২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বই ॥ বুলান্দ জাভীর’র ‘নির্বাচিত কবিতা’

কবির থাকে বহুমুখী চিন্তাস্রোত। ওই চিন্তাস্রোতের নিবিড় প্রকাশই হলো কবিতা। দীর্ঘ সময় ধরে কবি যে তার কবিতা বিনির্মাণে থাকেন নিমগ্ন। সেই মগ্নতার ভেতর দিয়েই পথ হাতড়ে যেতে যেতে বিরচিত কবিতার সন্নিবেশে একেক সময়ের ছবি কবিতার ফুটিয়ে তোলেন নির্ণিমেষ ভালো লাগায়। আর তা থেকেই বাছাইকৃত হয়ে কিছু কবিতা হয়ে যায় মলাটভুক্ত। মলাটভুক্ত ওই কবিতাই তখন কবির মনোবিশ্লেষণিক আবেগের ক্যানভাস থেকে কবির বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত এবং চিত্রিত করার দায়টুকু পালন করে সময়েরই নির্মোহ দায়িত্ববোধ থেকে।

আকাশ ঝেপে বৃষ্টির ফোঁটার মতো কবিতা নেমে আসে কবির কল্পনা জারিত হৃদয় থেকে। সেসব কবিতার উদ্যানে ফুটে থাকা অজস্র কসমস, কার্নেসন, ম্যাগনোলিয়ার মতো শব্দপুঞ্জের ফুল, ফুলে-ফুলে সুশোভিত তারাঙ্কিত অক্ষরের গ্রন্থিতে রচিত পঙ্ক্তিবীথিই একদিন কবিকে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় দিগন্তজ্বলা নীল ডুপ্লেক্স বাড়ির নির্জন বারান্দায়। আর ওই সুনসান বারান্দার টবে ফোটা জুঁই ও কাঠগোলাপের মর্মরে জেগে ওঠা কবিতার তরঙ্গমালায় এসে নামে নীলাম্বর মেঘমালা।

এভাবেই কবি বুলান্দ জাভীর রৌদ্রের তাঁতে বুনে কবিতাকে করে তোলেন একেকটি মসলিনি ভোর। আর ওই ভোরের ফ্লাশ্ডোর জুড়ে লতিয়ে ওঠা অ্যালোভেরা দিনের নির্যাস যায় গড়িয়েÑ যেনো মায়াবী শবনম। তখন ওই কবিতার কাজল নয়ন জুড়ে ফিঙের ডানার রেশমি মন তোলে অনর্গল হাওয়ার সিম্ফনি। কখনো কখনো বুলান্দ জাভীরের কবিতার দরোজায় এসে জ্যোৎস্নাঙ্কিত কলিংবেল বাজায় নিদারুণ কিরণজ্বলা চন্দ্রোজ্জ্বল সন্ধ্যার ছায়া।

বুলান্দ জাভীর এভাবেই তার প্রকাশিত সাতটি কাব্যগ্রন্থের পরতে পরতে কবিতাকে নিমিষে এক ভালো লাগার হিল্লোলে দেন ভাসিয়ে। ওই সাতটি কাব্যগ্রন্থ থেকেই বাছাই করে ২০১৫ এর অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে বুলান্দ জাভীরের নির্বাচিত কবিতার বই। বইটি প্রকাশ করেছে খেয়া প্রকাশনী। প্রচ্ছদ এঁকেছেন মোস্তাফিজ কারিগর। কোলাজ ফর্মের লেটারিঙে চার রঙা প্রচ্ছদটি নান্দনিকতার এক উজ্জ্বল শিল্প হয়ে উঠেছে রঙের চমৎকার কম্বিনেশনের অমিয় গুণে। প্রথম গ্রন্থেই কবি বুলান্দ জাভীর পাঠকের মর্মে দেন দোলা এভাবেÑ ‘তুমি ভালোবাস নাগরিক ভোর জুঁই। আর ভালোবাস আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠা ঘর বাড়ি/ অস্তবেলায় গেরুয়া মাটির পথ ধরে হেঁটে যাওয়া অত জোর নেই মনে/ তুমি ভালবাস যাকে/ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি।’ (প্রতিদ্বন্দ্বী/ টুলবেঞ্চি সময়ের জুঁই)

স্বপ্ন এবং চিত্রকল্পকে কত অভিনব উপায়ে বুলান্দ তার কবিতায় প্রয়োগ করেছেন উপর্যুক্ত কবিতার খ-াংশ কি তারই প্রমাণ বহন করে না! উদ্ধৃত কবিতাটি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া। এবার যাওয়া যাক তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের ঝাড়বাতি জ্বলা লাল গোধূলির উপত্যকায়Ñ ‘তুষার কণা/হে আমার হিমশীতল মেয়ে সোনালি চশমা রাখা ডিপ ফ্রিজে/কাচে জমে ওঠে ঘন কুয়াশা সাদাছড়ি হাতে মাইল মাইল নির্জন রাস্তার/পাশে দাঁড়িয়ে আছ।’ (তুষার কণা/ কোথা তুমি ঘনশ্যাম)’

পরাবাস্তবতার সেলুলয়েডের ফিতেয় অদ্ভুত চিত্রকল্পের ক্লাসিক্যাল ডকুমেন্টেশনের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে ‘তুষার কণা’ কবিতাটি।

