১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যেমন হলো ঈদের অডিও বাজার

  • মানের চেয়ে সংখ্যার আধি ক্য, সস্তা কথা, সুর ও কম্পোজিশনে নতুনত্ব নেই, হতাশ শ্রোতারা

সাজু আহমেদ ॥ গেল ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে বাজারে এসেছে তিন শতাধিক এ্যালবাম। এর মধ্যে ৯৫ ভাগ এ্যালবাম গতানুগতিক এবং গানের কথা ও সুরে নতুনত্ব নেই। আমিও পারি এই ধরনের শখের গীতিকারদের কারণে এ্যালবামের গানগুলোতে মানহীন, সহজ ও সস্তা কথার পুরনাবৃত্তি লক্ষ্য করা গেছে। স্বাভাবিক কারণে এবারের ঈদের এ্যালবামের গানগুলো মৌলিক গানের সঙ্কটের সময়ে তীর্থের কাকের মতো প্রতিক্ষায় থাকা শ্রোতাদের ক্ষুধা মেটাতে পারেনি। ঈদে এ্যালবাম প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো মানের চেয়ে সংখ্যার আধিক্যের দিকেই বেশি মনোযোগী ছিলো অতিরিক্ত অর্থপ্রাপ্তির আশায়। কম্পোজার, সুরকার এবং শিল্পীদের কাছে অর্থ লগ্নি করার মাধ্যমে তৈরিকৃত এ্যালবাম বিক্রির চেয়ে এবার শিল্পীদের কাছে থেকে নেয়া অর্থই তাদের মুনাফার অন্যতম মাধ্যম ছিল। সে কারণে বরাবরের মতো এবারও বাজারে মানহীন এ্যালবামের ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা গেছে। তবে এবারের ঈদে অন্যতম প্রাপ্তি সিনিয়র কয়েকজন শিল্পী তাদের অভিমান ভুলে এবার এ্যালবাম বের করেছেন। সেসব এ্যালবাম এবং তরুণদের মধ্যে কয়েকজনের এ্যালবামের বেশ কিছু গান প্রশংসিত হলেও বাকিরা হালে পানি পায়নি। সস্তা কথা, সফটওয়ার নির্ভরতা এবং শখের শিল্পীদের আধিক্যের কারণে এবারের ঈদের এ্যালবামগুলো নিয়ে শ্রোতাদের মধ্যে হতাশা লক্ষ্য করা গেছে। এর মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে সুর নকলের অভিযোগ এবং আরেকজনের বিরুদ্ধে মিউজিক ভিডিওতে অশ্লীলতার অভিযোগ উঠেছে। সব মিলে অনেকটাই মন্দের ভাল হিসেবে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে গিয়ে শ্রোতাদের পেট খারাপা হওয়ার অবস্থা। তারপরেও অসংখ্য গানের ভিড়ে কথা ও সুর প্রধান শিল্প-সাহিত্যনির্ভর কিছু গান তৈরি হয়েছে, যা অনেকটাই আশা জাগানিয়া। তবে তিন শতাধিক এ্যালবামের মধ্যে বাজার ঘুরে চল্লিশটির বেশি এ্যালবামের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। আলোচনায় আসা কয়েকটি এ্যালবামের পর্যালোচনা নিয়ে এ প্রতিবেদন।

প্রিন্স মাহমুদের ‘খেয়াল পোকা’ : বাংলা গানে গীতিকবিতা নিয়ে যারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আলোচিত হয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম প্রিন্স মাহমুদ। এবারের ঈদে এসেছে তাঁর মিশ্র এ্যালবাম ‘খেয়াল পোকা’। জি-সিরিজ থেকে প্রকাশিত এ্যালবামে গানের কথা ও সুরে বরাবরের মতো নতুনত্বের ছোঁয়া আছে। অসংখ্য কমার্শিয়াল এ্যালবামের ভিড়ে শ্রোতাদের ভাললাগার মতো ‘খোয়াল পোকা’ এ্যালবামের গানগুলো। ইতোমধ্যে এ এ্যালবামের গানগুলো শ্রোতারা বেশ পছন্দ করেছেন।

