ না হলেও মন্দ হয় না।

তখন মনের কানে এসে ভিড় করল উৎপলা সেনের গাওয়া ‘ময়ূরপঙ্খী ভেসে যায় রামধনু জ্বলে তার গায়। কোন প্রবালের দ্বীপে ভেসে যাই যেথা তুমি ছাড়া আর কেহ নাই নীলপরী যেথা গান গায়...’ গানের কথাগুলো। সন্ধ্যা নেমে আসার আগেই পৌঁছে গেলাম রাঙ্গামাটিতে। হ্রদের কাছেই এক হোটেল দেখে সেখানে উঠে গেলাম গৌতম আর আমি। হোটেলটি বেশ বড়, কম্পাউন্ডে কয়েকটি সুসজ্জিত কটেজও দেখলাম। চা পান করে দেখি রাস্তার লাইট পোস্টে আলো জ্বলে আছে। চারদিক আলোকিত করে রেখেছে, যে জন্য মনে সাহস নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

পাহাড়ী পথে চলতে চলতে বেশকিছু চাকমা উপজাতি মানুষের সঙ্গে আলাপ হলো। গৌতমের এ পথ তো আগেই চেনা, যদিও তার আবাসস্থল মানিকছড়িতে। চাকমা পরিবারের একজন জানালেন, চাষবাস ও মাছধরা আমাদের প্রধান জীবিকা। জানেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়াতেও পিছিয়ে নেই। দোকানপাট, বাজারও চোখে পড়ল। সবাই যেন ব্যস্ত কেনাকাটা নিয়ে। একটি চায়ের দোকানে গিয়ে পেয়ে গেলাম কফি। এই কফি পান করেই ফিরে চললাম হোটেলে।

রাতে ডাইনিং রুমে কাপ্তাই লেকের সুস্বাদু মাছ আর ভাত খেয়ে দারুণ স্বাদ পেলাম। গৌতম খেতে খেতে বলল, জানেন দাদা, এই হোটেলে শুধু বাঙালি খানা নয়, বার্মিজ খাবার-দাবারও মেলে...। বললুম আজ নয়, কালকে না হয় খাব। রুমে গিয়ে জানালা খুলে দিয়ে গৌম গান ধরল ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে আমার নয়ন দুটি শুধুই তোমারে চাহে ব্যথার বাদল যায় ছেয়ে। বয়ে চলে আধিয়ার রাত্রি আমি চলি দিশাহারা যাত্রী...।’ বাহ কী সুন্দর গান গাইল ও। বাইরে তাকিয়ে মনে হলো, এ গান তো এখনই গাইবার সময়। শুয়ে পড়লাম দুজনে। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যেতেই কিসের যেন শব্দ পেলাম। কে যেন হেঁটে চলছে ছাদের ওপর। ভূত-পেতিœ নয়তো আবার। ভয়ে গৌতমের হাতটা স্পর্শ করে বেশ সাহস পেলাম। ঘুমিয়ে পড়তে আর সময় লাগল না। ঘুমের দেশে গিয়ে দেখি, যৌবনের শুরুতে ভালো লাগা প্রিয় সেই মানুষটি এসে বসল ঝরনার কাছাকাছি। ওই যে পাহাড়। গাইছে, ‘এখনি উঠিবে চাঁদ আলো আলো আধো আধো ছায়াতে কাছে এসে প্রিয় হাতখানি হাতে। এখনি জাগিয়ে ভীরুচামেলী জ্যোৎস্নার নয়ন মেলি ফিরিবে কপোত নীড়ে প্রিয় পাশে তরু শাখাতে...’। ভাবলাম, প্রিয়তমা তো এতদিনে বৃদ্ধ হয়ে গেছে। আর এই গানের শিল্পী কুন্দনলাল সায়গল সেই কবে বহু বছর আগে মারা গেছেন। অমর শিল্পীর অমর গান কোনদিনই ভোলার নয়।

পরদিন ভোর বেলা তৈরি হয়ে নিলাম। দু’জনে সকাল ৮টায়। বাইরে এসে দেখি চারদিকে বিচিত্র সব বর্ণের, গন্ধের ফুলের মেলা। ওই যে কাপ্তাই লেক। ব্রেকফাস্ট শেষ করেই লেকের দিকে চললাম। গৌতম বলল, এই কাপ্তাই লেকটি কিন্তু প্রাকৃতিক নয়, কৃত্রিম। কর্ণফুলী নদীতে জলবিদ্যুৎ নির্মাণ হওয়ার ফলেই কাপ্তাই লেকের সৃষ্টি। এটির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪.৭ মিটার। আয়তন ৬৭০.৪ বর্গকিলোমিটার ও গভীরতা ১০০ থেকে ৪৭০ ফুট। দুর্ভাগ্যবশত এটি তৈরির সময় বিস্তীর্ণ জনবসতি ও সুবিশাল চাকমা রাজপ্রাসাদটিও জলের নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। ঝুলন্ত ব্রিজ পেরিয়ে এলাম ঘাটে, দেখি কত নৌকা বাঁধা, কত রং-বেরঙের মোটরবোট, স্পিড বোটও রয়েছে এখানে। দশজন যাত্রী ওঠানো হলো বোটে। আমরাও উঠলাম। ভ্রমণ হবে দুই ঘণ্টার জন্য। ঘন নীল জলে অসংখ্য সিগাল আর পানকৌড়ি দেখে দেখে চলছিল দূরে, বহু দূরে। এলাম শুভলং দেখে নিলাম পাহাড়-ঝরনা। ঝরনার জল স্পর্শ করে গৌতম বলল, ওই গানটা কি আপনি শোনেননি.... ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই-ওই পাহাড়ে ঝরনা আমি চিতাবাঘ মিতা আমার গোখরু খেলার সাথী।’ হ্যাঁ শুনেছি। স্রেফ এই গানটি লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, দেবকী কুমার বসু পরিচালিত সাপুড়ে ছবির জন্য। জানো ওই গানটা শুনেছিলাম সেই শৈশবে। কোথায় ফেলে এলাম শৈশব....। শুভলং দেখা শেষ করে মোটরবোটে এসে বসলাম। গৌতম বলল, আমাদের বাড়ি মানিকছড়িতে যাবেন তো! বললাম, কেন নয়? এবার এলাম পেডা টিং-টিংয়ে। এটা একটা ছোট্ট বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। বাহ কী সুন্দর পেডা টিং-টিং। যেমন মিষ্টি নাম, দ্বীপটাও তাই।

