১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বড় পাখিদের সেকাল ও একাল

  • শরীফ খান

(ঈদ আনন্দ সংখ্যার পর)

শামুকভাঙ্গা : লম্বা শক্ত-মোটা ঠোঁটের মাঝখানটায় সাঁড়াশির মত ফাঁক একটু- ছোট বড় শামুক ওই সাঁড়াশির ফাঁকে ফেলে সুকৌশলে দু-একটি চাপ দিলেই বাইরে পড়ে যায়। শামুকের মাংস গেটে চালান হয়ে যায়- এই কারণেই পাখিটির নাম শামুকভাঙ্গা। আকারে-গড়নে ও চলনে এরা অনেকটাই জাতভাই মানিকজোড়- সাদা মানিকজোড়ের মতো। সাদা মানিকজোড়ের মতো এদেরও মাথা-গলা-বুক ও পিঠের উপরিভাগ সাদা-তবে, সাদাটা ধূসরের সাথে মাখামাখি, পা গোলাপী, ঠোঁট ধূসর রঙ-লালচে। ঝাঁকে চলে এরা- হতে পারে ২০-১০০০ টা পর্যন্ত। এদের স্বভাবের অনিবার্য বৈশিষ্ট্য আছে যা আমি বিস্তারিতভাবে বলেছি (বাংলাদেশের পাখি/দিব্য প্রকাশ) আমার বইতে। গত ২০১৪ সালে বৃহত্তর সিলেটের হাকালুকি হাওরে এক ঝাঁকে প্রায় ১০০০টি পাখি দেখেছিলাম। এর চেয়েও অনেক বড় ঝাঁক আমি বাল্য-কৈশোর-তারুণ্যে-এমনকী ১৯৮৭ সালেও দেখেছি উত্তরের হাওরে ও আমাদের এলাকার গ্রামের গাছে। চারণক্ষেত্রে চরছে। হয়তবা নামল বৃষ্টি অথবা ঝড়- উড়বে না ওরা। সৈনিকদের মতো একের পেছনে একে- অনেকটাই এভাবে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে থাকবে চুপচাপ। হাকালুকিতেও সেটা দেখলাম।

৫০ বছর আগে বৃহত্তর খুলনা অঞ্চল তো বটেই সারাদেশেই ছিল এরা- ছিল আবাসিক। মাঝখানে উধাও হয়ে গিয়েছিল। ফিরেছে আবার। আবারো আবাসিক। ঢাকার উপকণ্ঠ সাভার-কালীগঞ্জ-ডেমরা এলাকাতে আমি এ বছরও (২০১৫) দেখেছি ৪-১০টি করে। রাজধানী ঢাকার আকাশও পাড়ি দিতে দেখেছি।

মূল খাদ্য এদের শামুক। পোকা-পতঙ্গ মাছও খায়। চারণক্ষেত্র হদ্দে বিল-ঝিল-হাওর-বাঁওড় ধানের মাঠ ও কম পানির জলাশয়।

শামুক ভাঙ্গার ইংরেজী নাম অংরধহ ড়ঢ়বহনরষষ বৈজ্ঞানিক নাম অহধংঃড়সঁং ড়ংপরঃধহং মাপ সর্বোচ্চ ৮১ সেমি। উচ্চতা ৭৬ সেমি।

স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে বন্দুকের গুলিতে মারা যায় মোট ৬৪টি। খেপজালে এক ঝড়ের রাতে পাকড়াও করেছিলাম আমরা কজন-মোট ১৯টি জ্যান্ত পাখি। সেকাল তো বটেই- একালেও গাছ-মাঠ কোথাও দেখা দিলে শিকারিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়।

রঙ্গিলা বক : ৫০ বছর আগেও দেশের সর্বত্র দু’একটি পাখির দেখা মিলত। মাঝখানে বিলুপ্তির ঠিকানায় চলে গিয়েছিল। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ড. আ.ন.ম অমিনুর রহমান ও আমি গিয়েছিলাম হাকালুকি হাওরে। করচ গাছের মাথায় চড়ে বাইনেকুলোরে আমি পাখি দেখছিলাম- কিন্তু আমার নজরে পড়ল না একজোড়া অমন সুন্দর আর বড় সড় পাখি! আমীন ছবি তোলে, চোখ ভরে দেখে। মাথা লাল। ঠোঁট হলুদাভ। গলা-পিঠ-গলার প্রান্ত সাদা। বুক সাদা, তবে কালো কালো ছিট ছোপ আছে। চিহ্নিত ডানা, সাদা-কালোর সরু সরু রেখাÑ যেমন শিল্পীর কারুকাজ। লেজ গোলাপী-সাদাটে। পা লাল।

