২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রজাপতি বন্ধু

  • আইরীন নিয়াজী মান্না

লালডানাওয়ালা প্রজাপতি। কি যে সুন্দর তার রঙিন ডানা দুটো। এ ডানায় ভর করে সারাবেলা সে ঘুরে বেড়াতো মনের আনন্দে। নেচে বেড়াত ফুলে ফুলে। লালডানাওয়ালা প্রজাপতির একটা বন্ধু প্রজাপতি ছিল। দু’বন্ধু সব সময় একসঙ্গে থাকত। তাদের আনন্দের কোন শেষ ছিল না। খুব সুখেই কাটছিল দিন। হঠাৎ একদিন লালডানা প্রজাপতির জীবনে নেমে এলো ঝড়ো হাওয়া। কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল তার জীবন। অনেক চেষ্টা করেও বন্ধু প্রজাপতি বাঁচাতে পারল না তাকে। হলো কি! অতর্কিতে একদল হিংসুটে শত্রু এসে কেটে দিল লালডানা প্রজাপতির সুন্দর ডানা দুটো। বন্ধু প্রজাপতিকেও তারা অপমান করল সাংঘাতিকভাবে। ডানা হারিয়ে আহত পাখির মতো করুণ হলো লালডানা প্রজাপতির অবস্থা। অসহায়ের মতো মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ল সে। আর উড়তে পারে না।

এদিকে আহত প্রজাপতির এই করুণ অবস্থা দেখে প্রাণ ফেটে যায় বন্ধু প্রজাপতির। নিজের অপমানের কথা ভুলে যায় সে। সকলের বাধা উপেক্ষা করে বন্ধু প্রজাপতি গিয়ে দাঁড়ায় আহত লালডানা প্রজাপতির পাশে। বলে : তোমাকে আবার নতুন করে বাঁচতে হবে। তুমি শক্ত হয়ে ওঠো। মাথা উঁচু করে দাঁড়াও। দেখ পৃথিবীটা বড় সুন্দর। অন্ধকারের আড়ালে সুখ লুকিয়ে আছে। সেই সুখ তোমাকে আবিষ্কার করতে হবে। সমাজের ভয়ে লুকিয়ে থাকলে তোমারই ক্ষতি। দুঃখ সে তো ক্ষণিকের, সুখ চিরস্থায়ী। লালডানা প্রজাপতি উদাস হয়ে শোনে বন্ধু প্রজাপতির কথা। তার চোখ ভরে ওঠে অশ্রুতে। সে ভাবে কেন হঠাৎ এমন একটা ঝড়ো হাওয়া এসে তার জীবনটা ওলোট-পালোট করে দিল! সে তো কোন অন্যায় করেনি; তাহলে কোথা থেকে জন্ম হলো এসব শত্রুর! শত্রুগুলো তার এত বড় সর্বনাশ করল কেন? ওরা তো তার আপনজন। ওরা কেন এমন শত্রু হয়ে গেল? লোভে! হিংসায়! তার জীবনের সব স্বপ্ন ধ্বংস করে দিয়েছে ওরা। মাত্র ক’দিনের ব্যবধানে লালডানা প্রজাপতি শুকনো কাঠির মতো হয়ে পড়ে। ওর মুখের সুন্দর হাসিটি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এক বসন্ত গিয়ে আরেক বসন্ত আসে। গাছে গাছে নতুন পাতা আসে। ডালে ডালে পাখিরা গেয়ে ওঠে মিষ্টি গান। সময় গড়িয়ে যায় তার নিজের নিয়মে। সময়ের ব্যবধানে আর প্রিয় বন্ধুর সংস্পর্শে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে থাকে লালডানা প্রজাপতি। জীবনের বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সে আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে।

কেটে যায় অনেক দিন। এখন লালডানা প্রজাপতি বেশ স্বাভাবিক। একদিন এক পড়ন্ত বিকেলে কাজল দীঘির তীরে বসে ওরা গল্প করছে। এ সময় হঠাৎ লালডানা প্রজাপতি বলে : যারা আমার ডানা কেটে দিয়েছিল আমি ওদের ক্ষমা করে দিয়েছি। ওদের আমি ভালবাসি। ওরা আমার স্বজন। ওরা ওদের ভুল বুঝতে পেরেছে বন্ধু। বন্ধু প্রজাপতি ভীষণ অবাক হলো ওর কথা শুনে। সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল লালডানা প্রজাপতির মুখের দিকে। কি বলছে ও! সত্যি তো ওর কথাগুলো! অবাক হয়ে ভাবতে লাগল বন্ধু প্রজাপতি। ক্ষমা স্বর্গীয়। বিধাতা ক্ষমাদানকারীকে পছন্দ করেন। ওর চোখে পানি চলে এলো। ঝাপসা চোখে ও তাকিয়ে রইল লালডানা প্রজাপতির দিকে। লালডানা প্রজাপতি ওর মনের অবস্থা বুঝল কিনা কে জানে। ও কাজল দীঘির দিকে তাকিয়ে উদাস ভঙ্গিতে আবারও বলতে শুরু করল : ওরা প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়। ওরা আমার আপন আত্মীয়। আমার সকল দায়িত্ব নিয়েছে। লোভে পড়ে ওরা যা করেছে তার শাস্তিও ওরা পেয়েছে। ওদের মনে আজ কোন শান্তি নেই। তাই আমি ওদের ক্ষমা করেছি। ঠিক এই মুহূর্তে নিজেকে খুব সুখি মনে হলো বন্ধু প্রজাপতির। যার সুখের জন্য এত কষ্ট করা তার মুখে আজ এসব কথা শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল সে! বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে সে বলল : তুমি ওদের ক্ষমা করে দিয়েছ! তুমি স্বাভাবিক হয়েছ। বন্ধু, তোমার মুখে আজ হাসি। আজ আমার সুখে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।

ওর কথা শুনে লালডানা প্রজাপতি কাঁদতে শুরু করল। কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলল : বন্ধু এ সবই তোমার কারণে হয়েছে। তুমি আমার পাশে না থাকলে আমি হয় তো মরেই যেতাম। বন্ধু প্রজাপতি বলল : না, না আমি কিছু করিনি। তুমি তোমার মনোবল ফিরে পেয়েছ। তুমি আবার উঠে দাঁড়িয়েছ। এর চেয়ে বেশি আমি আর কিছু চাই না। এবার লালডানা প্রজাপতি চোখ মুছতে মুছতে প্রশ্ন করল : তুমি সত্যি খুশি হয়েছ? বন্ধু প্রজাপতি সত্যি এবার হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। বলল : বিশাল হৃদয় তোমার। তাই তুমি ওদের ক্ষমা করেছ। এর চেয়ে বড় সুখ আর কি হতে পারে বন্ধু। দূরে সবুজ পাতার ফাঁকে গাছে গাছে ফুল ফুটল। পাখিরা গাইল গান। স্নিগ্ধ বাতাসে মাতাল হলো প্রকৃতি। কাজল দীঘির তীরে বসে লালডানা প্রজাপতি আর বন্ধু প্রজাপতি মনের আনন্দে গল্প করতে শুরু করল। ওদের হাসির কলতানে মুখরিত হলো শেষ বিকেল। ওরা দু’বন্ধু আজ কত সুখি!