২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আত্মার গভীরতম অনুষঙ্গ

  • হাসনাত মোবারক

এক চিলতে কড়া রৌদ্রে ঝরে গেল সকালের প্রেম। তাতে কী? সে প্রেমের জীবন্ত ফসিল আমাদের ভাবায়, কাঁদায়। পঞ্চ ইন্দ্রীয়তে শিহরণ জাগায়। তাই তো প্রবোধ দিতে বুকের পাঁজরে কাঁটাতার আঘাত দিয়ে যায়। এত অল্পসময়ে হায়! ভোরের ভেজা বকুলতলার প্রেম। তুমি দূরের নক্ষত্র হয়ে চলে গেলে?

‘প্রতিটি নতুন শব্দই হলো শিল্পকলার সীমা/ হে অসীমা তুমি কথা বলছো না কেন? ’

প্রেম জাগতিক অনুভূতির মহীরুহ। আত্মার নিবিড়তম অনুষঙ্গ। শিল্পির গভীরতম উপাদান। তাই তো শব্দজালের বুননে প্রেম উঠে আসে কবির সৃষ্টির ক্যানভাসে। কখনো সে প্রেম আত্মিক আবার কখনো বা শারীরিক। তবে স্বল্প পরিসরে বলতে হয়, সেই প্রেম ধারণ করে আছে শিল্পির সৃজনের সত্তা। যথা শব্দের প্রয়োগবিধিতে ঝংকৃত নৃত্যমালায় অলঙ্কৃত হয়ে আছেন হাজার বছরের কাব্য সাহিত্যে। তিনি প্রতিনিধিত্বের দাবিদার। অবশ্যই। মূল্যায়িত কবি আবুল হাসান। এ স্বল্পায়ু কবি সীমার মধ্যে অসীমতায় ডুব দিয়ে গদ্য শেলির ধাঁচে নির্মাণ করেছেন বাংলা কবিতা। তিনি বিরলপ্রজ কবিদের একজন। যদি বলি পৃথিবীর সকল শব্দ সৈনিক কবিতার কাছে সতীর্থ। কিছু কিছু অগ্রগণ্য। সেই অগ্রগণ্যদের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান করে নেওয়া কবি আবুল হাসান। দেশ বিভাগত্তোর জন্ম নেওয়া কবি স্বাধীনতার চার বছর পর পরলোক গমন করেন। তাঁর সৃজনশীলতার কাছে আমরা নতজানু। মাত্র এক দশক কাব্য সাধনার স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার ১৯৭৫। একুশে পদক ১৯৮২। ১৯৭০ সালে এশিয়া কবিতা প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন। দশক ওয়ারি বিচারে তিনি ষাটের দশকের কবি। সে ফ্রেমে বেঁধে তাঁকে খাটো করবো না। বরং তিনি হয়ে উঠেছেন সার্বজনীন কবি। যাঁর বর্ণ ধারণ করে সব রঙের পাত্রে। উপমা, চিত্রকল্প, উৎক্ষেপণে শব্দের প্রয়োগবিধিতে তাঁর কবিতা গ্রহণযোগ্য।

তাঁর কাব্যের গুণাগুণ বিচারের জন্য নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর একটি সাক্ষাৎকারই যথেষ্ট। নীরেন্দ্রনাথ উত্তরসূরিদের কবিতার ক্ষেত্রে বলতে গিয়ে বলেছেন সেই কবে বাংলা একাডেমিতে কবিতা পাঠ শুনেছিলাম। ছোট্ট একটি ছেলে। অসাধারণ, চমৎকার তাঁর কবিতা। মারা গেছে অনেক বছর আগে, নাম আবুল হাসান।

