২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভাসিয়েছিলেন দুঃখের ভেলা

  • জোবায়ের আলী জুয়েল

রবীন্দ্রনাথকে আমরা জানি একজন সুখী মানুষ, জমিদারের ছেলে, যার কোন অভাব-অনটন নেই, সম্মানীয় ব্যক্তি, কবি ও একজন নিবিড় প্রেমিকের মাত্রায়। অথচ তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল দুঃখ ও শোকে ভারাক্রান্ত। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি মাতৃহারা হন। তারপর হয় তাঁর বিয়ে। বিয়ের রাতে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভগ্নিপতি সারদা প্রসাদ মারা যান। এর চার মাস পর তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বৌদি কাদম্বরী দেবী, যিনি তাঁকে মাতৃহারা বেদনা ভুলিয়ে ভালবাসা ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে কবি হয়ে ওঠার প্রেরণা জোগাচ্ছিলেন, ঠিক সে সময় তিনি আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করেন। মাত্র ৪১ বছর বয়সে শেষ হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের দাম্পত্য জীবন। ১৯০২ সালে তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবী মারা যান। রেখে যান তিন কন্যা ও দুই পুত্র। বেলা ও রেনুর বিয়ে হয়ে গেলেও রথী ও মীরা তখন নাবালক। ছোট ছেলে শমী ছিল একেবারে শিশু। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী মারা যাওয়ার পর রানী (রেনু) খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই মেয়েকে তিনি বিয়ে দিয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে। যাকে তিনি নিজের পয়সায় বিলেত পাঠিয়েছিলেন ডাক্তারি পড়তে। মৃত্যু পথযাত্রী এই কন্যা রানীকে বহু চেষ্টা করেও বাঁচানো যায়নি। রানীকে হারাবার পর ১২ বছরের শমী তখন বন্ধুর সঙ্গে মুঙ্গেরে বেড়াতে যায়। সেখানে শমীর কলেরা হয়। কলেরায় শমী মারা যায়। কবির আদুরে মেয়ে মাধুরীলতা বা বেলা যাকে কোলে-পিঠে করে তিনি মানুষ করেছিলেন, তাকে বিয়ে দিয়েছিলেন কবি বিহারী লালের পুত্র শরৎচন্দ্রের সঙ্গে। বিয়ের পর রবীন্দ্রনাথ শরৎকে বিলাতে পাঠিয়েছিলেন ব্যারিস্টারি পড়তে। বিলাত থেকে ফিরে এসে মেয়ে এবং তাঁর জামাই শরৎচন্দ্র জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে চার বছর ছিলেন। এই ঠাকুরবাড়িতে শরৎচন্দ্রের সঙ্গে কবির ছোট জামাই নগেন্দ্রনাথের বিবাদের সূত্র ধরে শরৎচন্দ্র বাড়ি ছেড়ে স্ত্রীকে নিয়ে শ্রীরামপুরের পৈতৃক নিবাসে চলে যান। এরপর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের সম্পর্কের ইতি ঘটে। এই টানা-পড়েনের মধ্য দিয়ে বুকভরা অভিমান নিয়ে বেলা মৃত্যুর দুয়ারে গিয়ে পৌঁছে। শ্রীরামপুরে গিয়ে বেলার অসুখ খুব খারাপের দিকে চলে যায়। রবীন্দ্রনাথ প্রতিদিন গাড়িতে করে গিয়ে মেয়েকে দেখে আসতেন। বাবার হাত ধরে মেয়ে বসে থাকত। তখন কবি বিহারী লালের ছেলে শরৎচন্দ্র টেবিলের ওপরে পা রেখে সিগারেট খেয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতি অপমানকর মন্তব্য করত। আর সে অপমান নীরবে সহ্য করে রবীন্দ্রনাথ দিনের পর দিন মেয়েকে দেখতে যেতেন। একদিন দেখতে গেছেন বেলাকে, কিন্তু মাঝপথে শুনলেন বেলা যক্ষ্মা রোগে মারা গেছে। মেয়ের মৃত্যু সংবাদ শুনে তিনি আর উপরে উঠলেন না। মেয়ের শেষ মুখটি না দেখে ফিরে এলেন বাড়িতে। তাঁর ছেলে রথীন্দ্রনাথ লিখেছেন, বাড়িতে এসে তাঁর মুখে কোন শোকের ছায়া নেই। কাউকে বুঝতে দিলেন না কি শোকে, কি অসহ্য বেদনার মধ্য দিয়ে তিনি সন্তানকে হারিয়েছেন। এভাবে রবীন্দ্রনাথের জীবনের প্রতিটি আঘাত হয়ে উঠত বেদনাভরা বিষণœতার গান। মানুষের জীবনে দুঃখ আছে মৃত্যু আছে কিন্তু পৃথিবী এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। পৃথিবী অনন্তের দিকে ধাবিত। এটাই রবীন্দ্রসংগীতের মূল সুর। তবুও আমরা চলব জীবন চলবে। অনন্তের সন্ধানী রবীন্দ্রনাথ, দুঃখ এবং মৃত্যুকে জয় করে জীবনকে করেছেন জীবন্ত।

