২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রবীন্দ্রগবেষক কাজুও আজুমা স্মরণে

  • প্রবীর বিকাশ সরকার

‘আবার যদি কোনদিন মানুষ হয়ে জন্মি, তাহলে যেন বাঙালী হয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারি’ এই ছিল তার শেষ কথা।

বলা যায় ২০০০ সাল থেকেই তার শারীরিক অবস্থা ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করতে থাকে। চোখের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে আসে। কিডনির অবস্থা খুবই খারাপ। এই বছরই রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘দেশিকোত্তম’ সম্মানে সম্মানিত হন। অসুস্থ শরীর নিয়ে ভারতে যান। কলকাতায় ঘটা করে তাকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। বিশ্বব্যাপী প্রচারিত সংবাদ আমার চোখেও পড়ে। জাপানে ফিরে এলে পরে স্যারকে ফোনে অভিনন্দন জানাই। বিনম্রকণ্ঠে জানান, এত বড় সম্মান আমায় দেয়া কি সাজে!

জাপানীরা বিনয় ও ভদ্রতার চূড়ান্ত। কিন্তু এই স্বীকৃতি থেকে তিনি অধিক মানসিক শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন। তারই প্রমাণ কলকাতার সল্টলেক সিটিতে প্রতিষ্ঠিত ‘ভারত-জাপান সংস্কৃতি কেন্দ্র : রবীন্দ্র-ওকাকুরা ভবন’। উদ্বোধন করেন জাপানের তৎকালীন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিনজোও আবে। বলাই বাহুল্য, তিনিও একেবারে অচল অবস্থায় সেই মহাঅনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন। ভারত ও জাপানের ইতিহাসে এটা অবিস্মরণীয় ঘটনা। আবার প্রায় একই সময়ে তিনি বাংলাদেশের সিলেটের বড়লেখা অঞ্চলে অনুরূপ একটি প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ-জাপান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। অর্থাৎ যেখানে রবীন্দ্রনাথ এবং বাঙালী আছে তিনি সেখানে আছেন। দুই বাংলাকেই আপন দুচোখের মতো আপন ভেবেছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের আনাচেকানাচে যেভাবে তিনি পদব্রজে রবীন্দ্রনাথ ও বাঙালিত্বকে আবিষ্কার করেছেন পূর্ববাংলায় তেমনটি না হলেও পাকিস্তান আমলেই বাংলাদেশের রবীন্দ্রভক্ত বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে গভীর ভাববিনিময় গড়ে উঠেছিল। অবর্তমান তাদের স্মৃতি নিয়েÑএক দশকেরও বেশি সময় তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় বেঁচেছিলেন।

২০১১ সালের ১৪ আগস্ট তার ৭৯তম জন্মদিন ছিল। দীর্ঘায়ু জাপানীদের একজন হিসেবে তার বয়স নির্ধারিত মাত্রায় এসে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু জন্মদিনের সূর্য দেখার আগেই তিনি ২৮ জুলাই সকালবেলা পরপারে যাত্রা করলেন। শোকাভিভূত আমাদের মুখে কোন জবাব ছিল না। এ বছর তার চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী।

অধ্যাপক আজুমার দীর্ঘ জীবনের অর্ধেকের বেশি কেটেছে রবীন্দ্রনাথ এবং বাঙালীকে নিয়েÑ এমনটি আর কাউকে এই জাপানে খুঁজে পাওয়া যাবে না। যে ধৈর্যশীলতা, কর্মযজ্ঞ এবং দূরদর্শী শিক্ষামূলক কাজের সাফল্য তিনি রেখে গেছেন তার তুলনা করা সত্যিই দুঃসাধ্য। একমাত্র জাপানী বলেই যে সম্ভব হয়েছে এটা আমাদের জন্য অনুকরণযোগ্য। বাঙালী হয়েও আমরা বাঙালী, বাঙালী সংস্কৃতি এবং রবীন্দ্রনাথকে যতখানি না বুঝতে পারি তার চেয়ে কয়েক গুণ তিনি অনুধাবন করেছেন নিরলস গবেষণা ও সাধনাবলে।