মূল খাদ্য এদের পোকা-পতঙ্গ-চোট সাপ-ব্যাঙ-কেঁচো-ইঁদুর। সুযোগ পেলে ছোট পাখি খায়।

রঙ্গিলা বকও ফকিরহাটে রামশালিক নামে পরিচিত ছিল। পরম্পরায় নাম বহাল থাকতোÑ যদি না পাখিটাকে দেখা যেত নিয়মিত। বর্তমান প্রজন্মের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে স্থানীয় নামগুলোÑ সারাদেশের ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য। আসল নামও তো জানে না শতকরা ৯৮ জন। পাখি হারাবে। নাম হারাবে। তার সঙ্গে হারাবে আরো অনেক কিছু। যা হবে আমাদের জন্য চরম ক্ষতিকর।

রঙ্গিলা বকের ইংরেজী নাম চধরহঃবফ ঝঃড়ৎশ বৈজ্ঞানিক নাম গুপঃবৎরধ খবঁপড়পবঢ়যধষধ মাপ সর্বোচ্চ ১০০ সেমি। উচ্চতা ৯৩ সেমি।

বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত শিকার করা হয় মোট ০৫টি।

সারস পাখি : মাথা-ঘাড়-গলা আলতা লাল, পালক নয়- মখমলের মতো চামড়া ওঠা। গলার কিছুটা সাদা, কানে এক চিলতে সাদা রঙ, গলা-পিঠ-বুক ঘন ধূসর, পা লাল। ঠোঁট সবুজাভ, লেজের প্রান্তের কাশফুল পালকগুলো নিচের দিকে ঝুলানো।

এরা ৫০ বছর আগেও দেশের বড় বড় হাওর-বাঁওড়ে, বিলে-ঝিলে ও নিরিবিলি জলাভূমিতে আসত পরিযায়ী হয়ে। তবে, সংখ্যায় কম। উত্তরের হাওরেও দেখা মিলতো ক্বচিৎ- বৃহত্তর খুলনা ও বরিশালে দেখা মিলত। এখন দেখা মেলে না। এরা শুকনো ভূমিতেও চরত। ‘সারস নৃত্য’ একটা বিখ্যাত নৃত্যকলা। মুখোমুখি হয়ে দুটিতে ছন্দে ছন্দেÑ লাফিয়ে লাফিয়ে নিচে পাখা থাকে মেলাÑ কখনো বা মনে হয় ব্যালে নাচ। লেজের ঝালরও নাচে তালে তালে। নৃত্য চলে কিছুটা শূন্যে উঠেও। এদের নাচের ফরম অনুকরণ করে পৃথিবীর কোনো কোনো আদিবাসীরা নাচে। নাচের সঙ্গে ঠোঁট-মুখে বাজনাও বাজায়। খাদ্য তালিকায় আছে শস্যবীজ, কচি ডগা-পাতা ও অন্যান্য। বাগেরহাটে এটি লাল মানিকজোড় নামে পরিচিত ছিল। আমি উত্তরের হাওরের গভীরে ১৯৬৭ সালে দেখেছিলাম ১১টি, ১৯৮০ সালে ০৭টি, ১৯৮৮ সালে ০৪টি। পরে আর দেখিনি। না দেখারই কথাÑ ওই যে বন্দুকের তাড়া!