কবির ছোট মেয়ে মীরার বিয়ে হয় ১৩ বছর বয়সে। রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নারী মুক্তির প্রসঙ্গ এনেছেন কিন্তু মেয়েদের বিয়ে দিয়েছিলেন খুব অল্প বয়সে ১২/১৩ কারও বা ১১ বছর বয়সে। মীরার বিয়ে হয়েছিল নগেন্দ্রনাথের সঙ্গে। বিয়ের পর কবি নগেন্দ্রনাথকে আমেরিকায় পাঠিয়েছিলেন কৃষি বিদ্যা শেখার জন্য। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছা ছিল স্বদেশের কৃষিকাজের উন্নতিকল্পে নগেন্দ্রনাথকে কাজে লাগাবেন। কিন্তু নগেন্দ্রনাথ বিদেশে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথের কাছে বার বার চিঠি লিখতেন, আমার টাকার দরকার, আমার টাকার দরকার। উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখতেন আমার জমিদারী থেকে মাত্র আমি পাঁচশত টাকা গ্রহণ করি এ টাকা তো আমি পুরোটাই তোমাকে দিয়ে দেই। এখন আমি ধারের ওপরে আছি।

রবীন্দ্রনাথ মেয়েদের যাদের হাতে সম্প্রদান করেছিলেন তারা কিভাবে টাকার জন্য চিঠি লিখে তাঁকে তাগিদ দিত, কত যে নিষ্ঠুর আচরণ করত এবং রবীন্দ্রনাথ কিভাবে এসব অপমান নীরবে সহ্য করতেন তা আমরা তাঁর বিভিন্ন লেখায় জানতে পারি।

ছোট জামাই নগেন্দ্রনাথ আমেরিকা থেকে গ্র্যাজুয়েশন করে ফিরে আসেন ঠিক কিন্তু মীরার ভাগ্যে বেশিদিন স্বামী সঙ্গ লাভ হলো না। মীরা এক পুত্র ও এক কন্যার মা হওয়ার পর নগেন্দ্রনাথ খ্রীস্টান হয়ে মীরাকে ছেড়ে চলে যান। মীরার ছেলে নীতুকে রবীন্দ্রনাথ প্রকাশনা শিল্পে শিক্ষার জন্য জার্মানিতে পাঠান কিন্তু কবির এমনই দুর্ভাগ্য মাত্র ২০ বছর বয়সে নীতু ক্ষয় রোগে (যক্ষ্মায়) আক্রান্ত হয় এবং রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর ৯ বছর আগে মারা যায়।

তগুলো মৃত্যুর বেদনা পার হয়ে বুকে অসহ্য যন্ত্রণায় কবি কী করে সৃষ্টিশীলতার মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন তা ভাবতেও অবাক লাগে।

কবি যেমন দুঃখকে নিবিড়ভাবে অনুভব করেছেন তেমনি সে দুঃখের উর্ধ্বে ওঠার প্রচ- চেষ্টা তাঁর গান এবং কবিতার মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। সব বেদনা ও দুঃখকে অতিক্রম করে কবি এক অসাধারণ শক্তি বলে সারা জীবন নিত্য নতুন সৃষ্টির আনন্দে মেতে থেকেছেন, জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত ও দুঃখ বেদনাকে আনন্দে রূপান্তরিত করেছেন।