তিনি বহুশ্রুত নাম জাপানী রবীন্দ্রগবেষক অধ্যাপক ড. কাজুও আজুমা। ২০০৮ সালে জাপানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকে ভূষিত এই কর্মবীর মানুষটির রবীন্দ্ররচনার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে যখন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। যুদ্ধ শেষের প্রাক্কালে মার্চ মাসের ১০ তারিখে টোকিওর ওপর মার্কিনী বিমান হামলার মহাবোমা বর্ষণে রাতারাতি প্রায় এক লাখ লোক মারা যায়। ধূলিসাৎ হয়ে যায় রাজধানী টোকিওর অধিকাংশ। সেই সময় চতুর্দিকে ধ্বংসস্তূপ আর মৃতদেহ। আজুমা স্যার তখন থাকতেন টোকিওর এদোগাওয়া-ওয়ার্ডের উপশহর কোমাৎসুগাওয়াতেÑ নিজ বিদ্যালয়ের ২০০ ছাত্রছাত্রী নিহত হয়েছে। অগণিত মৃতদেহ সৎকার করতে গিয়ে নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েন। অভাব-অনটন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে সংসারে। সেই অবস্থায় অসুস্থ বালক কাজুও আজুমা রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ পাঠ করে নায়ক ‘অমলে’র সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে ফেলেন। এক এক করে ‘গীতাঞ্জলি’, ‘রক্তকরবী’ ইত্যাদি পড়ে গভীরভাবে রবীন্দ্রপ্রেমে নিমজ্জিত হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ১৯৫৯ এবং ১৯৬০ সালে যথাক্রমে ভারতীয় দর্শন এবং জার্মান ভাষা ও সাহিত্যে দুবার এমএ ডিগ্রী অর্জন করেন জাপানশ্রেষ্ঠ টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তারপর ওকোহামা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। এখানে কয়েক বছর অধ্যাপনাধীন থাকাবস্থায় একই সময়ে জার্মানি ও ভারত থেকে অধ্যাপনা করার জন্য আমন্ত্রণ আসে। তিনি জার্মানিতে গেলে পরে অধিক লাভবান হতেন ঠিকই কিন্তু একমাত্র গুরুদেবের টানে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে চলে যান ১৯৬৭ সালে। এর আগে জাপানেই তিনি অধ্যাপক ড. শোওকো ওয়াতানাবে এবং অধ্যাপক ড. ৎসুজি নাওশিরোর কাছে বাংলা ও সংস্কৃতভাষা শিক্ষালাভ করেন। নির্ধারিত সময়ের অধিককাল বিশ্বভারতীতে থাকার ফলে জাপানে ফিরে এসে চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন ১৯৭১ সালে। তিনি ও তার মহীয়সী স্ত্রী অধ্যাপিকা ড. কেইকো আজুমা যিনি নিজেও রবীন্দ্রঅন্তপ্রাণ এনএইচকে (ঘঐক) বেতারে খ-কালীন চাকরি করে কষ্টেসৃষ্টে সংসার চালান। জীবনে হেরে যাবার পাত্র ছিলেন না বিধায় ‘একলা চলোরে’ নামে একটি সংগঠনও দাঁড় করিয়েছিলেন আপন শহরে আজুমা স্যার। তারপর অধ্যাপনার চাকরি হয়েছে মর্যাদাসম্পন্ন ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে, এরপর জাতীয় শিক্ষালয় ৎসুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস প্রফেসর হয়েছেন। জীবনের শেষ দিকে এসে রেইতাকু বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করে অবসর নিয়েছেন। ১৯৭১ সালেই দাঁড় করিয়েছেন জাপান টেগোর সংস্থা (বর্তমানে জাপান-ভারত রবীন্দ্র সংস্থা)। চেয়ারম্যান ছিলেন আজীবন রবীন্দ্রভক্ত মাদাম ড. তোমি কোরা, প্রেসিডেন্ট ছিলেন রবীন্দ্র অনুরাগী অধ্যাপক ড. ৎসুশোও বিয়োদোও আর তিনি কর্মসচিব। কত কাজই না করেছে এই সংস্থাটি জাপানে, ভারতে ও বাংলাদেশে! বিশেষ করে জাপানে বাঙালী কাবাডি খেলাকে পরিচিত করা, এদেশে ঘটা করে রবীন্দ্র উৎসবের আয়োজন, জাপানি ভাষায় ১২ খ-ে সমগ্র রবীন্দ্ররচনার অনুবাদ প্রকাশ, শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের মননে লালিত স্বপ্ন : নিপ্পন ভবন প্রতিষ্ঠা, জাপান-ভারত সংস্কৃতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এর প্রতিটির পেছনে অধ্যাপক আজুমার অক্লান্ত পরিশ্রম, কর্মনিষ্ঠা আর অজস্র বাধাবিপত্তিকে ডিঙিয়ে যাওয়ার সাহসী কাহিনী খুব কম বাঙালীই জানেন। সেসব লবণাক্ত ঝড়ের অভিজ্ঞতা স্যার আমাকে নিভৃতে বহুদিন বলেছেন তার বাড়িতে। তার পরিবারের সঙ্গে আমার পরিবারের গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আমার জাপানী স্ত্রী বাংলা শিখেছেন তার স্ত্রীর কাছেই। আমার বাড়ি থেকে স্যারের বাড়ি সাইকেলে করে এক ঘণ্টার পথ। যখনই গিয়েছি দেখেছি নিবিষ্ট মনে তারা দু’জন কাজ করছেন রবীন্দ্রনাথ না হয় বাঙালী সংস্কৃতি নিয়ে। তার লিখিত গ্রন্থগুলোয় ধরা পড়েছে রবীন্দ্রনাথ ও বাঙালীর মনন।

যখনই বাংলাদেশ নিয়ে কথা উঠত তিনি জিজ্ঞেস করতেন, বঙ্গবন্ধুর মেয়েরা কেমন আছেন?

আমি বলতাম, স্যার, আপনি তো ভাল জানার কথা যেহেতু বঙ্গবন্ধুর আপনি একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার মেয়েরা কি আপনার খোঁজ-খবর নেন না?

