২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বার্গম্যানের গুণকীর্তনে মেতেছে শিবিরের বাঁশের কেল্লা

  • আদালতে বার বার সতর্কতার পরেও ফেসবুকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন তিনি ;###;সাকার পক্ষে সাফাই গাইতে ফের প্রশ্ন তুলেছেন ট্রাইব্যুনাল ও উচ্চ আদালত নিয়ে

বিভাষ বাড়ৈ ॥ আদালতের বারবার সতর্কতার পরেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েই যাচ্ছেন ব্রিটিশ নাগরিক বিতর্কিত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। মহান মুক্তিযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, বীর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে উস্কানিমূলক ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পর এবার একাত্তরের ঘাতক ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর (সাকাচৌ) পক্ষে দালালি শুরু করেছেন কথিত ওই সাংবাদিক। সাকার পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ট্রাইব্যুনাল ও উচ্চ আদালতের বিচার নিয়েও। শুক্রবার দুপুরে নিজের ফেসবুক পেজে বার্গম্যান স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন, ‘সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগবঞ্চিত করে জুডিশিয়াল কিলিংকে সমর্থন করা যায় না।’ এদিকে সাকার পক্ষে বার্গম্যানের তোলা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ফলাও করে প্রচার করছে জামায়াত-শিবিরের ফেসবুক পেজ বাঁশের কেল্লা।

‘সাকা চৌধুরীর মামলা নিয়ে ডেভিড বার্গম্যানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন’ শিরোনামে প্রচারণা চলছে শিবিরের বাঁশের কেল্লায়। বার্গম্যানের ছবিসহ গুণকীর্তনও চলছে সেখানে। বার্গম্যান তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে সাকার বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলে লিখেছেনÑ কেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ২৯ মার্চ করাচী যাত্রা এবং সেখানে অবস্থানের পক্ষে দেয়া তার প্রমাণকে আমলে নেয়া হয়নি? কেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে মাত্র ৫ জনের বেশি সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপনের সুযোগ দেয়া হয়নি? সাকা একাত্তরের পাকিস্তানে ছিলেন বলেই মনে করেন বার্গম্যান। নিজের অবস্থান অনেকটা পরিষ্কার করেই তিনি বলেন, আদালতে সাক্ষী উপস্থাপনের সুযোগ না পাওয়ায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবীরা ছয়জন সাক্ষীর এফিডেভিট আদালতে উপস্থাপন করেছিলেন।

যারা নিশ্চিত করেছেন যে, যুদ্ধ চলাকালীন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন। সেই এফিডেভিটগুলোকে ট্রাইব্যুনাল খারিজ করে দেয়নি, কিন্তু যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি এই অজুহাতে সেগুলো আমলে নেয়নি। কেন? বার্গম্যান রীতিমতো বিচার নিয়ে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে বলেছেন, ‘সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী দোষী হলে অবশ্যই তাকে শাস্তি দিতে হবে, কিন্তু তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগবঞ্চিত করে জুডিশিয়াল কিলিংকে সমর্থন করা যায় না।’

একাত্তরের ঘাতকদের পক্ষে বার্গম্যানের দালালির চিত্র এটাই প্রথম নয়। বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একাত্তরে মানবতাবিরোধীদের বিচারে স্বচ্ছতার পরিচয় দিয়ে চললেও বিচারকে বিতর্কিত করতে এই ব্যক্তি শুরু থেকেই অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। আইনী প্রক্রিয়ার সকল পর্যায়ে অংশ নিলেও নেতারা দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও তথ্য ছড়িয়ে সঙ্কট তৈরির জন্য জামায়াত ও তাদের মদদপুষ্টদের সঙ্গে সব সময়েই তৎপর তিনি। আদালতের বারবার সতর্কতার পরেও বিচার নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েই যাচ্ছেন বিতর্কিত এই সাংবাদিক। মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি হওয়া জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের আপীলের চূড়ান্ত রায় হওয়ার পর এ নিয়ে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরা একটি অনুষ্ঠান প্রচার করেছিল। সেখানেও নিজের চেহারা প্রকাশ করেন তিনি। ইনসাইড স্টোরি নামে ওই অনুষ্ঠানে ঢাকা থেকে স্কাইপে যোগ দেনÑ সংবাদমাধ্যম নিউ এজের প্রতিবেদক ডেভিড বার্গম্যান, জামায়াতে ইসলামীর আন্তর্জাতিক লবিস্ট টবি ক্যাডম্যান এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। আলোচনার একপর্যায়ে ডেভিড বার্গম্যান বলেন, বাংলাদেশের কোন আদালত আন্তর্জাতিক মানের নয়, বাংলাদেশে এমন কোন বিচার নেই যা নিয়ে বিতর্ক নেই। যুদ্ধাপরাধ বিচারও প্রশ্নের উর্ধে নয়। রীতিমতো জামায়াতের ভাষায় তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য আসলে স্পষ্ট নয়। তারা ২০০৯ সালে এসে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করেছে। অথচ এর আগেও তারা ক্ষমতায় ছিল, কিন্তু তখন এ ধরনের উদ্যোগ নেয়নি।

এখানেই শেষ নয়, বার্গম্যান কিছুদিন আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে মার্কিন দূত স্টিফেন র‌্যাপের দেয়া বক্তব্য বিকৃত করে নিজের ব্লগে পোস্ট করেছিলেন। র‌্যাপ বাংলাদেশে এসে ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে যেখানে বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন, সেখানে বার্গম্যান র‌্যাপের বরাত দিয়ে উল্টো তথ্য প্রচার করেছেন। বার্গম্যান বোঝাতে চেয়েছেন মার্কিন দূত বিচারকে অস্বচ্ছ বলেছেন।

যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের আপীলের রায় দেয়ার সময় আদালতে মোবাইল ব্যবহারের অভিযোগে এজলাস থেকে বার্গম্যানকে বের করে দিয়েছিলেন বিচারক। কামারুজ্জামানের রায় পড়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বার্গম্যান আদালত কক্ষেই মোবাইল ফোনে কথা বলতে শুরু করায় বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী তাকে দাঁড়াতে বলেন। বিচারপতি তাকে উদ্দেশ করে বলেন, আদালত কক্ষে মোবাইল ফোন নিয়ে ঢোকাই নিষিদ্ধ। আপনি মোবাইল ফোন নিয়ে ঢুকেছেন, আবার কথাও বলছেন। এ কথার জবাবে দাঁড়িয়ে হ্যাঁ সূচক মন্তব্য করেন ডেভিড বার্গম্যান। বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক তখন বার্গম্যানকে বলেন, ‘গেট আউট’। এর আগে একাধিকবার নিজস্ব ব্লগে বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বিচার, আইন নিয়ে একের পর এক বক্তব্য দানকারী বার্গম্যান আইনের ছাত্র নন, কোন বিচারপ্রক্রিয়া কিংবা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত নন, এমনকি আইনজীবীও নন। তিনি শুধু একজন সাংবাদিক।