১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাঙালী সংস্কৃতিতে অবিচ্ছেদ্য ॥ নদী ও নৌকা

  • ৬ ধরনের নৌকা ছিল বাংলাদেশে

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের বুক চিরে বয়ে গেছে ছোট বড় অসংখ্য নদ-নদী। নদী ছাড়াও রয়েছে প্রচুর খাল, বিল, হাওড় ও বাঁওড়। হাজারো নদ-নদী ও হাওড়-বাঁওড়ের কারণেই একসময় এখানকার যাতায়াতের প্রধান বাহন ছিল নৌকা। মাঝিমাল্লারা দিন-রাত উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নৌকা চালাতেন। চালাতে চালাতে মনের আনন্দে উদাস গলায় ভাটিয়ালী গান গাইতেন। নদী ও নৌকাকে ঘিরে এখানে সূচিত হয়েছে বাঙালীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যাকে বলা যায়Ñ ‘নৌকা-সংস্কৃতি’। বাংলা সাহিত্যের অনেক গান, কবিতা, গল্প, নাটক, যাত্রাপালা এমনকি আধুনিক কালের টিভি নাটক বা সিনেমায়ও স্থান পেয়েছে নৌকা। বলা চলে, এ দেশের অস্তিত্বের সঙ্গে নদী ও নৌকার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।

সুদূর অতীতেও নৌকা ছাড়া বাঙালীর জীবন ছিল অচল। এখানে-সেখানে যাতায়াত, হাট-বাজার, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অনেক কিছুই ছিল নৌকানির্ভর। আবহমান এ বাংলায় এখনও নৌকা চলে। কিন্তু আগের তুলনায় নিতান্ত কম। কারণ, নদ-নদী-হাওড়-বাঁওড় ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নৌ-চলাচলের পথ বন্ধ করে যত্রতত্র নির্মিত হচ্ছে ব্রিজ, কালভার্ট, ¯ুøইসগেট। অন্যদিকে শহর থেকে গহীন গ্রামেও পৌঁছে যাচ্ছে পাকা সড়ক। এসব সড়কে ছুটে চলছে অত্যাধুনিক যন্ত্রযান। ফলে নৌকার প্রয়োজনীয়তা কমে আসছে। আগের মতো এখন আর পাল তোলা নৌকা চোখে পড়ে। এরই মধ্যে অতীত হয়ে গেছে মাঝি-মাল্লাদের দাঁড় বা গুন টানার দৃশ্য। হারিয়ে গেছে অনেক ধরনের নৌকা। নৌকার ধরনও দিন দিন পাল্টে যাচ্ছে। পাল বা দাঁড়ের বদলে যুক্ত হয়েছে শ্যালো ইঞ্জিন। শান্ত নদীর বুকে ভট ভট আওয়াজ করে চলছে ইঞ্জিন নৌকা। অর্থাৎ চিরচেনা সেই দৃশ্যগুলো ক্রমশ অতীত হয়ে যাচ্ছে। আধুনিককালের দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকতে পারছে না সনাতন দিনের এসব লৌকিক যান। জাদুঘরে স্থান পাচ্ছে ’বাঙালীর নৌকা’।

হরেকরকমের নৌকা : অন্তত ৬০ ধরনের নৌকা ছিল বাংলাদেশে। একেকটির গঠনশৈলী বা ধরন একেক রকম। কোনটি বড়, কোনটি ছোট। আবার কোনটি মাঝারি ধরনের। কিছু নৌকায় পাল ছিল। আর কিছু নৌকা চলত পাল ছাড়া, দাঁড় টেনে বা বৈঠার সাহায্যে। নৌকার নামও ছিল সুন্দর। যেমন : গস্তি, কেরায়া, পাতাম, কোষা, ভৈইরব্যা, ময়ূরপঙ্খী, তাবোড়ি, ঘাসি, সাম্পান, টেম্পো, শুলুক, বেদি, বাচারি, জোড়া নৌকা, পদি, পানসি, মালার, বাজিতপুরি, জৈন্তাপুরি, সিলেটি, করপাই, পালোয়ারি, পালটাই, বেদে নাও, বিক, ফেটি, বজরা, ডিঙ্গি, রফতানি, বাতনাই, বালার, বৌচোরা, লক্ষ্মীবিলাস, টালাই, ইটা নৌকা, তালের নাও, বাইচের নাও, বেপারির নাও, কোন্দা, ইলশা, ছিপ, বারকি, খেয়া প্রভৃতি। ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী এসব নৌকাকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন: যাত্রীবাহী নৌকা, মালবাহী নৌকা, মাছ ধরার নৌকা ও বাইচের নৌকা।