কনক চাঁপার ‘পদ্মপুকুর’: দীর্ঘদিন পর বাজারে এসেছে কনকচাঁপার নতুন এ্যালবাম ‘পদ্মপুকুর’। এ্যালবামের জন্য এখানে গান লিখেছেন গাজী মাযহারুল আনোয়ার। এ্যালবামের ৮টি গানের কথা সাহিত্যনির্ভর ও মানসমৃদ্ধ। এর মধ্যে দু-তিনটি গান সময়কে অতিক্রম করার দাবি রাখে। মোট কথা ‘পদ্মপুকুর’ এ্যালবামে সৃজনশীলতার শতভাগ চেষ্টা করা হয়েছে।

সামিনা-রাঘবের ‘একটা বন্ধু চাই’ : পশ্চিবঙ্গের বেশ ক’জন শিল্পীকে নিয়ে এ্যালবাম করেছেন জুলফিকার রাসেল। এবার তার কথায় লেজার ভিশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে সামিনা চৌধুরী ও রাঘবের দ্বৈত এ্যালবাম ‘একটা বন্ধু চাই’। এ্যালবামে রয়েছে ১২টি গান। গানগুলোর কথায় স্বাতন্ত্র্যতা লক্ষ্য করা গেছে। নিয়মিত গান শোনেন, এমন শ্রোতাদের ভাল লাগবে নিঃসন্দেহে। তবে কয়েকটি গানের সুরে একঘেয়ে বলে মনে হয়েছে।

মানিকের ‘আয় ভোর’ : ব্যতিক্রমী গানের কণ্ঠশিল্পী আমিরুল মোমেনীন মানিকের এবারের ঈদ এ্যালবাম ‘আয় ভোর’ বেরিয়েছে লেজার ভিশন থেকে। টাইটেল গান ‘আয় ভোর’ এ মানিকের সঙ্গে গেয়েছেন জীবনমুখী বাংলা গানের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তী। মানিকের কথা, সুরের এই গানটি হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। মিউজিক কম্পোজিশনে নতুনত্ব রয়েছে। তবে এ্যালবামে ২-৩টি গানের মিউজিক কম্পোজিশনে দুর্বলতা লক্ষ্যণীয়।

এফএ সুমনের ‘জানরে তুই’ : এফ এ সুমনের নতুন এ্যালবাম ‘জানরে তুই’ বের হয়েছে জি-সিরিজ থেকে। এ্যালবামে শিল্পী নিজস্ব ঢঙে গেয়েছেন। গানগুলো মফস্বলের শ্রোতারা ভালভাবে গ্রহণ করেছে। দু-একটি গানের কথা ও সুরে নিরীক্ষা করা হয়েছে, যা অনেকটাই নতুন মনে হয়েছে।

লুৎফরের ‘বিরহ উদ্যান’ : লুৎফর হাসানের এ্যালবাম ‘বিরহ উদ্যান’ বেরিয়েছে ঈগল মিউজিক থেকে। এ্যালবামে গীতি প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে ইশতিয়াক আহমদের টাইটেল গানটি বেশ গীতিধর্মী। বেশ ক’টি গানের কথার গভীরতা শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। তবে কয়েকটি গানে সুরের অপরিপক্বতা ও পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা গেছে।

ইমরানের ‘বলতে বলতে চলতে চলতে’ : বাণিজ্যিকধারার এ্যালবামের মধ্যে সঙ্গীতার ব্যানারে বেরিয়েছে ইমরানের ‘বলতে বলতে চলতে চলতে’। এ্যালবামের সব গানের মধ্যে ‘বলতে বলতে চলতে চলতে’ ও ‘ফিরে এসো না’ গান দুটি ভিডিওর কল্যাণে দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে কিছু গানের সুর একঘেয়ে ও পুনরাবৃত্তি মনে হয়েছে।

অবসকিউরের ‘মাঝ রাতের চাঁদ’: অবসকিউর ব্যান্ডের শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রোতাদের ছুঁয়ে যাওয়ার মতো এ্যালবাম ‘মাঝ রাতের চাঁদ’। এ্যালবামটির প্রকাশক জি-সিরিজ। গানগুলোর কথা, সুর, কম্পোজিশনে আধুনিকতার সঙ্গে নান্দনিকতাও খুঁজে পাওয়া যায়। ‘মাঝ রাতের চাঁদ’ এ্যালবামের গানগুলো ব্যান্ডের শ্রোতাদের নতুন স্বাদ দিয়েছে। তবে একটা ঘরানার বাইরে গানগুলো পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম।

