২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রবীন্দ্রনাথ ১৯২২-১৯২৪ তিনটি বিদেশ সফর

  • সেন্টিনারি ভলিউম থেকে অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী

১৯২২ (৬১ বছর)

রবীন্দ্রনাথ ৫ জানুয়ারি শান্তিনিকেতনে ফিরে গেলেন। ১৪ জানুয়ারি তাঁর নাটক মুক্তধারা রচনা শেষ করলেন। ৩ ফেব্রুয়ারি ‘বাঙ্গালি’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খোলা চিঠিতে অসহযোগ আন্দোলনে সহিংসতার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দেনÑ সহিংসতা আন্দোলনের সারবত্তাকে বিনষ্ট করে দেবে। পরদিনই তার আশঙ্কা সত্য বলে প্রমাণিত হয় যখন ইউপির চৌরি চৌরাতে জনতার হাতে নির্দোষ পুলিশ খুন হয়। ২৩ মাঘ (৬ ফেব্রুয়ারি) শ্রীনিকেতনের পল্লী পুনর্গঠন প্রতিষ্ঠানটি এর প্রথম পরিচালক (লিওনার্দ) এলমহার্স্টকে সাথে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি শান্তিনিকেতন মলিয়ারের তিন শততম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হয়। ১০ মার্চ গান্ধীর গ্রেফতার হবার এবং তারপর তাঁর ছয় বছরের সশ্রম কারাদ- হবার সংবাদ শোনার পর কলকাতায় ‘মুক্তধারা’ মঞ্চস্থ করার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে দেন। ৮ জুলাই কলকাতা কবি শেলির জন্মশতবর্ষ উদযাপন সভায় সভাপতিত্ব করেন। ৯ জুলাই কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণ সভায় তিনি কবিকে নিয়ে স্বরচিত কবিতার নৈবেদ্য অর্পণ করেন।

বিশ্বভারতী সমিতির একটি স্থানীয় কমিটি কলকাতায় কাজ করতে শুরু করে। রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে ২৮ জুলাই অনুষ্ঠিত কমিটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এলমহার্স্ট ‘দ্য রোবারি অব দ্য সয়েল’ পাঠ করেন। ৮ আগস্ট একটি কমিটি বিদায়ী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রফেসর লেভিকে বিদায় জানানো হয়। ১৬ আগস্ট কলকাতায় প্রথমবারের মতো জনমঞ্চে ‘বর্ষামঙ্গল’ প্রদর্শিত হয়। বিশ্বভারতীর লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে ২১ আগস্ট প্রেসিডেন্সি কলেজের শিক্ষার্থীদের সামনে বক্তৃতা দেন। ১৬ সেপ্টেম্বর আলফ্রেড থিয়েটারে এবং ১৭ সেপ্টেম্বর মদন থিয়েটারে বিশ্বভারতীর জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে শারদোৎসব অভিনীত হয়; কবি নিজে সন্ন্যাসীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। বিশ্বভারতীর কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরাও তার সাথে একই মঞ্চে উঠে আসে। ১৮ সেপ্টেম্বর শান্তিনিকেতনে দ্বীপেন্দ্রনাথের (রবীন্দ্রনাথের বড় দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ছেলে) মৃত্যু হয়। ২০ সেপ্টেম্বর তিনি বোম্বে হয়ে পুনা যাত্রা করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর পুনার কিরলস্কর থিয়েটারে ভারতীয় রেনেসাঁ নিয়ে বক্তৃতা দেন। সার্বজনিক সবার বৈঠকে তিলক স্মৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন। (সি এফ) এন্ড্রুজকে সাথে নিয়ে দক্ষিণ ভারত সফরে বের হন, তার অংশ হিসেবে ২৭-২৮ সেপ্টেম্বর ব্যাঙ্গালোর ২৯-৩০ সেপ্টেম্বর মাদ্রাজ এবং ১-৩ অক্টোবর কোইম্বাটোর সফরে ‘দ্য ভিশন অব ইন্ডিয়াস হিস্ট্রি’ ‘দ্য স্পিরিট অব মডার্ন টাইমস’, ‘অ্যান ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি’ ইত্যাদি বিষয়ে বক্তৃতা করেন। কলম্বো যাত্রার আগে এক সপ্তাহের বিশ্রাম নিতে ব্যাঙ্গালোর চলে যান।