লীলমাথা সারস নামেও পরিচিত এরা। ইংরেজী নাম ংধৎঁং পৎধহব বৈজ্ঞানিক নাম এৎঁং ধহঃরমড়হব মাপ ১৫৬ সেমি। উচ্চতাও একই। বৃহত্তর খুলনা জেলায় স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত মোট ১৩টি পাখি শিকার করা হয়।

ধূসর সারস ঃ মাথার তালু কালো। চিবুক গলা কুচকুচে কালো, গলা কালোÑ সেই কালো বুকের উপরে অল্প ঝুলে থাকায় মনে হয় কালো দাড়ি। চোখের উপরের পালক সাদা, ঘাড়ের উপরিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত। বুক-ডানাা-পেট-পিঠ ঘন ধূসর-ছাই। পা কালো। লেজের আগা কালো। ঠোঁট সাদাটে সবুজ।

হাওরাঞ্চলে দেখা যেত ৫০ বছর আগেও, এখন অতি বিরল। শুকনোতে চরতে ভালবাসত। খাদ্য লাল মাথা সারসের মতোই। বছর দু-তিন আগে একটি পাখি শিকার করেছিলেন একজন শিকারি-সিলেটের একটা হাওর থেকে। বনবিভাগ পাখিসহ শিকারিকে গ্রেফতার করেছিল।

এটির ইংরেজী নাম উবসড়রংবষষব পৎধহব বৈজ্ঞানিক নাম এৎঁং ঠরৎমড় মাপ ৯০-১০০ সেমি। উচ্চতা ৭৬ সেমি।

খুলনা অঞ্চলে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত শিকার করা হয় ০৪টি পাখি। ঢাকা চিড়িয়াখানায় ১৯৭৪ সালে আমি একটি পাখি দেখি। ওটি উত্তরবঙ্গের কোথাও ধরা পড়েছিল। জানা যায়, ১০০-১৫০ বছর আগে এটি আমাদের আবাসিক পাখি ছিল। এখনতো পরিযায়ী হয়েও আসে না। অথচ, ফকিরহাটের ‘জোড়ার বিলে’ (বিলটি এখন বিলীন) আমি একবার বহু কষ্ট করেছিলাম একটি পাখিকে মারতে, না, গুলীতে পড়েনি ওটা। ১৯৬২ সালে একটা সদ্য উড়তে শেখা বাচ্চাকে আমি বন্দী অবস্থায় দেখেছিলাম সাতক্ষীরার একটি গ্রাম্য পথে। উত্তরের হাওর থেকে মেরেছিলামও একটি।

গগনবেড় ঃ বুক-পেট-মাথা-গলা সাদা। পিঠও সাদা, তবে তার উপরে হালকা গোলাপী আভা। ডানার প্রান্তের পালক কালো। মাথায় সামান্য ঝুঁটি মতো থাকে। পা গোলাপী। বিশাল গলার বিশালদেহী পাখি এরা। জলে ভাসা অবস্থায় বড়সড় সাদা রাজহাঁসের মতো দেখায়Ñ ঠোঁটের গড়ন-ধরন অবশ্য অন্যরকম। গলার নিচ থেকে ঠোঁটের প্রায় আগা পর্যন্ত হলুদা-কমলা রঙ্গের গলথলি আছেÑ ঠোঁট ফাঁক করে ওরা যেন ছাঁকনি জাল ঠেলে সামনের দিকেÑ মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী ওই ছাঁকনি জালে আটকা পড়ে। জেলেপাখিও বলা যায়। এদের চমৎকার লম্বা ঠোঁটটির রঙ কালচে। দু’পাঁচটি পাখি পাশাপাশি থেকে দ্রুত সামনের দিকে এগোয় মাছদের ধাওয়া দিতে দিতে গলথলির প্রশস্ত ছাঁকনি জালে আটকা পড়ার পরে ঠোঁট আকাশমুখো করে মাছ পেটে পোরেÑসে বড় সুন্দর দৃশ্য। ঢাকা চিড়িয়াখানায় এক সময় ৩/৪টি পাখি ছিল। ১৯৯৮ সালে দিনাজপুরে একটি পাখি ধরা পড়েছিল।

৫০ বছর আগেও কচিৎ দু-একটা পাখিকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যেত। এখন খবর নেই। অথচ, সুন্দরবনাঞ্চলে ছিল, উত্তরের হাওরে দেখেছি ২/১টা বাল্য-কৈশোরে। বাগেরহাট এলাকার বিলেও দেখেছি। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত শিকার হয়েছে মোট ১৩টি পাখি।

গগনবেড়ের ইংরেজী নাম এৎবধঃ যিরঃব ঢ়বষবপধহ বৈজ্ঞানিক নাম চবষবপধহঁং ড়হড়পৎড়ঃধষঁং সর্বোচ্চ মাপ ১৮০ সেমি।