স্নিগ্ধ শব্দ তরঙ্গে বুনট বেঁধেছে তাঁর কবিতা। এই ক্ষীণ আয়ু কবির প্রকাশিত গ্রন্থ

রাজা যায় রাজা আসে ১৯৭২, যে তুমি হরণকরোÑ ১৯৭৪

পৃথক পালঙ Ñ১৯৭৫, আবুল হাসান গল্প সংগ্রহÑ১৯৯০

কাব্যনাট্যÑ ওরা কয়েকজনÑ১৯৮৮

অল্পসময়ে অসাধারণ সৃষ্টিময়তার দ্যূতি ছড়িয়েছে বাংলা কাব্যে সাহিত্যে। এই দুর্লভ কবির জীবনাবসনে বাংলা কবিতার পথরেখা সত্যিই অপূরণীয়। কবি আবুল হাসানের কাব্যের শক্তি নির্ণয়ের জন্য সাধারণ কোন বাটখারা প্রয়োগ করলে চলবে না। কবি আবুল হাসানের মৃত্যুর ষোলো বছর পর কবি অসীম সাহার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘আবুল হাসান - প্রেমের কবিতা’ । আবুল হাসানের দু®প্রাপ্য কাব্যগ্রন্থগুলো সংগ্রহ করে একটি চমকপ্রদ নিটোল প্রেমের কবিতা সঙ্কলন করেন। এজন্য কবি অসীম সাহা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।

কবি আবুল হাসান যে কত শক্তিশালী কবি সে প্রমাণ স্বরূপ অগ্রজ কবি শাসসুর রাহমান ‘আবুল হাসান রচনা সমগ্রের’ ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন। এই রকম ভাষায় ভূমিকায় লিখেছেন-অল্পদিনের মধ্যেই হাসানের মনে পরে যায় চল্লিশের দশকের একজন বিখ্যাত কবির নামও আবুল হোসেন। তাই তিনি হোসেন থেকে হাসান এ রূপান্তরিত হলেন। এই নাম পরিবর্তনের পর তাঁর কবিতাও বদলে যেতে লাগলো। একজন খাঁটি কবির জন্ম হলো। এই কবির জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কবিতায় ভরপুর ছিল...

এ কথা অনস্বীকার্য কবি প্রেমিকসত্তা নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন কবিতার সরল শরীরে। চিন্তা ও অনুভূতির কল্পনীয় শক্তির নির্যাসে গড়ে উঠেছে তাঁর কবিতার প্রাণ।

আপাদমস্তক এই শিল্পীর কাব্যোচরণে ফুটে উঠেছে উদ্ভাসিত প্রেম। নিস্তরঙ্গে শব্দ সঙ্গীতে নির্মাণ করেছেন প্রেমের কবিতা। স্নায়ুতন্ত্রের অভিজ্ঞানে ধরা দিয়েছে দার্শনিক চেতনা। নির্মাণ কলা বিজ্ঞানে স্বাতন্ত্র্য স্থানে অধিষ্ঠিত এই কবির কবিতায় প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা পড়েছে প্রেম। নতুনত্ব শব্দ নির্মাণের এই কারিগর রূপক অন্তরালে প্রেমকে হাজির করছে পাঠকের দ্বারে। হয়তো এ কথা অস্বীকার করার জো; অগ্রজ, অনুজ বা বোদ্ধাদের কারও নেই। কবি আবুল হাসান যদি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণসহ আজকের যারা প্রতিনিধিত্ব করছে। এদের মতো দীর্ঘকাল কবিতার সাথে শরীরী উপস্থিত থাকতেন তাহলে তাঁর কবিতার বহুমাত্রিকতার দ্যূতি সমগ্র বিশ্বব্যাপী প্রতিফলিত হতো।

আবুল হাসানের কবিতায় যদিও প্রেমকে সামনে রেখে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর ভিতরে গূঢ় রহস্যের জালে খেলা করে দার্শনিক। যা পাঠ শেষে পাঠক বোদ্ধা অনুধাবনীয় হবেন।

‘কাছে যাই আর জল হই আর স্নান করি তাতে, আমার সবুজ স্নান/তোমার শরীর, পৃথিবী; যেখানে খ-িত কতো, নগর, ভাষা’

[চিরকালীনÑ আবুল হাসান প্রেমের কবিতা]

উপরিক্ত দুটো লাইন তর্জমা করতে গেলে সাধারণত একেকজন একেক রকম করে বসবে। আর এইটা কবির প্রয়াস সাধনার লক্ষ্য বস্তু। এই সবুজ স্নান শব্দটির উপস্থাপন ভঙ্গি সম্পূর্ণ এক জন কবির। সে কবির কষ্টিপাথরের মাধ্যমে নির্ণিত।

