২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

২২শে শ্রাবণ কবি বললেন, ‘চললুম’

  • মাহবুব রেজা

তাঁর শরীরের অবস্থা তখন মোটেই ভাল নয়। তবু কাছের মানুষের ক্রমাগত চাপে কবি একরকম বাধ্য হলেন অস্ত্রোপচারে। কাছের মানুষের প্রত্যাশা অস্ত্রোপচারে যদি কবি সেরে ওঠেন! অস্ত্রোপচার হলো ঠিকই কিন্তু তিনি আর সেরে উঠলেন না। চিকিৎসার ধকল সইতে পারলেন না। ফলাফল শরীর ভেঙে গেল। ক্লান্ত প্রাণ। বেলায় বেলায় বয়সও তো আর কম হলো না। জোড়াসাঁকোর বাড়ির সরু গলিতে মোটরগাড়ির আনাগোনা বেড়ে গেছে। কবিকে শেষবারের মতো দেখতে লাইন দিয়েছেন তাঁর আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত অপরিচিত মানুষজন।

কবির মুখে অক্সিজেন দেয়া। শ্বাস-প্রশ্বাস, নাড়ির স্পন্দন দ্রুত ক্ষীণ হয়ে আসছে। শরীর ঠা-া হয়ে আসছে। অস্ত্রোপচারের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত (৩০ জুলাই-৭ আগস্ট কবির পাশে) সর্বক্ষণিক ছিলেন রানী চন্দ ও নির্মল কুমারী মহলানবিশ। শ্রীমতী রানী চন্দ তাঁর এক লেখায় সে সব দিনের উল্লেখ করছেন, ৩০ শে জুলাই। আজই অপারেশন হবে। সকাল থেকে তারই তোড়জোড় চলছে। তখনও কবিকে জানানো হয়নি। তাঁকে আজ তেমন প্রফুল্ল দেখাচ্ছে না। কি যেন ভাবছেন।’

অস্ত্রোপচারে একেবারেই মনের সায় ছিল না কবির। তাঁর ভেতরে একটা ভয়, উৎকণ্ঠা কাজ করেছিল এ ব্যাপারে। সবাই কবিকে সান্ত¡না দিয়ে সাহস যুগিয়ে বলছিলেন, ‘ও আর এমন কী! ভয়ের কিছু নেই।’

কবি সম্ভবত তাঁর স্বজন, প্রিয়জন, চিকিৎসকদের এই সান্ত¡না বাক্যে ঠিক ভরসা রাখতে পারেননি। কবি চেয়েছিলেন জীবনের শেষ দিনটা অন্তত শান্তিনিকেতনের সুশীতল পরিবেশে কাটুক। শান্তিনিকেতন ছেড়ে যেতে চাচ্ছিলেন না তিনি। কিন্তু কী আর করা। অগত্যা তাঁকে শান্তি নিকেতন ছেড়ে অস্ত্রোপচারের জন্য কলকাতায় যেতে হলো। শান্তিনিকেতন ছেড়ে তিনি যখন চলে যাচ্ছিলেন তখন তাঁকে বেশ বিষণœ আর বিমর্ষ লাগছিল। চলে যাবার সময় তিনি সবার উদ্দেশ্যে বিষণœ কণ্ঠে বললেন, ‘চললুম।’

কলকাতায় যাওয়ার পর তাঁকে তাঁর অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার ব্যাপারে সমস্ত সতর্কতার কথা জানিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে বলে জানিয়ে দেয়া হলো, ‘সবকিছুই ঠিকঠাক মতো হয়েছে, সাবধানের মার নেই।’ এ কথা শুনে কবির সরস জবাব ছিল বেশ মনে রাখার মতো। তিনি ত্বরিত জবাব দিয়ে বলেছিলেন ‘মারেরও সাবধান নেই।’ পরবর্তী সময়ে কবির সরস জবাবটিই অমোঘ সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছিল।