প্রথম সিংহল সফর

কলম্বো ও গল-এ ধারাবাহিক বক্তৃতা দেন। নুয়ারা এশিয়ার স্বাস্থ্যনিবাসে এক সপ্তাহ সময় কাটান। ৯ নভেম্বর মূল ভূখ-ে ত্রিভানদ্রুমে আসেন। সেখান থেকে মাদ্রাজ ফেরার পথে কুইলন, এরনাকুলাম, আলেপি¥, কোচিন, ভালওয়ে এবং টাটাপুরামে সংক্ষিপ্ত যাত্রা বিরতি দিতে দিতে ১৯ নভেম্বর গন্তব্যে পৌঁছান। মাদ্রাজ থেকে বোম্বে আসেন এবং ২৩ নভেম্বর থেকে এক সপ্তাহ সেখানে অবস্থান করেন। পার্সি সম্প্রদায়ের নেতাদের নিয়ে বিশ্বভারতীতে জোরাস্ত্রিয়ান স্টাডিজ বিভাগ খোলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে আহমেদাবাদ আসেন এবং সারা ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ৪ ডিসেম্বর সবরমতি আশ্রম পরিদর্শনে আসেন, সাথে ছিলেন অ্যান্ড্রুজ। আশ্রমের বাসিন্দাদের উদ্দেশে ‘গান্ধী যে সত্যিকার ত্যাগ স্বীকারের প্রতিনিধিত্ব করেন’ সে সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন (সে সময় গান্ধী জেলে ছিলেন)। প্রায় তিন মাস অনুপস্থিতির পর শান্তিনিকেতনে ফিরে আসেন। মরটিৎজ ভিন্টারনিৎজ ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে শান্তিনিকেতনে যোগ দেন। সে সময়কার খ্যাতিমান ভিজিটিং স্কলারদের মধ্যে ছিলেন ভি লেজনি, স্টেলা ক্রামরিশ, শলোমিত ফ্লাউম, ফার্নান্দ বেনো, মার্ক কলিন্স এল, বোগদানভ, আর্থার গিডিস এবং স্ট্যানলে জোন্স।

১৯১২-এর বাংলা প্রকাশনা : লিপিকা, মুক্তধারা ও শিশু ভোলানাথ

ইংরেজি প্রকাশনা : ক্রিয়েটিভ ইউনিটি (প্রবন্ধ)

১৯২৩ (৬২ বছর)

অবনীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন সফরে আসেন, কবি তাঁকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা প্রদান করেন। ৯ জানুয়ারি কবির দ্বিতীয় ভাই সত্যেন্দ্রনাথ মৃত্যুবরণ করেন। বাংলার গভর্নর লর্ড লিটন শান্তিনিকেতন দেখতে আসেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গীতিনাট্য ‘বসন্ত’ কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেন (নজরুল তখন জেলে)। প্রবাসী বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে ২৮ ফেব্রুয়ারি বেনারস যাত্রা করেন। বেনারসের পর লক্ষেèৗতে অতুল প্রসাদ সেনের বাড়িতে আসেন এবং ৫-১০ মার্চ সেখানে অবস্থান করেন; তারপর বোম্বে হয়ে আহমেদাবাদ গমন করেন।

১৯ থেকে ৩০ মার্চ : প্রথমবারের মতো সিন্ধু যান, প্রথমে করাচিতে ছিলেন, তারপর হায়দারাবাদ। দু’জায়গাতেই তাকে অনেকগুলো সভায় যোগ দিতে হয়। করাচি থেকে স্টিমারে গুজরাটের কাথিওয়ারে বারবন্দর চলে যান। সেখানে এক সপ্তাহ থেকে বোম্বে হয়ে ১০ এপ্রিল শান্তিনিকেতন ফিরে আসেন। বাংলা নববর্ষে (১৪ এপ্রিল) বিদেশি প-িতদের অবস্থানের জন্য নির্মিত