এখানে কবির স্পর্ধিত কালির কলমে ফুটে উঠেছে -

‘এসো তবে ঠোঁটে কাঁপন ধরাই/দু’জনের ঠোঁটে দূরের কুজন, হাওয়া শনশন চুম্বন গড়ে তুলি/একাকী থেকেও এখন আমরা এসো দু’জনের মুগ্ধতা আনি মুখে’

[জোৎস্নায় তুমি কথা বলছো না কেন- আবুল হাসান প্রেমের কবিতা]

কবি উপরের পঙক্তিদ্বয়ের মাঝে কবিতাকে রসসিক্ত সংলাপে চিরভাস্বর করে তুলেছেন। সর্বক্ষণিক আমরা আবুল হাসানের কবিতায় নতুন সংযোজন লক্ষ্য করি।

‘আমার একা থাকার পাশে তোমার হাহাকার নিয়ে দাঁড়াও/হে মেয়ে ম্লান মেয়ে তুমি তোমার হাহাকার নিয়ে দাঁড়াও’

[ভালোবাসার কবিতা লিখবো না- আবুল হাসান প্রেমের কবিতা]

উপরের দু’টো লাইনে আদ্য অনুপ্রাসের উপস্থিত দৃষ্টিনীয়। যা কবির কবিত্ব শক্তিকে বাড়িয়ে তুলছে। কবিতার অহংবোধও জাগিয়ে তুলছে বলে মনে করবো। বাতাবরণে কবি উজ্জ্বল, দৃষ্টিতে নন্দন কাব্যে উপহারের মাধ্যমে প্রেমকে অমর করে তোলার চেষ্টায় সফল হয়েছেন। এখানে-

‘রমণীর পেটের ভিতরে পুরুষের প্রথম শিশুর ফোঁটা/গড়িয়ে গড়িয়ে কোন সৃষ্টির সমুদ্র মাখে?

দেশে দেশে এই একই অন্ধকার যুবতী রমণী/ হয়ে ওঠো পুরুষের প্রধান সৃষ্টির কেন্দ্র সুনিকেত/ হে সুষমা কবে আমি তোমার অন্ধকার নির্বাচনে’

[তাকে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস : প্রেমের কবিতা আবুল হাসান]

আবেগনির্ভর সংলাপে কবি মথিত করে তুলেছেন কবিতাটিকে। যা অবশ্যই সুখপাঠ্য, বাস্তব উপযোগী। প্রেমের কবিতার মধ্যে কবি আস্তে ধীরে ঢুকিয়ে দিয়েছে উপদেশ আক্ষেপ অনুভূতি। বৈচিত্র্যতায় ভরপুর তাঁর কাব্যভূমি। যুক্তিনির্ভর উপস্থাপনার প্রগাঢ়করণে ফুটে উঠেছে তাঁর প্রেম ভালোবাসা।

‘লোহায় লোহিতবর্ণ মানুষের শাদা-কালো বর্ণের বিভেদে/ যখন পালক খসে অস্ত্রাঘাতে যখন যুদ্ধের কালো লেখা/

ছলকে ছলকে ধরে অধঃপাত, সুন্দরের শ্রেষ্ঠ অপচয়;/জলে ও ডাঙায় আমি বাধ দেই : শরীরে ঠেকাই বন্যা, প্রতিঘাত,/স্বপ্নের ভিতর আসছো না তবু তুমি আসছো না কেন আসছো না?

[ অপেক্ষা : আবুল হাসান প্রেমের কবিতা]

আবুল হাসান আছেন, থাকবেন। স্বল্পসময়ে বিস্তরভাবে ধরা দিয়েছেন কবিতার মায়াজালে। শব্দ পাঠের খড়িতে আবুল হাসান চরের মতো এখনো জেগে ওঠে। শারীরিক অন্তর্ধান হলেও কবির যে তিরোধান হয় না তার প্রমাণ আবুল হাসান। যোজন যোজন দূরে থেকেও নক্ষত্রের ছায়ালোকে মন্দ্রিত হই আবুল হাসানের প্রেম তথা প্রেমের কবিতা সঙ্কলনে।