কবি বুঝতে পেরেছিলেন অস্ত্রোপচারের ধকলটা এ যাত্রায় তিনি সামাল দিতে পারবেন না। বিছানায় তাকে বিষণœ, মনমরা দেখাল। শেষ যাত্রার রেখাচিত্রও বুঝি কবি তাঁর উপলব্ধিতে আঁকতে পেরেছিলেন। শ্রীমতী রানী চন্দকে কবি ইশারায় কী যেন লিখতে বলে বললেন ‘লেখো’। কবি অস্ফুট স্বরে বলছেন আর রানী চন্দ লিখছেন, ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছো আকীর্ণ করি’...। প্রথম লাইন লিখিত হয়ে গেলে পরে আরও তিন লাইন সংযুক্ত করলেন। পরে কবি চেয়েছিলেন কবিতার কিছু সংশোধন করতে কিন্তু তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এটাই ছিল কবির শেষ কবিতা তবে এর আগের দিন বিকেলে কবি মুখে মুখে বলে লিখিয়েছিলেন, ‘দুঃখের আঁধার রাত্রি’ কবিতাটি।

কবি আসলে কেমন মৃত্যু আশা করেছিলেন? কবি কায়মনোবাক্যে চেয়েছিলেন শান্তি নিকেতনের সবুজে-শ্যামলে তাঁর কাক্সিক্ষত মৃত্যু হোক। শান্তিনিকেতনের প্রতি কবির ছিল অপার ভালোবাসা। আত্মীয়স্বজন, প্রিয়জনদের তিনি একথা বেশ ক’বার বলেওছিলেন, ‘এখানেই আমাকে শান্তিতে মরতে দাও না কেন? বাঁচা তো অনেক হল’। মৃত্যুর আগাম বার্তা যেন কবি আগে থেকেই অনুভব করতে পেরেছিলেন। আর এই অনুভবের কথাটা তিনি মৃত্যুর ক’দিন আগে নির্মলকুমারী মহলানবিশকে বেশ অনুরোধ করে বলে গিয়েছিলেন, ‘তুমি দেখো, কলকাতার উন্মত্ত কোলাহলের মধ্যে ‘জয় বিশ্বকবি কি জয়, জয় রবীন্দ্রনাথের জয়, বন্দে মাতরম এরকম জয় ধ্বনির মধ্যে যেন আমার সমাপ্তি না ঘটে। আমি যেতে চাই শান্তিনিকেতনের উদার মাঠের মধ্য দিয়ে।’ জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কবি তাঁর চারপাশে মানুষের উপস্থিতি টের পাচ্ছেন। স্তব্ধ রানী চন্দ। স্তব্ধ নির্মলকুমারী মহলানবিশ। স্তব্ধ সবাই। ঘরের ভেতরকার বাতাস ভারি হয়ে আসছে। এর মধ্যে রানী চন্দ স্পষ্ট শুনতে পেলেন বারান্দায় কে যেন গাইছেন, কে যায় ‘অমৃতধামযাত্রী’ কবির মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল বাইরে। তারা কবিকে শেষবারের মতো দেখতে চাইছেন। কবির শেষযাত্রায় সঙ্গী হতে কে না চায়!

মৃত্যুর পর কবিকে দেখতে কেমন লাগছিল?

রানী চন্দের ভাষায়, ‘ দেখে মনে হতে লাগল যেন রাজবেশে রাজা ঘুমুচ্ছেন মৃত্যু শয্যার উপরে। ক্ষণকালের জন্য সব ভুলে তন্ময় হয়ে রইলাম। ...তিনটে বাজতে হঠাৎ এক সময়ে গুরুদেবকে সবাই মিলে নিচে নিয়ে গেল। দোতলার পাথরের ঘরের পশ্চিম বারান্দা হতে দেখলাম- জনসমুদ্রের উপর দিয়ে যেন একখানি ফুলের নৌকা নিমেষে দৃষ্টির বাইরে চলে গেল।’