বেলাল খানের ‘আর একটি বার’ : বেলাল খানের ঈদের এ্যালবাম ‘আর একটিবার’ লেজার ভিশন থেকে বের হয়েছে। ৮টি গানের মধ্যে ‘মেঘলা দুপুর’ ও ‘দোযখ’ শিরোনামের গান দুটির মধ্যে কেবলমাত্র নান্দনিকতার স্পর্শ পাওয়া যায়। তবে, এ এ্যালবামের ‘নিশি করি ভোর’ গানের কথা ভাল হলেও এর ভিডিও চিত্রটি অশ্লীলতার অভিযোগ উঠেছে।

ইলিয়াসের ‘না বলা কথা-৩’: মিউজিক ভিডিওর কারণে পরিচিত পেয়েছে ইলিয়াসের ঈদের এ্যালবাম ‘না বলা কথা-৩’। এটি প্রকাশ করেছে সুরঞ্জলি। এ্যালবামের ‘না বলা কথা’ ও ‘অভিমানী’ শিরোনামের গানটি তার শ্রোতারা গ্রহণ করেছে। তবে প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দিনের ‘আমায় ভাসাইলিরে’ গানটি ইলিয়াসের নতুন করে গায়কী নিয়ে যথেষ্ঠ সমালোচনা হচ্ছে।

আইয়ুব বাচ্চুর ‘জীবনের গল্প’ : ঈদ উপলক্ষে বেশ ক’টি মিউজিক ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে। ব্যান্ডতারকা আইয়ুব বাচ্চুর নতুন ভিডিও গান ‘জীবনের গল্প’। গানটি প্রচার পেলে মানুষের মুখে মুখে থাকতে পারে। আইয়ুব বাচ্চু এই ভিডিও গানের মধ্য দিয়ে শ্রোতাদের নতুন কিছু দেয়ার পরিশ্রমী প্রচেষ্টা করেছেন।

হাবিবের নতুন ভিডিও ‘মন ঘুমায় রে’ : ঈদ উপলক্ষে নতুন মিউজিক ভিডিওর প্রোমো প্রকাশ করেছেন হাবিব ওয়াহিদ। প্রোমো দেখেও অনেকে মুগ্ধ হয়েছেন। তবে পূর্ণাঙ্গ ভিডিও প্রকাশ হলে এর ভাল-মন্দ বোঝা যাবে।

তানভীর তারেকের ‘ঝুম বরষায়’ : ঈদে তানভীর তারেকের মিউজিক্যাল ফিল্ম ‘ঝুম বরষায়’ প্রকাশ হয়েছে। গানটির কম্পোজিশন ও সুরে শিল্পী নিজেকে ভাঙার নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে নির্মাতা শিল্পীকে নান্দনিক ও শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। অন্য দশটি বর্ষার গানের চেয়ে এটি একটু আলাদা রকমের গান মনে হয়েছে।

আরফিন রুমীর ‘কিছু কথা আকাশে পাঠাও’ : তিনটি গানের ভিডিও নিয়ে বের হয়েছে আরফিন রুমীর নতুন এ্যালবাম ‘ কিছু কথা আকাশে পাঠাও’। গানগুলোর চিত্রায়নে আলাদা কিছু দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে গানগুলোর সুরে ভারতের দক্ষিণ অঞ্চলের ফিল্মি সুরের নকল করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মিলার ‘নাচো’ : দীর্ঘ বিরতি দিয়ে মিলা প্রকাশ করেছেন নতুন ভিডিও ‘নাচো’। গানটি তার নিজস্ব স্টাইলের। তবে ভিডিওটিতে নতুনত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এছাড়া ফিব্যাকের এ্যালবাম ‘এখন’ এবং মাইলসের ‘প্রতিধ্বনী’ এ্যালবামের গানগুলোও শ্রোতাদের মধ্যে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। এতসব সমালোচনা সত্ত্বেও বাংলা গান নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী শ্রোতারা। কারণ তারা বাংলা গান পছন্দ করেন এ ধারার গানের ঐতিহ্যের কারণে। তারা এখনও বিশ্বাস করেন দেশে অনেক মেধাবী শিল্পী এবং পরিচালক আছেন যাদের একটু সদিচ্ছা হলেই আবারও সোনালি যুগের মতো ভাল ভাল বাংলা গান তারা তৈরি করতে পারেন। শ্রোতাদের নতুন নতুন মৌলিক গান উপহার দিতে পারেন। সেই যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক মানুষই আছেন। তাদের হাত ধরে বাংলা গান আবারও সমৃদ্ধ হবে সেই প্রত্যাশা তাদের। বরাবরের মত সেই অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।