অতিথিশালা রতন কুটীর উদ্বোধন করেন। এটি নির্মাণের জন্য লেডি রতন টাটা ২৫,০০০ টাকা দান করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় এপ্রিল থেকে বিশ্বভারতী ত্রৈমাসিকীর প্রকাশনা শুরু হয়। গ্রীস্মের সময়টা শিলঙে কাটান এবং তখন ‘রক্তকরবী’র প্রথম খসড়াটি শেষ করেন। ২৮ জুন ভবানিপুর সাহিত্য সমিতির সভায় বঙ্কিম চন্দ্রের ওপর একটি বক্তৃতা দেন। সংবাদপত্রের সাথে সাক্ষাৎকারে তিনি নবগঠিত স্বরাজ পার্টির কর্মসূচি সম্পর্কে বলেন এবং হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ওপর জোর দিয়ে বলেন, উভয়ের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করার মধ্য দিয়ে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। ‘বিশ্বভারতী ত্রৈমাসিকী’তে ‘দ্য ওয়ে টু ইউনিটি’তে তিনি এ সম্পর্কে তার মনোভাব ব্যক্ত করেন। কোলকাতর এম্পায়ার থিয়েটারে তিনদিন (২৫,২৭,২৮ আগস্ট) বিসর্জন নাটকটি মঞ্চস্থ হয়, কবি নিজে জয়সিংহের ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং নাটকটি বহুল প্রশংসিত হয়। সেপ্টেম্বরের গোড়ার দিকে শান্তিনিকেতন ফিরলেন। ৩০ সেপ্টেম্বর টেলিগ্রাম পেলেন ইতালিতে ট্রেন দুর্ঘটনায় পিয়ার্সন মৃত্যুবরণ করেছেন।। পিয়ার্সনের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য শান্তি নিকেতনে একটি হাসপাতাল স্থাপনের জন্য তহবিল সংগ্রহের আহ্বান জানালেন। নভেম্বরে তিনি এন্ড্রুজ এবং ক্ষিতিমোহন সেনকে নিয়ে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্যগুলো সফরে বের হলেন। উদ্দেশ্য ১৯১৯-এ শান্তিনিকেতনে স্থাপিত কলা ভবনের ফাইন আর্টস বিভাগের জন্য তহবিল সংগ্রহ। বাংলা প্রকাশনা : বসন্ত (গীতিনাট্য)।

১৯২৪ (বয়স ৬৩)

৬ ফেব্রুয়ারি শান্তিনিকেতনে পল্লী পুনর্গঠন ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করলেন। জাপানি কলাকুশলীদের তৈরি বৃক্ষের উপর একটি কুটীরে প্রবেশ করলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে কবি মনমোহন ঘোষ স্মরণে আয়োজিত সভায় যোগদানের জন্য কলকাতা এলেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি অ্যান্টি ম্যালেরিয়াল সোসাইটি অব বেঙ্গলের বার্ষিক সভায় যোগ দিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে একটি কোর্সে তিনটি বক্তৃতা দিলেন। পরে এগুলো ‘সাহিত্যের পথে’ গ্রন্থে সংকলিত হয়।

একই বছর তিনি চীন ও সিংহল সফর করেন।

৬ষ্ঠ সফর (মার্চ জুলাই ১৯২৪)

২১ মার্চ ১৯২৪ ইউনিভার্সিটিস লেকচার অ্যাসোসিয়েশন অব চায়নার প্রেসিডেন্ট লিয়াঙ্গ শি-চাও-এর আমন্ত্রণে চীনের উদ্দেশে জাহাজে চড়েন। সফরসঙ্গী হিসেবে সাথে নিয়েছেন ক্ষিতিমোহন সেন, নন্দলাল বসু, লিওনার্দ কে, এলমহার্স্ট, কালিদাস নাগকে। সফরের খরচ যোগান শেঠ জি ডি বিড়লা। যাত্রাপথে রেঙ্গুন (২৪-২৭ মার্চ), পেনাঙ (৩০ মার্চ), কুয়ালালামপুর (৩১ মার্চ), সিঙ্গাপুর (২-৬ এপ্রিল) এবং হংকং-এ (১০ এপ্রিল) বড় সংবর্ধনা লাভ করেন। তখন সান ইয়াত সেন ক্যান্টন থেকে কবিকে স্বাগতপত্র পাঠান তা কবির হস্তগত হয়। ১২ এপ্রিল সাংহাই পৌঁছেন। সেদিন সন্ধ্যায় কার্সন চ্যাঙ্গ-এর গার্ডেন পার্টিতে কবি তার ‘মৈত্রী’ ধারণার উপর ভিত্তি করে চীন ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহ্যগত ও পুরাতন বন্ধুত্বের উপর বক্তৃতা করেন।

