১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লি কুয়ান ও বঙ্গবন্ধু

  • মাহমুদুল বাসার

সিঙ্গাপুরের জনক ও নির্মাতা লি কুয়ান ত্রিশ বছর শাসন করেছেন সিঙ্গাপুর। তবে তিনি বিতর্কের উর্ধে ছিলেন না, বরং তাকে বিতর্কিত নেতাই বলা হয়। স্বাধীনতার ৬ বছর আগে থেকে লির পিপলস এ্যাকশন পার্টি সিঙ্গাপুরে রাজত্ব করেছে। একটি ছোট্ট শহর থেকে অর্থনৈতিকভাবে সিঙ্গাপুরকে মডেলে পরিণত করার সময়টাও অতিরিক্ত কড়া আচরণের জন্য সমালোচিত হয়েছিলেন লি। লি ছিলেন প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের বিশেষ অনুগামী। তার জমানায় সিঙ্গাপুরে বিরোধী রাজনীতি ও স্বাধীন মিডিয়ার পায়ে পদে পদে বেড়ি পরিয়ে ছিলেন তিনি। তার আমলে মৃত্যুদ-ের সংখ্যা ছিল সাংঘাতিক। রাজনৈতিক বিরোধীদের আইনী মামলায় ফাঁসানোর জন্যও বিখ্যাত ছিল লি প্রশাসন। ১৯৯০ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে আসেন লি। যদিও পরবর্তী সরকারের ওপর লির অপ্রতিহত প্রভাব ছিল। ২০০৪ সালে তার বড় ছেলে লি দেইন লুং সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি নিজে ‘মিনিস্টার মেন্টর’ বলে একটি পদে বসেন। ২০১১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তার দলের পরাজয়ের পর ক্যাবিনেট থেকে পদত্যাগ করেন লি কুয়ান ইউ।

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে লিকুয়ানের সঙ্গে তুলনা করে আমার এই আলোচনাটি। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২-৭৫ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত বহুদলীয় সংসদকেন্দ্রিক সরকার পরিচালনা করেছেন। এরপর তিনি বাস্তব পরিস্থিতির কারণে চরম হঠকারিতা থেকে দেশকে নিষ্কৃতি দেয়ার লক্ষ্যে, দেশে স্থিতিশীলতা আনার স্বার্থে, অনিবার্য ও তাৎক্ষণিক তাগিদে বাকশাল গঠন করেছিলেন। কেন এই পদক্ষেপ তিনি নিয়েছিলেন তার সুস্পষ্ট জবাবদিহি তিনি করেছিলেন ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদে দেয়া তার সুদীর্ঘ ভাষণের মাধ্যমে জাতির কাছে। এখানে লি কুয়ানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পার্থক্য। লি কুয়ান ছিলেন প্রকৃতই ডিক্টেটর। তিনি মার্কসবাদী লেনিনবাদী ছিলেন না, তবুও কমিউনিস্টদের অনুকরণে তার দেশ থেকে ভিন্ন মত লোপ করেছিলেন। তার আমলের ৩০ বছরের শাসনকালে বিরোধী দলের রাজনীতি কার্যত নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলার কাদাজল থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক নেতা। তিনি ছিলেন সংবেদনশীল মনের মানুষ। তিনি সাড়ে তিন বছর শুধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেননি, ঘরে-বাইরে, দেশে-বিদেশে নির্মম, নিñিদ্র, লাগাতার বৈরী প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেছেন। যা লি কুয়ান করেননি। করেছিলেন বার্মার অবিসংবাদিত জাতীয়তাবাদী নেতা অংসান। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তাকে হত্যা করেছে। প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেছিলেন চিলির সমাজতান্ত্রিক নেতা ড. আলেন্দে। তাকেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ হত্যা করেছে। ড. আলেন্দের বিধবা পতœী বেড়াতে এসেছিলেন কলকাতায়। তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন জনপ্রিয় কলাম লেখক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। তাকে মিসেস আলেন্দে বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্রের এখন সবচেয়ে বড় শত্রু আমেরিকা। তৃতীয় বিশ্বে গণতন্ত্রের শান্তিপূর্ণ অপুঁজিবাদী বিকাশ তার কাম্য নয়। তাই চিলি থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক দেশে ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনার কাজে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করা হচ্ছে। হাজার হাজার এজেন্ট নিয়োগ করা হয়েছে। এই চক্রান্তের চাইতে ভয়ঙ্কর অন্তর্ঘাত অর্থাৎ ভেতর থেকে আঘাত করা। সিআইএ টাকার জোরে একটি অনুন্নত দেশের পার্লামেন্ট, জুডিশিয়ারি এবং প্রচার মিডিয়ায় প্রবেশ করে। অনুগত ব্যুরোক্রেসির মাধ্যমে সরকারের সকল গোপন খবর সংগ্রহ করে এবং সরকারী পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়। যে সরকারের তারা পতন ঘটাবে, তার বিরুদ্ধে এজেন্ট সাংবাদিকদের দ্বারা দেশে এবং বিদেশে অপপ্রচার শুরু করে। এভাবে এবং বিদেশের জনমত যখন ওই সরকারের ওপর সম্পূর্ণ বিগড়ে যায়, তখন তারা আঘাত হানে।’ (ইতিহাসের রক্ত পলাশ, পৃঃ : ২৬, ২৭)।