যাত্রীবাহী নৌকা : কে যাস রে ভাটির গাঙ বাইয়া/ আমার ভাইজানরে কইও/ নাইওর নিতো আইয়া...। আবহমান গ্রামবাংলার নৌকানির্ভর প্রাচীন যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা চমৎকারভাবে চিত্রিত হয়েছে এ ভাটিয়ালী গানটিতে। একসময় পল্লীবধূরা নৌকায় চড়ে বাবার বাড়িতে নাইওর যেতেন। তবে শুধু পল্লীবধূরাই নয়, দূর-দূরান্তে যাতায়াতের জন্য প্রায় সবাই ছিলেন নৌকানির্ভর। এজন্য বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ধরনের যাত্রীবাহী নৌকার প্রচলন ছিল। যেমন : গয়না বা গস্তি, কেরায়া, নায়রি, সাম্পান, বজরা, লক্ষ্মীবিলাস, ময়ূরপঙ্খী, পানসি প্রভৃতি। এর মধ্যে ‘গয়না’ বহুল পরিচিত নৌকা। কোন কোন অঞ্চলে গয়নাকে ‘গস্তি’ বলা হয়। এতে যাত্রীদের জন্য বাঁশের তৈরি ছৈ (ছাউনি) এবং ছৈয়ের নিচে আরাম করার জন্য বিছানা থাকে। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ অঞ্চলে একসময় গয়নার ব্যাপক প্রচলন ছিল। এখনও মাঝে মধ্যে দেখা যায়। ‘কেরায়া’ বা ‘নায়রি’ নৌকাও দেখতে গয়নার মতো। এগুলো মাঝিরা ভাড়ায় চালাতেন। গ্রামবাংলার আরেক শখের প্রতীক ছিল ‘বজরা’। ধনাঢ্য ব্যক্তিরা বজরায় চড়ে নৌভ্রমণে যেতেন। এতে খাবার-দাবার এবং ঘুমানোর মতো সাংসারিক আয়োজন ছিল। ছৈয়ের দু’পাশে ছিল দুটি জানালা। ছৈয়ের নিচে আরাম করে শুয়ে জানালা দিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতেন শৌখিন যাত্রীরা। অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের নারীরাও বজরায় চড়তেন। সিরাজগঞ্জ ও পাবনা অঞ্চলে বজরার বেশি প্রচলন ছিল। বজরার মতই আরেক বিলাসী নৌকা ‘ময়ূরপঙ্খী’। এর দুই প্রান্ত দেখতে অনেকটা ময়ূরের মতো। ময়ূরের মতোই এটির রং করা হতো। আগের দিনে রাজা, জমিদার ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা শখে ময়ূরপঙ্খী নৌকায় চড়তেন। এতে সাধারণত দুটি পাল টানানো হতো। ময়ূরপঙ্খী এখন বিলুপ্ত। ‘সাম্পান’ সমুদ্রের নৌকা। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভেসে বেড়ায়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুতুবদিয়া এলাকার সমুদ্র উপকূলে সাম্পান দেখা যায়। এর সামনের দিকটা উঁচু এবং ধনুর মতো বাঁকানো থাকে। পেছনের দিকটা চারকোনা। একসময় মালামাল পরিবহনের উপযোগী বড় সাম্পানও ছিল। এখন সেগুলো খুব একটা দেখা যায় না।

মালবাহী নৌকা : আগের দিনে এখনকার মতো ট্রাক, লড়ি বা কাভার্ডভ্যান ছিল না। পণ্য পরিবহনের প্রধান বাহন ছিল নৌকা। বিভিন্ন ধরনের মালবাহী নৌকার প্রচলন ছিল। যেমন : বেপারির নাও, বালার, বাতনাই, পদি, ডিঙ্গি, সওদাগরি, রফতানি, ঘাসি, পাতাম, বাচারি, ভইরইব্যা, বাজিতপুইর‌্যা, জোড়া নৌকা, বারকি, ইটা নৌকা প্রভৃতি। ‘বেপারির নাও’ হাওড়াঞ্চলের বহুল পরিচিত নৌকা। এটি আকারে বিশাল বড়। বর্ষা মৌসুমে ব্যবসায়ীরা (বেপারিরা) হাওড়ের বিভিন্ন গ্রাম বা বাজার থেকে ধান, পাট, সরিষা কিনে বেপারির নাও বোঝাই দিয়ে মোকামে নিয়ে গেছে। এ নৌকার মাঝিরা দিনের পর দিন ছৈয়ের নিচে কাটিয়েছে। ভরা বর্ষা বা বড় নদী ছাড়া বেপারির নাও চলে না। আগে বেপারির নৌকায় আকাশ ছোঁয়া পাল তোলা হতো। একজন সহকারীর সাহায্যে সারেং বিশাল প্রশস্ত বৈঠা চালাতেন। দাঁড় টানত অন্তত ছয়জন। গুন টানত আরও দু-একজন। নদীবহুল গ্রামগঞ্জে এখনও বেপারির নাও চলে। তবে এখন আর দাঁড় টানতে হয় না। পাল লাগে না। চলে শ্যালো ইঞ্জিনের সাহায্যে। বেপারির নৌকায় অনায়াসে হাজার মণ পণ্য পরিবহন করা যায়। বেপারির নৌকার মতই কুষ্টিয়া অঞ্চলে চলতো ‘বালার’ নৌকা। বালারে জোড়া পাল টানানো হতো। খুলনা অঞ্চলে পণ্য পরিবহন করা হতো ‘বাতনাই’ বা ‘পদি’ নৌকায়। এটি বিশাল দৈত্যের মতো বড় নৌকা। দুই প্রান্ত ধনুর মতো বাঁকানো। মাঝখানটা প্রশস্ত। বালার ও বাতনাইÑ দুটোই এখন বিলুপ্ত প্রায়। প্রায় একই ধরনের ছিল ‘বাচারি’ বা ‘রফতানি’ নৌকাও। বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায়ই দেখা যেত। গ্রামবাংলার আরেক অতি পরিচিত নৌকা ‘ডিঙ্গি’। এর দুই প্রান্ত ত্রিভূজের মতো। ডিঙ্গি দু’ধরনের হয়ে থাকে। একটি বড়, আরেকটি অতিশয় ছোট। বড় ডিঙ্গি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হতো। চাঁদ সওদাগরের কাহিনীতে ডিঙ্গি নৌকার উল্লেখ আছে। বড় ডিঙ্গি নৌকায় অনেক মাঝি থাকত। পালও থাকত বড়। ‘ভৈইরব্যা’ এবং ‘বাজিতপুরি’ নৌকাও মাঝারি ধরনের মালবাহী নৌকা। ‘জোড়া নৌকা’ তৈরি হয় দুটি নৌকার মাঝ বরাবর বাঁশ বা কাঠের পাটাতন জোড়া দিয়ে। পাটাতনের ওপর মাল রাখা হয়। ‘বারকি’ নৌকায় সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে পাথর পরিবহন করা হয়। ‘ইটা নৌকায়ও’ ইট বা পাথর জাতীয় জিনিস পরিবহন করা হয়ে থাকে।