১৩ এপ্রিল তাকে সুদৃশ্য লেক ডিস্ট্রিক্ট হাঙ্গচো নিয়ে আসা হয়। তিনি এখানে বিশ্রাম নিয়ে ভ্রমণের অবসাদ কাটিয়ে উঠেন। ১৬ এপ্রিল এখানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তৃতা দেন। সাংহাই ফিরে এসে ১৭ এপ্রিল জাপানি সম্প্রদায়ের একটি সভায় বক্তৃতা দেনÑ জাপানের সাম্রাজ্যবাদী প্রবণতার জন্য অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং পশ্চিমের বস্তুবাদের প্রবল আঘাত এবং জাতীয়তাবাদের উপর এর অনিবার্য প্রভাব এশীয় দেশগুলো প্রতিহত করতে সক্ষম হবে। ১৯ এপ্রিল পিকিং যাত্রার আগে তাকে স্বাগত জানাতে পঁচিশটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এসে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। পিকিং-এর পথে অল্প সময়ের জন্য নানকিং-এ যাত্রা বিরতি করেন এবং ২০ এপ্রিল নতুন যুগের সারাৎসার এবং তাতে এশিয়ার ভূমিকা নিয়ে নানকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। ২২ এপ্রিল জিনান-এ শানতুঙ্গ খ্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটিতে শান্তিনিকেতন সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন। ২৩ এপ্রিল তিনি পিকিং পৌঁছলে অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট লিয়াঙ্গ শি-চাও (কবিকে চীনে যিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন) এবং ট্যাগোর রিসেপশন কমিটির সদস্যরা তাঁকে স্বাগত জানান। প্রাকৃতিক দৃশ্য সমৃদ্ধ পি হাই লেকে কমিটি কবিকে ২৫ এপ্রিল আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা প্রদান করে। সেদিনই সন্ধ্যায় অ্যাঙ্গলো-আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত সভায় রবীন্দ্রনাথ পূর্ব-পশ্চিমের সম্পর্ক যে খোলামেলা বক্তৃতা দেন তা চীনের বামপন্থী সংবাদপত্রে তিক্ত সমালোচনার সৃষ্টি করে। সংবাদপত্র তাঁকে সব ধরনের প্রগতির বিরুদ্ধে প্রাচ্যের প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে চিহ্নিত করে। প্রবল পাশ্চাত্য প্রভাবান্বিত একদল চাইনিজ তরুণ যারা বামপন্থীদের প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়েছিল, ২৫ এপ্রিল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কবির অভিভাষণের আগে যারা বাধা দিয়েছিল তারা। ভাষণ শোনার পর প্রকাশ্যে কবির মৈত্রী মিশনের প্রশংসা করতে থাকে।

২৫ এপ্রিল স্কলার্সটি দিয়ে শুরু হয়। ২৭ এপ্রিল কবির সম্মানে ন্যাভি ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয় স্কলার্স ডিনার। সেখানে কবি চীনের বুদ্ধিজীবী ও পিকিং নগরীর এলিটদের সাথে পরিচিত হন এবং সেখানে তাকে ‘বিপ্লবের মহান কবি’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। জবাবে তিনি বাংলা সাহিত্যে বিপ্লবের সৃষ্টিশীল দিকগুলো কিভাবে বাংলা সাহিত্যে প্রকাশিত হয়েছে তার বর্ণনা দেন। সেদিন সকালবেলা ফরবিডেন সিটির (নিষিদ্ধ নগরী) রাজপ্রাসাদে সাবেক সম্রাট (পরে হেনরি পু য়ি) কবিকে স্বাগত জানান। ২৮ এপ্রিল টেম্পল অব আর্থে একটি বিশাল ছাত্র সমাবেশে তিনি নিজেকে বরং এশীয় সাংস্কৃতিক ঐক্যের উপাসক হিসেবে বর্ণনা করেন, তিনি এশিয়ান রাজনৈতিক কনফেডারেশনের উকিল নন। ইয়াং ম্যান’স বুড্ডিষ্ট এ্যাসোসিয়েশন অব চায়না তাকে ২৯ এপ্রিল কে ইয়েন প্যাগোডায় ভাষণ দেয়ার অনুরোধ জানায়। প্রধান যাজক মহাপবিত্র রেভারেন্ড তাও কাই কবিকে স্বাগত জানান এবং লিউ ইয়েন হন তার সম্মানে একটি স্বাগত কবিতা আবৃত্তি করে শোনান (কবিতাটি পরে দ্য গোল্ডেন বুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়)। মে মাসের প্রথম অংশটি মার্কিন সহায়তাপুষ্ট জিং হুয়া কলেজের অতিথি নিবাসে কাটান। কলেজটি পিকিংয়ের উপশহরে, তিনি সেখানকার শিক্ষার্থীদের সাথে ভ্রান্ত ধারণাসমূহ থেকে বেরিয়ে আসা নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করেন। তিনি পিকিং ফিরে এলে ৮ মে পিকিং ক্রিসেন্ট মুন সোসাইটি পিইউএমসি অডিটরিয়ামে তার জন্মদিনের উৎসব পালন করে। অনুষ্ঠানে মাস্টার অব সিরিমনির ভূমিকায় ছিলেন হু শি এবং সে উৎসবে কবিকে একটি বিশেষ চাইনিজ নাম দেয়া হয় চু চেন-তান। নাম ঘোষণা করেন লিয়াঙ্গ শি-চাও। চিত্রা নাটকের ইংরেজী ভার্সন মঞ্চে অভিনীত হয়।