চিতিঠোঁট গগনবেড় ঃ সাদা গগনবেড়ের মতো এরাও ছিল পরিযায়ী প্রজাতি। বিরল ছিল বটে, তবে প্রতিবছরই ২/১টি পাখির দেখা মিলত খুলনা-বরিশাল অঞ্চলে। দেশের বড় বড় হাওরেও দেখা যেত। ১৯৮৯-৯০ তে ঢাকা চিড়িয়াখানায় দুটি পাখি ছিল। এক নজরে সাদা রঙের পাখি। ডানার প্রান্তের পালক কালো। ঘাড়-মাথা কালচে-ধূসর। ঠোঁট গোলাপী , গলথলি বা ছাঁকনি জাল হলুদাভ-গোলাপী। ঠোঁট-মাথায় ও ঘাড়ে অসংখ্য কালচে ছিট আছে। ছিট আছে গলথলিতেও। এদেরও খাবার মূলত মাছÑ মাছ ধরার কৌশলও সাদা গগনবেড়ের মতো। পা এদের- কালচে সবুজ। ৫০ বছর আগেও কচিৎ দেশের এখানে ওখানে ২/৪টার দেখা মিলত। এখন উধাও ।

এটির ইংরেজী নাম ঝঢ়ড়ঃ-ইরষষবফ চবহরপধহ বৈজ্ঞানিক নাম চবষবপধহঁং চযরষরঢ়ঢ়বহংরং সর্বোচ্চ মাপ ১৫২ সেমি। স্বাধীনতার আগে বাগেরহাট অঞ্চলে মোট ০১টি পাখি শিকার করা হয়। ৯০ দশকে সিলেটে মারা পড়ে ০১টি পাখি।

ধূসর রাজহাঁস ঃ দেখতে আমাদের পোষা রাজহাঁসের মতই। আকার-গড়ন-চলাফেরার ধরন ও কণ্ঠস্বর প্রায় একই রকম। পরিযায়ী বুনোহাঁস। ৫০ বছর আগে দেশের হাওর-বাঁওড়-মোহনা-দ্বীপ-চর-বিল-ঝিলে যথেষ্ট আসত। এখন সংখ্যা কমে গেছে অনেক। এরা জলের পাখিদের প্রহরী। বিপদ সংকেত দেয়- অথবা উড়াল দেয় ডাকতে ডাকতে।Ñ ডাকেও থাকে সতর্কবার্তা। শিকারি বন্দুক নিয়ে এগোতে থাকলে বা ফটোশিল্পী ছবি তুলতে এগোলে জলের অন্য পাখিরা রাজহাঁস আর শিকারিÑফটোশিল্পীদের ফলো করে। রাজহাঁসকে সামনে রেখে বসে ওরা। এই রাজহাঁসদেরও আছে কয়েকটি বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। উৎসাহী পাঠকেরা ইচ্ছে করলে আমার লেখা ‘বাংলাদেশের বুনোহাঁস’ বইটি (দিব্যপ্রকাশ/২০১৩) পড়তে পারেন। বাংলাদেশের সব ধরনের বুনোহাঁস নিয়ে বিস্তারিত আছে বইটিতে। এক নজরে চিত্রিত বাদামি রঙের হাঁস। লেজের তলা সাদা। পা-ঠোঁট গোলাপী। ধারণা করা হয় আমাদের সব পোষা রাজহাঁসের আদি পুরুষ এরা।

এদের মূল খাদ্য মাছ-কচিশাকের ডগা-ঘাস-কচিপাতা-শস্যবীজ।

ইংরেজী নাম এৎবুষধম এড়ড়ংব বৈজ্ঞানিক নাম অহংবৎ ধহংবৎ মাপ ৯০ সেমি।

স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত খুলনা অঞ্চলে শিকার হয়েছিল মোট ০৭টি।

