২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই ঘন্টায়    
ADS

জীবন বাজি রেখে ইতিহাস রচনাকারীদের অন্যতম মুনতাসীর মামুন

জীবন বাজি রেখে ইতিহাস রচনাকারীদের অন্যতম মুনতাসীর  মামুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সম্প্রতি বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও লেখক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ‘বজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি পুরষ্কার’ এ ভূষিত হন। পশ্চিমবঙ্গের বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ গবেষণায় অনন্য অবদানের জন্য তিনি এ পুরস্কার পান। তার এই পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক আনন্দ অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ইতিহাস চর্চায় মুনতাসীর মামুনের অবদান অতুলনীয়। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যখন প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন, তখন তিনি ইতিহাসকে আলোর মুখ দেখিয়েছেন। ইতিহাসের মানুষ হয়ে তিনি সাহিত্যে পুরস্কার পেয়েছেন। এতে করে অতি সহজে স্পষ্ট মুনতাসীর মামুন বহু গুণে গুণান্বিত। ব্যক্তি জীবনে ডজন খানেক পুরস্কার পেলেও, বজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই প্রথম। এতে করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তার পুরস্কার প্রাপ্তি শুরু হলো। সম্মানজনক এ পুরস্কারটি বাংলাদেশে তিনিই প্রথম অর্জন করেন।

শুক্রবার বিকেলে রাজধানী ধানম-ির ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে ওই আনন্দ অনুষ্ঠান সম্মিলিতভাবে আয়োজন করে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী ও হাশেম খান-পারভিন ট্রাস্ট। অনুষ্ঠানের শুরুতে মুনতাসীর মামুনকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানায় ১৮-এর অধিক সংগঠন।

আনন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার জয়ী লেখক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মুনতাসীর মামুন বলেন, আমি ইতিহাস চর্চা করেছি, তবে মেধাবী নই। ওই ধরনের মেধা আমার নেই। পুরস্কারপ্রাপ্তির পর আমি ওই দেশে বলেছি, বাংলাদেশ হবে বাংলা ভাষার কেন্দ্র। বাংলা ভাষার জন্য আপনাদের বাংলাদেশে যেতেই হবে। বাংলাদেশকে বিবেচনা করে পুরস্কার দেয়া হয়নি, বাংলা ভাষাকে বিবেচনা করে পুরস্কার দেয়া হয়েছে। মুনতাসীর মামুন বলেন, আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি। আমরা যারা ইতিহাসের শিক্ষক, লক্ষ্য করে দেখেছি ইতিহাসবিদরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে তেমন কিছু লিখেননি। তাই অসম্পূর্ণতা পূরণর চেষ্টা করেছি মাত্র।

মুনতাসীর মামুন তাঁর বাবাকে স্মরণ করে বলেন, যখনই কোন পুরস্কার পাই, তখনই বাবার কথা মনে হয়। বাবা তো বটগাছ, সব সময় ছায়া দিয়ে রাখতেন। বাবা থাকলে আজ কত খুশি হতেন। আমার দাদা, আমার নানা আজ সবাইকে মনে পড়ছে। নানার একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছিল, তিনি আমার বই বের করতে চেয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, আমার বাবা-চাচা প্রায় সবাই শিক্ষকতা করেছেন। আমার পরিবারের বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৫০০। বক্তব্য দিতে গিয়ে এ সময় তিনি ছিলেন আবেগাপ্লুত।

এ সময় সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর বলেন, একজন ব্যক্তি একা বড় হতে পারেন না, তার পরিবার তাকে বড় করে তোলে। মামুনের বড় হয়ে ওঠার পেছনে তার পরিবারের অবদান রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে একই সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মান্ধতা অব্যহত আছে। যদি ঠিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ধারা অব্যাহত রাখতে পারি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের চিরস্থায়ী ব্যবস্থা হবে। বাংলাদেশে যখনই ধর্মান্ধতা কাজ করেছে সাধারণ মানুষ তখন তা রুখে দাঁড়িয়েছে। জীবনবাজি রেখে যারা ইতিহাস রচনা করেছেন তিনি হচ্ছেন মুনতাসীর মামুন। তিনি আরও বলেন, ইতিহাস তৈরি করেন সাধারণ মানুষ, ইতিহাসবিদদের কাজ হচ্ছে সাধারণ মানুষের কৃতিত্ব স্বীকার করা। মামুন তার বইয়ে বার বার এই কাজটিই করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসকে যারা উল্টোপথে নেবার চেষ্টা করেছেন তারাই মার খাবেন, আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন। যদি বাঁচতে হয় ইতিহাসের কাছে যেতেই হবে, স্মরণ করতে হবে প্রকৃত ইতিহাস।

সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগের বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, মুনতাসীর মামুন একজন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ আবার ধার্মিকও বটে। তাঁর জীবনটাই কেটেছে মৌলবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। জিয়ার আমলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্যান্য মানুষের সঙ্গে সঙ্গে মুনতাসীর মামুনও নির্যাতিত হয়েছেন। তিনি যুদ্ধাপরাধী বিচারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি আরও বলেন, আমাদের বিচার ব্যবস্থা কিন্তু ৩০ বছরের নয়, আরও বহু বছর আগের। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই বিচার হচ্ছে। ৩ জন বিচারক বিচার করছেন, তারপর চলে যাচ্ছে আপীল বিভাগে। আপীলের পর আবার রিভিউয়ের বিধান রয়েছে। যারা বলছেন বিশ্বমানের নয়, তারা হয় জ্ঞানপাপী নতুবা অন্ধ। অন্যান্য দেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে অপরাধীর সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়। তিনি বলেন, মুনতাসীর মামুন বঙ্গবন্ধুর একজন একনিষ্ঠ সৈনিক। একমাত্র একুশে পদক ছাড়া উনি রাষ্ট্র থেকে তেমন কিছুই পাননি।

শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, শিশুকাল থেকেই মুনতাসীর মামুন প্রগতিশীল চিন্তাচেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। বাংলাদেশের প্রগতিশীল চিন্তাচেতনায় তার অবদান সর্বজনস্বীকৃত।

অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেন, ইতিহাস চর্চায় মুনতাসীর মামুনের অবদান অতুলনীয়। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যখন প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন, তখন সেই ইতিহাসকে আলোর মুখ দেখিয়েছেন মুনতাসীর মামুন।

অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, মুনতাসীর মামুন দেশীয় পর্যায়ে ডজন খানেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, তবে বজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই প্রথম। তিনি ইতিহাসের মানুষ হয়ে সাহিত্যে পুরস্কার পেয়েছেন, এতেই স্পষ্ট করে বোঝা যায় মুনতাসীর মামুন বহু গুণে গুণান্বিত। এসময় বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।