নির্মলকুমারী মহলানবিশের লেখায় দেখা যাচ্ছে কবি তাঁর জীবদ্দশায় যে শঙ্কার কথা রানী চন্দকে বলে গিয়েছিলেন তাই সত্য বলে প্রতীয়মান হলো। নির্মল কুমারী মহলানবিশ লিখছেন, ‘বেলা তিনটার সময় একদল অচেনা লোক ঘরের মধ্যে ঢুকে নিমিষে আমাদের সামনে থেকে সেই বরবেশে সজ্জিত দেহ তুলে নিয়ে চলে গেল। যেখানে বসেছিলাম সেখানেই স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। শুধু কানে আসতে লাগলÑ জয় বিশ্বকবির জয়, জয় রবীন্দ্রনাথের জয়, বন্দে মাতরম।’ এদের আঁকা ছবি থেকে রবীন্দ্রনাথের শেষ যাত্রার অবস্থাটা, বিশেষত স্থূল অশ্লীলতার দিকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর আশ্চর্য যে রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যত আশঙ্কা অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে উঠল।’

রবীন্দ্রনাথ যে স্থূলতাকে ভীষণভাবে অপছন্দ করতেন তাঁর শেষযাত্রার সঙ্গী হয়েছিল তা বড় নির্লজ্জভাবে।

॥ দুই ॥

কবির মৃত্যুর পর গণমাধ্যমে তাঁর মৃত্যু সংবাদ বেশ গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়। ডেইলি হেরাল্ড ৮ আগস্ট (১৯৪১) ‘টেগোরের শেষ বাণী’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে, ‘খ্যাতনামা কবি স্যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার দেহে অস্ত্রোপচারের পর গতকাল কলিকাতায় মারা গেছেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। গত রাতে লন্ডনবাসীদের উদ্দেশে তাঁর শেষ বাণীতে কবি বলেন, ‘সভ্যতা ও মানব মর্যাদা রক্ষায় পশ্চিমা মানবতার ব্যর্থতা আমার অন্তরে দঃস্বপ্নের বোঝা হয়ে চেপে বসে আছে।’ এ ব্যর্থতার কারণ প্রসঙ্গে তিনি নৈতিক মূল্যবোধ বর্জন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ও তুলে ধরেন।’

একই তারিখ অর্থাৎ ৮ আগস্ট ১৯৪১ দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ এবং মর্নিং পোস্ট প্রায় একই ভাষায় কবির মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ করে বলে, ‘বিখ্যাত ভারতীয় কবি স্যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কলকাতাস্থ বাসভবনে ৮০ বছর বয়সে পরলোকগমন করেছেন। সম্প্রতি তাঁর দেহে অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল।’

দ্য নিউজ ক্রনিকল একই দিন ‘এশিয়ার রাজকবি টেগোরের ৮০ বছর বয়সে মৃত্যু’ শিরোনামে বলা হয়, ‘ভারতীয় কবি স্যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতায় পরলোকগমন করেছেন। নতুন প্রজন্মের কাছে স্যার রবীন্দ্রনাথ একটি নাম মাত্র, কিন্তু ১৯১২ সালে সাহিত্যের আকাশে এই নাম আকস্মিক দীপ্তি নিয়ে উল্কার মতো আবির্র্ভূত হয়েছিল।...পঞ্চাশ বছর বয়সে কল্পনাসমৃৃদ্ধ মিস্টিক কবিতার ছোট একটি স্বকৃত অনুবাদ সংকলন সম্বল করে রবীন্দ্রনাথ ইউরোপ-আমেরিকা জয় করেছিলেন।’

দ্য টাইমস ‘স্যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : কলকাতার মৃত্যু’ শিরোনামে তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ করে। সংবাদে রবীন্দ্রনাথকে ‘মহৎ ভারতীয় কবি-ঔপন্যাসিক চিন্তাবিদ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্য টাইমসে আধুনিক ভারতে রবীন্দ্রনাথকে অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবেও বলা হয়েছে। ‘দ্য অবজার্ভার’ এ এডওয়ার্ড থমসনের লেখা প্রতিবেদনে রবীন্দ্রনাথকে উল্লেখ করা হয়েছে কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার, সমালোচক, সংস্কারক (নৈতিক-ধর্মীয়-সমাজিক-শিক্ষা বিষয়ক), চিত্রকর, খ্যাতনামা অভিনেতা, বিখ্যাত পত্রলেখক এবং আকর্ষণীয় আলাপচারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে।