৯ মে কবি চেন সোয়াঙ্গ থিয়েটারে প্রদত্ত প্রথম ভাষণে চাইনিজ দর্শক ও শ্রোতাদের সামনে নিজেকে এবং নিজের দেশকে তুলে ধরে যে তিনটি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারতকে এগোতে হয়েছে এবং যে সময়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন তা ব্যাখ্যা করেন। তিনি যে তিনটি ভাষণ দেন : ‘দ্য রুল অব জায়ান্ট’, ‘সিভিলাইজেশন এ্যান্ড প্রোগ্রেস’, ‘সত্যম এ্যান্ড জাজমেন্ট’ (পরে ‘টকস ইন চায়না’ গ্রন্থে সংকলিত হয়)। ১৩ মে তিনি চিকিৎসকের পরামর্শে দিনের সব কর্মসূচী বাতিল করে ওয়েস্টার্ন হিলসে গিয়ে বিশ্রাম নেন। ১৮ মে পিকিং ফিরে আনেন। পরদিন চেন কোয়াঙ্গ থিয়েটারে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব রিলিজিয়ন আয়োজিত সভায় বিদায়ী ভাষণ দেন। সেদিনই সন্ধ্যায় চীনের বিখ্যাত নারী অভিনয়শিল্পী মাই-ল্যাঙ্গ ফ্যান কবির সম্মানে কাই মিঙ্গ থিয়েটারে লো শান (লো নদীর ঈশ্বরী) উপস্থাপন করেন।

২০ মে পিকিং ছেড়ে রেলযোগে তায়ানফু গমন করেন এবং ২৩ মে পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। ২৫ মে চলে এলে হ্যানাকাও, সেখান থেকে নৌকায় সাংহাই রওনা হলেন। ২৮ মে সাংহাই পৌঁছে বিকেলে মিসেস বেলার স্কুলে শিশুশিক্ষার ওপর ভাষণ দেন। ২৯ মে কার্সন চ্যাঙয়ের বাড়ির বাগানে গার্ডেন পার্টিতে কবিকে বিদায় সংবর্ধনা জানানো হয়। ৩০ মে কবি ও তার সঙ্গীরা জাহাজে জাপান রওনা হলেন।

নাগাসাকিতে অবতরণ করে কাইসু দ্বীপের বেপ্পু উষ্ণ এক্সবনের কাছে অবকাশ রিসোর্টে চলে এলেন। জাপানে তিনি আরও যে সব জায়গায় গিয়েছেন তার মধ্যে রয়েছে ফুকুদা, শিমোনোসেকি, কোবে, ওসানা, নারা এবং কিয়োটো। কিয়োটো থেকে টোকিও রওনা হয়ে ৭ জুন সেখানে পৌঁছলেন। বহু গুণমুগ্ধ রেলস্টেশনে তাকে বরণ করে নিল এবং সানন্দে সমন্বয়ে ‘বানজাই’ উচ্চারণ করল। টোকিওতে থাকাকালে কবি ইম্পেরিয়াল ইউনিভার্সিটি, ওমেনস ইউনিভার্সিটি ও ন্যাশনাল লেডিস এ্যাসোসিয়েশনের সভায় বক্তৃতা দেন। ইম্পেরিয়াল হোটেলের প্যান-প্যাসিফিক ক্লাবের মধ্যাহ্নভোজে বক্তব্য রাখেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে বলতে গিয়ে জাপানীদের জন্য তার ‘গভীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধার কথা উল্লেখ করেন কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ‘নির্মমতা ও দক্ষতায় পাশ্চাত্যের’ যে কৌশল জাপানের সে পথ অনুসরণ করার নিন্দা জানান। বিখ্যাত বিপ্লবী নির্বাসিত ভারতীয় রামবিহারী বসুর সাথে সাক্ষাত করেন। ইয়েনো পার্কে তিনি বিদায়ী ভাষণ দেন। কোবেতে ফেরার পথে নিক্কোতে কিছু সময় কাটান। কবির দূরপ্রাচ্য সফরের একটি সরাসরি সুফল হচ্ছে এশিয়ার ঐক্যবদ্ধতার ওপর জোর দিয়ে সাংহাইতে প্রতিষ্ঠিত এশিয়াটিক এ্যাসোসিয়েশন। কবি ২১ জুলাই ভারতে ফিরে আসেন।