স্যার হেসে বলতেন, সবাই তো খুব ব্যস্ত। তারাও ব্যস্ত আছেন ঘরে-বাইরে। আপনি তো জাপানে বঙ্গবন্ধু পরিষদ গঠন করেছেন তাই জিজ্ঞেস করছি।

আমি বললাম, বঙ্গবন্ধু পরিষদ রাজনৈতিক সংগঠন নয়। বঙ্গবন্ধু যা দিতে পারতেন জাতিকে তা শেখ হাসিনা দিতে চাইলেও তাকে সফল হতে দেবে না ঘরে-বাইরে এখনো সক্রিয় তার পিতার শত্রুরা বলে আমি বিশ্বাস করি। তবে তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন, যাবেনও। বর্তমান বাংলাদেশে প্রগতিশীল রাজনীতির শেষ ভরসা শেখ হাসিনা।

শুনে স্যার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ঠিকই বলেছেন। পিতৃহারা দুটো মেয়ের জন্য বড় কষ্ট হয় আমার। তার চেয়ে বড় কষ্ট অনুভব করি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য। কী অসাধারণ একটা মানুষ ছিলেন তিনি! তাকেও মিসগাইড করেছে অনেকে। মনে পড়ে তার ৭ মার্চের ভাষণ শুনে আমরা জাপানে উদ্বেলিত হয়ে পড়েছিলাম। শেখ মুজিবের দেশ মানেই গুরুদেবের দেশ। মনে হয়েছিল আমরাও স্বাধীনতাকামী বাঙালী জাতির সঙ্গে সংগ্রামে নামি। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা জাপানে জনমত গঠন করেছি, প্রচার করেছি, চাঁদা তুলেছি, পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থী শিবিরে সাহায্য পাঠিয়েছি। স্বাধীনতার পর পরই বাংলাদেশে গিয়ে স্তম্ভিত হয়েছি ধ্বংসস্তূপ দেখে! খুব শোকাহত হয়েছি আমার বন্ধু মুনীর চৌধুরীকে হত্যা করা হয়েছে জেনে। তার পর ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু জাপান সফরে এলে পরে তার দোভাষী এবং সর্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলাম আমি। আমরা এত বড় সম্মান রবীন্দ্রনাথের পর আর কাউকে দিইনি! তাকেই যখন মাত্র দু’বছর পরে ১৫ আগস্ট হত্যা করা হলো আমি বিশ্বাসই করতে পারলাম না! অবিশ্বাস্য! তার অপরাধ থাকতে পারে তার জন্য আইন-আদালত ছিলÑ বিচার হতে পারত কিন্তু সপরিবারে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা আমি কোনদিন মেনে নিতে পারি না। এজন্য আমি বাংলাদেশের লোক দেখলেই অভিযুক্ত করি : তোমরা প্রত্যেকেই অবিবেচক এবং বঙ্গবন্ধুর খুনি! মনে হয় ১৪ আগস্ট আমার জন্মদিন আর ১৫ আগস্ট আমার মৃত্যুদিবস!

এতেই বোঝা যায় কতখানি তিনি বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসতেন! আজুমা স্যার কোনদিন বাঙালীর দুর্নাম করেছেন এমনটি কেউ শোনেনি। তিনি বাঙালীকে অনেক ঊর্ধ্বে রেখেছেন। মত বিনিময়কালে তাকে আমি বলেছি : স্যার, আমার এটা বিশ্বাস যে, রবীন্দ্রনাথের মতো বঙ্গবন্ধুকেও বাঙালীরা কোনদিন বুঝতে পারেনিÑ যেমনভাবে বিদেশিরা বুঝতে পেরেছেন। এটা জাতি হিসেবে আমাদের অন্ধকার দিক স্বীকার না করে উপায় কী? বাঙালীর অনেক অসঙ্গতি, অনেক দীনতা আছে। যেমন ধরুন, আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি রবীন্দ্র পুরস্কার প্রচলন করতে পারিনি। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোকে সংরক্ষণ করি না। আলাদাভাবে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথকে পড়ানো বা গবেষণা হয় না। মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং পরে যে সকল বিদেশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে পারিনি।

অধিকাংশই এখন অবর্তমান। এসব অভিযোগ শুনে তিনি দুঃখ পেয়েছেন। বললেন, এসব আমি জানি। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে এসব হয়ে যেত। এটা দুর্ভাগ্য। তবুও আমি বলব, বাঙালী একদিন রবীন্দ্রনাথকে, বঙ্গবন্ধুকে চিনতে, বুঝতে পারবে। সেদিন বদলে যাবে বাঙালী। আমি হয়ত দেখে যেতে পারব না, ভবিষ্যত বাঙালীরা পাবে সেটাই আনন্দের, সেটাই আশার কথা।

হ্যাঁ, এটাই আমাদের জন্য আনন্দের এবং আশাব্যঞ্জক যে শত সমস্যা-সঙ্কট, রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক অসঙ্গতির মধ্যেই আলোর পথ দেখাবে চিরকালের আলোর দিশারী রবীন্দ্র গবেষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বন্ধু কাজুও আজুমার অনন্য কীর্তিগুলো।