দ্য টাইমস ১২ আগস্ট ১৯৪১ সালে সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে একটি চিঠি প্রকাশ করে। চিঠিটির লেখক মার্গারেট উডস নামের এক মহিলা। মার্গারেট উডস তার চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের যুদ্ধবিরোধী ভূমিকার জন্য তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ মার্গারেট উডসের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। সেটা ছিল ৯ জুলাই ১৯১৫ সালের কথা। সে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের কথা পরিষ্কার করেন।

একই পত্রিকা ১৯৪১ সালের অক্টোবর সংখ্যায় লন্ডনস্থ ‘ইন্ডিয়া সোসাইটি’ আয়োজিত স্মরণসভার একটি তাৎপর্যপূর্ণময় প্রতিবেদন প্রকাশ করে। স্মরণসভায় অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।

তবে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, লরেঞ্চ বিনিয়ন, উইলিয়াম রোদেনস্টাইন, এডওয়ার্ড থমসন, আর্নেস্ট রাইস, লর্ড লিটন প্রমুখ। আলোচকদের আলোচনায় কবির নানা অধ্যায়ের কথা উঠে আসে। রবীন্দ্র-চিত্রকলা নিয়েও আলোচকরা তাঁর চিত্রকলাকে মাইকেল এ্যাঞ্জেলো ও লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সঙ্গে তুলনা করেন।

কবির মৃত্যুর পর গান্ধী তাঁকে ‘যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি এবং জনজীবনের কল্যাণে অংশগ্রহণকারী প্রখর ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দার্শনিক রাধাকৃঞ্চনে ‘রবীন্দ্রনাথ আধুনিক ভারতীয় রেনেসাঁসের মহত্তম ব্যক্তিত্ব এবং সরোজিনী নাইডু ‘প্রতিভা, সৌন্দর্য, প্রজ্ঞা, কৌতুকপ্রিয়তার এক আশ্চর্য মিশ্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরেছেন।

কবির মৃত্যুর সময় জওহরলাল নেহরু জেলে ছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর ডায়েরিতে লেখেন, ‘গুরুদেব প্রয়াত। একটি যুগের অবসান ঘটল মনে হচ্ছে। অনেক দেখেছেন তিনি, আর ব্যথিত ও দুঃখিতই হয়েছেন। এক ঐশ্বর্যময়, পূর্ণাঙ্গ ও সৃষ্টিশীল জীবনযাপন শেষ হলো। দীর্ঘদিন বেঁচে অবক্ষয়ে শেষ হওয়ার চেয়ে এই যাওয়াটাই ভাল। আমার সৌভাগ্য যে, পৃথিবীর মহত্তম ব্যক্তিদের অন্যতম এ মানুষটির ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসতে পেরেছিলাম।’

কবির মৃত্যুকে ঘিরে সে সময় প্রায় সব পত্র-পত্রিকা গুরুত্ব সহকারে প্রতিবেদন, সম্পাদকীয়, শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রকাশ করে। ‘আজাদ,’ আনন্দবাজার, ‘যুগান্তর’ স্টেটসম্যানসহ বিভিন্ন পত্রিকা পাতার পর পাতা এ বিষয়ে মূল্যবান লেখা প্রকাশ করে।

আশি বছর। সময়ের হিসেবে হয়ত বেশ দীর্ঘ সময়। এই দীর্ঘ জীবনে কবি দেখেছেন যত বেশি তারও ঢের বেশি পেয়েছেনও। নিজের অনন্য গুণাবলিতে মানুষের কবিতে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। এবং এটাও বুঝে গিয়েছিলেন তিনি, ‘আমৃত্যু দুঃখের তপস্যা এ জীবন।’ মানুষের মধ্যেই তিনি সন্ধান করেছিলেন আনন্দের নিরন্তর ঝর্ণাধারা।