মাছ ধরার নৌকা : মাছ ধরার নৌকা সাধারণত আকারে ছোট হয়। তবে সমুদ্র এলাকার নৌকাগুলো তুলনামূলক বড় থাকে। এসব নৌকায় মাঝিরা উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাছ ধরে। মাছ ধরার জন্য বহু ধরনের নৌকার প্রচলন ছিল বাংলাদেশে। কিছু কিছু এখনও টিকে আছে। যেমন : কোন্দা, তালের নাও, ছোট ডিঙ্গি, কোষা, পাতাম, ইলশা, পানসি প্রভৃতি। এর মধ্যে ‘কোন্দা’ গ্রাম-বাংলার অতি পরিচিত নৌকা। আম বা জারুল কাঠের চার-পাঁচটি তক্তা জোড়া দিয়ে কোন্দা বানানো হয়। অন্যদিকে তালের নাও বানানো হয় আস্ত তাল গাছের দুই প্রান্ত ঠিক রেখে মাঝখানটার এক পাশ পুরো ফাঁকা করে। ছোট ডিঙ্গি দেখতে বড় ডিঙ্গির মতোই, দুই প্রান্ত ত্রিভূজ আকৃতির। নদী বা হাওর উপকূলের অল্প আয়ের লোকজন ছোট ডিঙ্গি দিয়ে মাছ ধরা ছাড়াও ফেরি ব্যবসা করে। ‘কোষা’ নৌকার দুই প্রান্ত লম্বা ও সরু থাকে। ‘পাতাম’ একটি মাঝারি ধরনের নৌকা। হাওরাঞ্চলের জেলেদের ‘পাতাম’ নৌকা ব্যবহার করতে দেখা যায়। ‘ইলশা নৌকার’ দেখা মেলে ইলিশ শিকারের অঞ্চলগুলোতে। মাছ ধরার নৌকায় সাধারণত ছৈ বা পাটাতন থাকে না।

বাইচের নৌকা : আবহমান গ্রাম-বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য ‘নৌকাবাইচ’। বিভিন্ন অঞ্চলে একসময় প্রচুর নৌকা বাইচের আয়োজন হতো। এখনও কিছু কিছু এলাকায় নৌকাবাইচ হয়Ñ যদিও এর জৌলুস আগের মতো নেই। নৌকাবাইচের প্রতিযোগিতাকে কোন কোন এলাকায় বলা হয় ‘নাও দৌড়ানি’। আর বাইচের নৌকাকে বলা হয় ‘দৌড়ের নাও’। বাইচের নৌকার ধরন একটু আলাদা। অনেক লম্বা ও সরু। এতে ছৈ থাকে না। বাইচের নৌকায় ২৫ থেকে ৫০ জন বাইচাল (মাঝি) থাকে। বাদ্য-বাজনার তালে তালে বৈঠা চালাতে হয়। বাইচের নৌকার দুই পাশে রং-বেরঙের ময়ুর, মাছ, ফুল, লতাপাতা প্রভৃতি ছবি আঁকা হয়।

Ñসঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা থেকে

নির্বাচিত সংবাদ