অন্তরে নির্বাক বহ্নির আর্তিটা যেন আরও প্রবল আর গভীর। তারই রিদম যেন হৃৎস্পন্দনের রিডে দেয় নিঃসীম বিট্। ‘সব বড় মানুষের ভেতরই একটি অস্ফুট ক্রন্দন থাকে/তুমি শুনতে পাবে খুব কাছে গেলে/সব স্টারদের ভেতরই একটি বোবা আর্তনাদ/মাথা কুটে মরে/ কেউ শুনতে পায় না/কখনো কখনো নিজেও না’

(স্টারডমের ক্রন্দন/অন্তরে নির্বাক বহ্নি)

এবার তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ের পাতায়-পাতায় চোখ রেখে দেখে নেয়া যাক-কবি বুলান্দ জাভীর কতটা পাখি ব্যথা বুকে নিয়ে তৃষিত হয়ে আছেন! ‘তুমি নাই জেনেও ফোন করি/ রিসিভারে কান লাগিয়ে/চোখ দু’টি বন্ধ করে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেই/ আর কান পেতে শুনি/ তোমার বাড়ির প্রাণকেন্দ্রে/ তোমার বাড়ির হৃদয়ে রাখা কোন ফোন বাজছে/তার রিং-এর শব্দ তোমার শূন্য ঘরে/সন্তুর আর সেতারের বৃষ্টির মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে’

(তুমি নাই জেনেও ফোন করি/ তৃষ্ণা আমার বক্ষজুড়ে)

‘অবচেতনায় মুক্ত তুমিতে এসে কবি হয়ে ওঠেন আরো প্রাণোচ্ছ্বল। এ কাব্যগ্রন্থে এসে বুলান্দ জাভীর একচিলতে নস্টালজিক, একপশ্লা রাজনীতি, একরত্তি প্রেমে বেঁধেছেন কবিতার ফ্রেমÑ যেমন Ñ

আবার আমরা ফিরে যাই চলো/প্রথম দেখার ক্ষণে। /আবার আমরা ফিরে যাই চলো গতবার আশ্বিনে।/ ফিরে চাই চলো সেই সুর, লয়/ফিরে চাই চলো সেই বিস্ময়। অস্ফুট এক কথায় দামে সেই ক্ষণ নেই কিনে।’ (প্রথম দেখার ক্ষণ/ অবচেতনায় মুক্ত তুমি)

কবি বুলান্দ জাভীর লিখছেন তিনদশক কাল ধরে। আশির দশকের প্রণিধানযোগ্য কবি বুলান্দ জাভীর অপরাপর নন্দিত কবিদের মতোই এক বিজন ভোরের পাতাঝরা পথে এসে বাঁক ফেরেন হুইসেল বাজিয়ে। হ্যাঁ খুব নির্জন, প্রচ- নৈঃসঙ্গ এক বিকেল বেলায় নিঝুম রেল জংশনে এসে দাঁড়ায় তার বুকে জ্বেলে লোকোমোটিভের ভালোবাসায় ভেজা এক লাজুক ছায়া! ‘ভালবাসা একটি লাজুক ট্রেন’ কাব্যগ্রন্থে এসে বুলান্দ জাভীর এমনি করেই তার কবিতার হাইওয়েতে জ্বালিয়ে দেন তারার পেট্রোম্যাক্স। ‘ভালবাসা একটি লাজুক ট্রেন/ বৈধতার প্রশ্নে দূরে চলে যায়/ আমার অপারগ অঞ্জলি/আমার রাতজাগা চোখের লাল সিগনাল উপেক্ষা করে।’

(ভালোবাসা একটি লাজুক ট্রেন/ ভা.এ.লা. ট্রে.)

‘তবু বিহঙ্গ বন্ধ করো না পাখাতে এসে বুলান্দ জাভীরের কবিতা হয়ে যায় যেন আকাশে- আকাশে অজস্র ট্যুরিস্ট পাখি। আলোচ্য এ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো যেন ব্রাউন কালারের পুলওভার গায়ে চাপিয়ে নিজদেশের সীমা ছাড়িয়ে দেশ মহাদেশের দিগন্তের তারা এনে ছড়িয়ে দেয় পিঙ্ক্ রঙ কার্ডিগানের কারচুপি মর্মের ক্রিস্টালডোবা কার্নিশে! ‘আজ পড়ন্ত বিকেলে হাডসন/নদীর ধারে বোর্ড ওয়াকে দাঁড়িয়ে/নদীতটের বিপুল শহর উদ্যাপন। করার সময়/যুগান্তরের সেই সুপ্ত ইঁদুরটি/বুক পকেট থেকে লাফিয়ে/বিভুঁই নদীর বুকে হারিয়ে গেল। (হাডসন রিভার/ তবু বিহঙ্গ বন্ধ করো না পাখা) কবি বুলান্দ জাভীর তার নির্বাচিত কবিতার মধ্য দিয়ে পাঠকের পাঠোদ্যানে যে রডোডেন্ড্রন ফুল ফুটিয়েছেন এক চন্দ্রাতপ ভোরে। রেশমি হাওয়াকি যায় ট্যুরে বুলান্দের কবিতার অন্তপুরে জাগিয়ে মখমলি কবিতারই কোমল কলস্বর।

রেজা ফারুক

নির্বাচিত সংবাদ