২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একই ছাদের নিচে, তবু এখনও দেখা হয়নি মা-মেয়ের

  • সেই শিশুটিকে বুকের দুধ খাওয়াতে ঢাকা মেডিক্যালে ছুটে আসেন অনেক মা

শর্মী চক্রবর্তী ॥ একই হাসপাতালে, একই ছাদের নিচে তবু দেখা হয়নি মা-মেয়ের। আলাদা আলাদা ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলছে তাদের। নবজাতক বিভাগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) কক্ষের বিছানায় প্রায় অচেতন পড়ে আছে শিশুটি। পাশের ওয়ার্ডে গাইনী বিভাগে তার গর্ভধারিণী মা নাজমা বেগম। জন্মের নয়দিন পেরিয়ে গেলেও মায়ের বুকের দুধ পান করতে পারেনি শিশুটি। শিশুটির শরীরে শুধু চলছে স্যালাইন। মায়ের বুকের দুধ পান করলে শিশুটি বেঁচে থাকার শক্তি পাবে আশা করছিলেন চিকিৎসকরা। তাই নাড়িছেঁড়া ধনের সুস্থতার জন্য গুরুতর আহত অবস্থার মাগুরা থেকে ঢাকা ছুটে আসেন মা। এতদূরের পথ পেরিয়ে এসে এখনও মেয়ের মুখ দেখতে পারেননি। নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। উঠে বসতে পারছেন না। তিনি নিজেই এখন ঢাকা মেডিক্যালের গাইনি বিভাগে চিকিৎসাধীন।

গাইনি ওয়ার্ডে থাকা মা বেডে শুয়ে মেয়েকে দেখার জন্য ছটফট করছেন। প্রিয় সন্তানকে দেখতে, কোলে তুলে আদর করতে এই মা বৃহস্পতিবার এ্যাম্বুলেন্সে চেপে এসেছেন মাগুরা থেকে। বৃহস্পতিবার রাত ৮টা ৫ মিনিটের দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান গুলিবিদ্ধ শিশুর মা নাজমা বেগম ও বাবা বাচ্চু ভূঁইয়া। হাসপাতালে পৌঁছেই তারা তাদের সন্তানকে দেখতে চান। কিন্তু দায়িত্বরত চিকিৎসক শিশুটিকে তখনই তাদের দেখার অনুমতি দেননি। রাত ৯টার দিকে কেবল বাবাকে আইসিইউতে ঢুকতে দেয়া হয়। চিকিৎসকরা জানান, মাগুরা থেকে ঢাকা পর্যন্ত লম্বা রাস্তা পাড়ি দেয়ার ধকল সামলাতে পারেননি নাজমা বেগম। তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে তখন তাকে গাইনি বিভাগে ভর্তি করা হয়।

শ্ক্রুবার সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় শিশুটির বাবা বাচ্চু ভূঁইয়া হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় ২১১-২১২ ওয়ার্ডের সামনে ছোটাছুটি করছেন। হাতে প্রেসক্রিপশন। তার চোখেমুখে চিন্তার ছাপ দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট। স্ত্রী-সন্তানের এমন অবস্থায় হতবাক তিনি। কি করবেন কোথায় যাবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। সন্তানের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাতে হাসপাতালে আসার পর একবার মেয়েটাকে দেখছিলাম। কথাটা বলতে বলতে সেই বাবার চোখে অশ্রু ঝরে পড়ে। মেয়েটা আমার বেডে ঘুমিয়ে আছে শরীরে স্যালাইন লাগানো। এখনও মুখে কিছু খেতে পারছে না। তবে চিকিৎসকরা বলেছেন, এখন তাকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো হতে পারে। তবে তা কখন হবে তা সঠিক করে বলেননি। মেয়েকে এমন অবস্থায় দেখে তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না। বার বার একই কথা বলছিলেন, এই অবুঝ শিশুর তো কোন অন্যায় ছিল না তবে কেন তারা এভাবে আমার সন্তানকে আহত করল। আমি তাদের ফাঁসি চাই। আর কোন বাবার যেন এমন দিন না দেখতে হয় সেজন্য ওই আসামিদের শাস্তি দেয়া দরকার। তিনি আরও জানান, এই ঘটনার পরও থেমে নেই ওই সন্ত্রাসীরা। তারা এখন আমাকে ফোনে হুমকি দেয়। বলে দুইডারে মারছি, এখন বেশি বারাবারি করলে আরও দুইডারে মারমু। এসব কথা বলার পর তিনি স্ত্রী ও সন্তানের জন্য সকলের কাছে দোয়া চান। তারা যেন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারে।

অন্যদিকে গুলিবিদ্ধ শিশুটিকে মায়ের বুকের দুধ খুব দরকার এমন সংবাদ পেয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আসেন অনেক মা। তারা সবাই শিশুটিকে দুধ খাওয়াতে আসেন। এই দৃশ্য দেখে বোঝা যায় গুলিবিদ্ধ এই শিশুটির সুস্থতার চিন্তা শুধু তার বাবা-মা ও স্বজনের নয়, গোটা দেশ এখন এই শিশুটির সুস্থতার চিন্তা করছে।

শুক্রবার সকালে মা ও মেয়েকে দেখতে আসেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান। তিনি তখন জানান, মায়ের গর্ভে গুলিবিদ্ধ শিশুর চিকিৎসায় চার সদস্যের রিভিউ বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এ বিভাগের প্রধান নবজাতক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আবিদ হুসেন মোল্লা এবং বাকি তিনজন ঢাকা মেডিক্যালেরই শিশু বিশেষজ্ঞ। অন্যদিকে পূর্বের গঠিত আট সদস্যের বোর্ডও শিশুর চিকিৎসায় নিয়োজিত থাকবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, মায়ের অবস্থা এখন আগের থেকে ভাল। আর শিশুটি আগের থেকে একটু ভাল থাকলেও সে এখনও শঙ্কামুক্ত নয়। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অসময়ে জন্ম নেয়া। তবে তার জন্ডিস ও জ্বর এখন কিছুটা কমেছে বলে জানান তিনি। মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো হয়নি। তবে এখন তাকে দুধ দেয়া হতে পারে।

বৃহস্পতিবার মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ ছোট্ট শিশুটির শারীরিক অবস্থা একটু অবনতি হওয়ায় তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। শিশুটির জ্বর ও জন্ডিস ছিল। স্বাভাবিক নবজাতক শিশুর ওজনের চেয়ে তার ওজন প্রায় অর্ধেক।

উল্লেখ্য, ২৩ জুলাই বৃহস্পতিবার মাগুরা শহরের দোয়াপাড়ায় দলীয় আধিপত্য নিয়ে স্থানীয় যুবলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত স্থানীয় যুবলীগ নেতা আলী হোসেনের গ্রুপ দরিদ্র বাচ্চু ভূঁইয়ার বাড়িতে ত্রাস সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে।

ওই সময় বাচ্চু ভূঁইয়ার সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নাজমা বেগমের পেটে গুলি লাগে। সেই গুলি গর্ভে থাকা শিশুর শরীরেও লাগে। পরে মাগুরা সদর হাসপাতালে জরুরী অস্ত্রোপচারে কন্যাসন্তান জন্ম দেন গুলিবিদ্ধ নাজমা। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর দেখা যায়, নবজাতকও মায়ের গর্ভে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পরে ভোররাতের দিকে গুলিবিদ্ধ শিশুটিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।