বাংলার গবর্নর লর্ড লিটন ঢাকায় প্রদত্ত ভাষণে বাংলার নারীদের হেয় করতে যে মন্তব্য করেছেন তা চ্যালেঞ্জ করে রবীন্দ্রনাথ তাকে একটি খোলা চিঠি লিখেন। ১৪ সেপ্টেম্বর কলকাতার আলফ্রেড থিয়েটারে অরূপরতনের মঞ্চাভিনয়ে অংশগ্রহণ করেন।

৭ম বিদেশ সফর

পেরুর স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপনে আমন্ত্রিত হয়ে কবি ২৪ সেপ্টেম্বর কলম্বো থেকে এসএস হারুনা মারু জাহাজে যাত্রা করলেন। সাথে রথীন্দ্রনাথ, প্রতিমা দেবী, সিরিজাপাতি রায়চৌধুরী এবং সুরেন্দ্রনাথ কর। ফ্রান্সের চেরবর থেকে ১৮ অক্টোবর এসএস আন্দেজ জাহাজ আর্জেন্টিনার পথে কবিকে নিয়ে পাল উড়িয়ে দিল। এবার সাথে তার সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দিলেন এলমহার্স্ট। জাহাজেই তিনি তার দিনলিপি যাত্রী লিখতে শুরু করলেন, পূরবীর কবিতাগুলোও জাহাজে লিখেছেন। সমুদ্রযাত্রায় অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তার পেরু যাওয়া বিঘিœত হলো, ৭ নবেম্বর জাহাজ বুয়েনস আইরেস বন্দরে ভিড়লে তাকে নেমে যেতে হয়। মাদাম ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো কবিকে তার সযতœ ভালবাসা দিয়ে বুয়েনস আইরেসের উপশহরে সান ইসিদ্রোতে তাদের বাগানবাড়িতে আতিথ্য দিলেন। ‘পূরবী’র জন্য কবিতা রচনা অব্যাহত রাখলেন। ১৯২৫-এ যখন বইটি প্রকাশিত হলো তিনি তাকে আতিথ্য প্রদান করা এই নারীকে উৎসর্গ করেন এবং উৎসর্গপত্রে তাকে বিজয়া নামে সম্বোধন করেন। ‘পূবরী’র পা-ুলিপিতে বিভিন্ন শৈল্পিক ডিজাইন আঁকা ও মুছে ফেলার চিহ্ন রয়েছে। তার চিত্রশিল্পের জগতে প্রবেশের সৃষ্টিশীল উদ্যোগের এখানেই সূচনা। আর্জেন্টিনা ত্যাগের প্রাক্কালে ৩০ ডিসেম্বর সে দেশের প্রেসিডেন্ট ডক্টর আলভিয়ারের সাথে সাক্ষাত করেন।

২৪ সেপ্টেম্বর কুখ্যাত বেঙ্গল অর্ডিন্যান্স জারি হলে বহুসংখ্যক বাঙালী যুবক গ্রেফতার ও অন্তরীণ হয়। কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র সুভাষচন্দ্র বসুও গ্রেফতার হন। ডিসেম্বরে গান্ধী ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের বেলগুয়াম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

ইংরেজি রচনা : লেটার্স ফ্রম এ্যাব্রভ (১৯২১-২২-এ সিএফ এ্যা-্রুজকে লেখা চিঠি), গোরা, দ্য কার্সেস অব ফেয়ারওয়েল (বিদায় অভিশাপের অনুবাদ, ই জে থম্পসন কৃত)।

[উৎস : অ্যা সেন্টিনারি ভলিউম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৮৬১-১৯৪১; প্রকাশক : সাহিত্য একাডেমি।]