রাজহাঁস ৫০ বছর আগে যথেষ্ট দেখা মিলত। এখন সংখ্যায় কমে গেছে। চর-দ্বীপ-মোহনা-হাওর-বাঁওড়-বিলে দেখা যেত। শীতের পরিযায়ী এরা। মাপ সর্বোচ্চ ৭৬ সেমি। সুদর্শন এক বুনোহাঁস এরা। ফকিরহাটে পরিচয় রাজহংসী। ধূসর, গাদা, কালো- এই তিনের মিশ্রণ এদের শরীরের। পা-ঠোঁট হলুদ। সাদা মাথার উপরে চোখ বরাবর চওড়া কালো টান একটা আড়াআড়িভাবে। তার অল্প নিচেই একই রকম কালো টান আরেকটা। এই দুটো কালো টান পাখিটির সৌন্দর্য্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে। খাদ্য ধূসর রাজহাঁসদের মতোই। ইংরেজী নাম ইধৎ-যবধফবফ এড়ড়ংব বৈজ্ঞানিক নাম ইৎধহঃধ ৎঁভরপড়ষষরং মান ধূসর রাজহাঁসের মতই। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত খুলনা অঞ্চলে শিকার করা হয় মোট ০৮টি। এটি হলো গুলির শিকার। বড় বড় উড়োফাঁদ ও অন্যান্য ফাঁদ পেতে- বিশেষ করে উত্তরের হাওরে কত প্রজাতির কত শত বুনোহাঁস যে ধরা হয়েছে তার কোনো হিসাব আমার কাছে নেই। পাখি ধরার বিভিন্ন ফাঁদের বিস্তারিত বর্ণনাও আছে ‘বাংলাদেশের বুনোহাঁস’বইটিতে।

বিশেষ কথা ঃ যে কটা পাখির কথা বলেছি আমি ইতোমধ্যে, সেগুলো বড় পাখি, চরে খোলা জায়গায়, নজরে পড়ে সহজে। এদের কমে যাওয়ার মূল কারণ-শিকার। এছাড়াও গেল ৫০ বছরে যে সব পাখি আমাদের দেশ থেকে নেই হয়ে গেল- সেগুলো কিন্তু খাওয়ার জন্য কেউ শিকার করেনি- শকুনদেরও কোনো কারণেই গুলী করা হতো না। সে শকুনেরা কেন কমে গেল? পলাশ ঈগল- মেছো ঈগলেরাসহ অন্যান্য মাছ শিকারি বড় পাখিদের সংখ্যা কেন কমল? রাজকীয় রাজশকুন/ মোরগশকুন (জবফ-যবধফবফ ঠঁষঃঁৎব) কেন নেই হয়ে গেল! হায়রে রাজশকুন! তোকে নিয়ে কত কিংবদন্তি, কত গল্পগাঁথা! এখন আমাদের দেশের যারা ৫০-৬০ বছরের কোটায় আছেন- সেই সব মানুষের ভেতর রাজশকুন দেখেননি, এমন মানুষ সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে কী?

ছিল। নেই। বংশ পরম্পরায় সবাই দেখত, চিনতো, পাখিটিকে-কিন্তু, রাজশকুন দেখা মানুষগুলো যখন থাকবে না তখন সাধারণ মানুষও ভুলে যাবে পাখিটার কথা। কেন এমন হয়? আমি দেখলাম, আমার ছেলেরা দেখেনি। আমার নাতি-নাতনী তো নামও জানবে না!

মাছ শিকারি বড় পাখিদের মারা হয় মাছ খাবার অপরাধে (?), অথচ, ওদের সবকিছু দখল করেই তো আমরা আজ মাছ চাষে বিপ্লব ঘটিয়েছি। ওদের হিস্যা কই? এছাড়া পাহাড়ী বনের বিশাল পাখি রাজধনেশ (এৎধঃ ঐড়ৎহনরষষ), ময়ূর (ওহফরধহ চবধভড়ষি), নাকতা হাঁস (ঈড়সন উঁপশ), বাঁদিহাঁস (ডযরষব-ডরহমবফ উঁপশ), কাস্তেচরা (ইষধপশ-যবধফবফ রনরং) ও অন্যান্য বড় পাখিদের দুর্দশার কারণ কী?

শেষ কথা ঃ ছোট বড় সব ধরনের পাখি সরকারী আইনে ধরা-মারা-পোষা দ-নীয় অপরাধ। এই দ-টিকে শক্ত করা দরকার। সবার আগে দরকার সাধারণ মানুষের সচেতনতা। এই জিনিসটি আমাদের ভেতর নেই। নেই বলেই পাখিদের আজ এই দুর্দশা। ছোট ও মাঝারি পাখিরাও কী খুব ভাল আছে? (শেষ)