হরেক রকম পাখি আর গাছ-গাছালিতে ভরা পেডা টিং-টিং। দেখলাম, রাত্রিবাসের জন্য কয়েকটি কটেজও রয়েছে। স্থানীয় একজনের মুখে শুনলাম, এখানে রাত কাটাতে হলে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনে আগেভাগে গিয়ে বুকিং করে নিতে হবে, কারণ এখানে কটেজগুলো কিন্তু সহজলভ্য নয়। পূর্ণিমার রাতে পেডা টিং-টিং অসাধারণ। বাঁশের পাত্রে ব্যাম্বু চিকেন ও ব্যাম্বু ফিশ যে খেয়েছে সে কোনদিন ভুলতে পারবে না। কটেজগুলো দেখে এলাম এক চাকমার বাড়িতে। দেখি, ওখানে মেয়েরা হাতে তাঁত বুনছে। পাশে রাখা আছে নানা রঙের অপূর্ব সব চাদর, গামছা, জামা। দুপুরের আগে ফিরে এলাম রাঙ্গামাটির মূল ভূখণ্ডে। হোটেলে ফিরে গিয়ে রূপচান্দা মাছ দিয়ে খেয়ে নিলাম। গৌতম বলল, রূপচাঁদা মাছটা এখানে বেশ মেলে...। আজ বিকালে কাপ্তাই হ্রদের তীরে অমার এক দাদুর বাড়িতে নিয়ে যাব আপনাকে। উনি বেশ সংস্কৃতিমনা, কথা বলে বেশ ভাল লাগবে তাকে। বিকাল ৫টায় এসে পৌঁছলাম গৌতমের দাদুর বাড়িতে। কাঠ দিয়ে তৈরি কী অপরূপ সুন্দর বাড়ি। ‘নমস্কার’ জানিয়ে বসতে বললেন। গৌতম পরিচয় করিয়ে দিল। বাড়ির সামনে কাপ্তাই হ্রদের তীরে এসে বসলাম, সুন্দর একটা বেঞ্চে। গৌতমের দাদু বললেন, জীবনের পড়ন্ত বেলায় আজ কিছুই তো করার নেই। ভগবানের ডাক পেলে চলে যে যেতে হবে। এসব কথা ভেবে ভেবে দু’নয়ন ভরে দেখি কাপ্তাই হ্রদকে। বিকেলটা এখানেই কেটে যায়। চোখের সামনে কতই না উন্নয়ন ঘটে গেল, একসময় চট্টগ্রাম যেতাম নদীপথে লঞ্চে। সকালে উঠলে সন্ধ্যা হয়ে যেত চট্টগ্রাম পৌঁছতে পৌঁছতে।

চাকমা রাজার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বিখ্যাত চিত্রনায়িকা নৃত্যশিল্পী সাধন বসুর বড় বোনের। সেই সূত্র ধরে সাধনা বসু ১৯৪৫ সালে এসেছিলেন এই রাঙ্গামাটিতে। সাধনা বসু তো আলীবাবার মর্জিনা চরিত্রটি করে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। তার রাজনর্তকী দেখে যৌবনে ভাবতাম, উনি যে স্বপ্নের দেবী। সেই বাধনা বসু এলেনÑ নাচলেন, অভিনয় করলেন ওমর খৈয়াম নাটকে। এতদিন বাদে মনে হয়, এ তো সেদিনের কথা.... চা এলো, চা পান করতে করতে দেখি সন্ধ্যা নেমে এসেছে ধরনীর বুকে। দেখি ওই যে পাহাড় আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে, যেন ঘুমিয়ে পড়ছে পাহাড়টা। পরদিন ছেড়ে যাব রাঙ্গামাটির রাঙ্গাপথ। প্রায় ৭৭ কিলোমিটার পাহাড়ী পথ দিয়ে পৌঁছতে হবে চট্টগ্রাম।

ওখানেই নেমে যাবে গৌতম, তারপর আমি ফিরব ঢাকা। চট্টগ্রাম নেমে গেল গৌতম। বাস চলছে, দেখি ওই যে সীতাকুণ্ড। আগেই জানা ছিল, হিন্দুদের এটি পবিত্র তীর্থ এই সীতাকুণ্ড। কবি জয়দেব একদা এই স্থানে কিছুদিন বাস করেছিলেন। এরই মধ্যে সীতাকুণ্ড ছাড়িয়ে বাস এগিয়ে চলেছে। সেই ক্ষণে বার বার মনে পড়ল ‘কতদূরে আর নিয়ে যাবে বল কোথায় পথের শ্রান্ত। ঠিকানা হারানো চরণের হয়নি কি তবু ক্লান্ত পেছনের পথে উঠেছে ধূলির বড় সম্মুখের অন্ধকার....’ গানের এই কথাগুলো।