মার্কিন প্রশাসন বঙ্গবন্ধু হত্যার ব্যাপারে মিসেস আলেন্দে বর্ণিত অপকৌশল প্রয়োগ করেছিল। দেশ-বিদেশে যে অক্ষশক্তি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, সেই অক্ষশক্তি বঙ্গবন্ধু হত্যার নেটওয়ার্ক বিস্তার করেছিল। কিন্তু লি কুয়ানের বেলায় এমন ঘটনার অবতারণা হয়নি। তিনি নির্বিঘেœ সিঙ্গাপুরকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার দীর্ঘ সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা পাননি। একটি উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে, বঙ্গবন্ধু কতটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছিলেন। এক সময়ের ডাকসুর ভিপি বর্তমান সিপিবির নেতা বঙ্গবন্ধুর ডাকসুর আজীবন সদস্যপদ টেনে ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। সিরাজ শিকদার, সিরাজুল আলম খান, আবদুল হক, তোয়াহা, দেবেন শিকদার এরা কী রকম হঠকারিতা করেছিলেন তা কল্পনা করতেও কষ্ট হয়। সংবাদপত্রের জগতে ছিলেন বদরুদ্দীন উমর, নির্মল সেন, এনায়েতুল্লাহ খান, খন্দকার আবদুল হামিদরা। এরা আদাজল খেয়ে নেমেছিলেন বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি মাটির তলায় দাবিয়ে দিতে। জাসদের ‘গণকণ্ঠ’, মওলানা ভাসানীর ‘হক কথা’, প্রাচ্যবার্তা, এনায়েতুল্লাহ খানের ‘হলিডে’ পত্রিকা বঙ্গবন্ধুসহ দেশবাসীর চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। এমনকি ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনায় সদা তৎপর ছিলেন।

অনেকটা অপ্রকাশ্যেই খন্দকার মোশতাক এবং জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু সরকারের বক্ষপুটে ছুরিকাঘাত করে যাচ্ছিলেন। অন্যদিকে বিদেশে ড. কিসিঞ্জার ও ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর খুনীদের উস্কানি দিয়ে যাচ্ছিলেন। ভুট্টোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছিলেন আবদুল হকের মতো বামপন্থীরাও। গলাকাটা রাজনীতির কাজটা করেছিলেন কমরেড তোয়াহা গুহায় বসে। শ্রেণীশত্রু খতমের নামে আওয়ামী নিধন শুরু করেছিলেন সিরাজ শিকদার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাড়ি আক্রমণ করেছিল জাসদ। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর মধ্যে বিষাক্ত অপপ্রচার করে যাচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে। সেনাবাহিনীকে তিনি ক্ষেপিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। ব্রিটিশ ও আমেরিকার পত্রিকাগুলো ক্ষেপে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে। বিদেশে তথা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে অপপ্রচারে নেমেছিলেন গোলাম আযম। বঙ্গবন্ধুকে ফুড পলিটিক্সের চক্রান্তে ফেলেছিল মার্কিন প্রশাসন।

চৈনিক হঠকারীরা এবং ডানপন্থী-উগ্রপন্থীরা সাম্প্রদায়িক অপপ্রচার প্রখর করে তুলেছিল। বঙ্গবন্ধুকে রুশ-ভারতের দালাল বানিয়েছিল। ইসলামের শত্রু বলে অপবাদ দিয়েছিল। দেশের সমগ্র মসজিদ, মাদ্রাসায় বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ নীতির কঠোর সমালোচনা হচ্ছিল। ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া বলেছেন, ‘তিনি সারা দুর্ভিক্ষকাল ভাতের পরিবর্তে কেবল রুটি খেয়ে কাটালেন এই বলে, দেশের জনগণ ভাত পাচ্ছে না, আমি ভাত খাব কোন অধিকারে।’ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, পৃঃ : ১৯১)।

একজন কবি ঘোষণা দিলেন, ‘ভাত কে হারামজাদা নইলে মানচিত্র খাব।’ এমন নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেও বঙ্গবন্ধু সাড়ে তিন বছরে রেকর্ড পরিমাণ কাজ করেছেন। বাংলাদেশের উন্নয়নে যেসব সূচকে বঙ্গবন্ধু হাত দিয়েছেন এবং তার গোড়াপত্তন করেছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার আংশিক পূরণ করেছেন মাত্র। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে মানববসতি গড়ে তুলেছিলেন। মানুষের মুখে আহার, পরনের কাপড়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। ঢালাও রিলিফ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করেছিলেন। মানুষকে বাঁচাবার জন্য লঙ্গরখানা খুলে দিয়েছিলেন। মার্কিন প্রশাসন ফুড পলিটিক্স না করলে তিনি পরিস্থিতি আরও দ্রুত সামাল দিতে সক্ষম হতেন। তার পরও তিনি পরিস্থিতি সামলে নিয়েছিলেন। তাকে যখন হত্যা করা হয় তখন বাংলাদেশের পরিস্থিতি সবদিক থেকে তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। এক সের চালের দাম ছিল ৩ টাকা ৬০ পয়সা। খাদ্য ছাড়া অন্য কোন জিনিসের দাম বাড়েনি। সোভিয়েত রাশিয়ার সহযোগিতা নিয়ে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুননির্মাণ করেন। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। শিক্ষা কমিশন, শিক্ষার নীতিমালা গঠন করেন। অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন করেন।

কৃষি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে কৃষককে সার, তেল, কীটনাশক দিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর সময় দেশের ফলন ভাল হয়েছিল। প্রাইমারী শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছিলেন। এসব কাজ করেছিলেন তিনি রুদ্ধ নিঃশ্বাসে। তিনি কি তখন জানতেন মৃত্যু তাঁর দিকে ধেয়ে আসছে! হয় তো নয়।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক