২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ছিল লালডিঙ্গি চপলা আর চঞ্চলা

পদ্মা-গড়াই বিধৌত কুষ্টিয়া জেলার একসময় যোগা-যোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল নৌপথ। তখন পদ্মা, গড়াই ও কুমারসহ প্রবাহিত নদ-নদীগুলোর ছিল ভরা যৌবন। খুব বেশিদিনের কথা নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এ জেলার নদ-নদীগুলো ছিল পানিতে ভরপুর। বর্ষা মৌসুমে এসব নদীর কোন কূলকিনারা খুঁজে পাওয়া যায়নি। চারদিকে ছিল বিস্তৃত পানি আর পানি। ‘নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে’- জনপ্রিয় এই গানের কথাগুলোর মতোই তখন সারা বছরই নদীগুলোতে চলত বাহারী সব রঙের; পাল তোলা ছোট-বড় নানা আকৃতির নৌকা। এসব পাল আবার ছিল লাল, সবুজ, হলুদ ও সাদা রঙের জোড়া দেয়া কাপড়ের তৈরি। চলত গুন টানা বড় বড় নৌকা ও সওদাগরী নৌকা। এসব নৌকায় যাত্রী ছাড়াও দূর-দূরান্তে বহন করা হতো মালামাল। নদীর উপকূল ঘিরে তখন গড়ে ওঠে নৌ-কেন্দ্র। কিন্তু এখন আর সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না। পাল তোলা নৌকাও আজ স্মৃতি। পদ্মাসহ নদ-নদীগুলোতে পানি প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় এবং সড়ক যোগাযোগের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নৌ-কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে বর্তমানে ইঞ্জিনচালিত নৌকার দাপটে পাল তোলা নৌকাও গেছে হারিয়ে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তখন জমিদারীর কাজে কুষ্টিয়ার শিলাইদহে এসে সপরিবারে প্রায় পদ্মা-ভ্রমণে বের হতেন। তাঁর বজরাটির নাম ছিল ‘হাউজ বোট পদ্মা’। এছাড়া আরও তিনটি নৌকা ছিল তাঁর। নাম ছিল ‘লালডিঙ্গি, ‘চপলা’ ও ‘চঞ্চলা’। পদ্মা ছাড়াও তখন বিশ্বকবি ইছামতী, গড়াই ও আত্রাই নদীতেও ঘুরে বেড়াতেন এই নৌকা ও বজরায় চেপে। খেয়া নৌকার মাঝি কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের শহিদুল ইসলাম ছোট বেলা থেকেই কাজ করছেন নৌকায়। একসময় বাবার সঙ্গেও কাজ করেছেন। তিনি জানান, তখন পদ্মা ও গড়াই নদীর বুক চিরে চলাচল করেছে পালতোলা বিচিত্র সব নামের নৌকা। এর মধ্যে ছিল যাত্রী পারাপারের পালতোলা ‘খেয়া নৌকা’, মাছ ধরার ‘ডোঙ্গা নৌকা’, নদীর চর থেকে কৃষকের ঘরে ধান তোলার ‘পালের চারা নৌকা’, বালি টানার ‘ট্যাঙ্কি নৌকা’, দূর-দূরান্তে মালামাল বহনের জন্য ছিল গোলাকৃতি বৃহৎ আকারের ‘হাজার মণী নৌকা’ ছিল বড় বড় ‘গুন টানা নৌকা’। এছাড়াও ছিল বাইস খেলা ‘ছিপছিপে নৌকা’ ছিল বহরে চলা ‘বেদে নৌকা’। তিনি বলেন, এসব নৌকা এখন আর দেখা যায় না। সব বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কুষ্টিয়া শহরের কোর্টপাড়া আজাহার বাগের খন্দকার নূরুল ইসলাম স্মৃতিচারণ করে বলেন, তখন ১৯৩৯-৪০ সাল হবে। গড়াই নদীর তখন ভরা যৌবন। চারদিকে বিস্তৃত পানি আর পানি। গড়াই নদীর বুকে চিরে চলত বাহারী রঙের পালতোলা ছোট বড় নানা আকৃতির নৌকা। তিনি জানান, তখন সড়ক যোগাযোগ তেমন উন্নত না হওয়ায় দূর-দূরান্তে মানুষজনের যাতায়াত ও মালামাল বহনে নৌপথই ছিল একমাত্র মাধ্যম। নূরুল ইসলাম জানান, ১৯৬১ সালের দিকে তিনি ছোট ভাই খায়রুল আনামকে পাবনা জেলার সাতবাড়িয়ার নিশ্চিন্তপুর থেকে বিয়ে করিয়ে বরযাত্রীসহ নৌকায় করে কুষ্টিয়া নিয়ে আসেন। তখন গড়াই নদী ছিল পানিতে পূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে নৌকার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত গড়াই নদীর তীরবর্তী কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়া এলাকার নজরুল ইসলাম জানান, তিন-চার দশক আগের কথা। তখন নদীর পানিতে ভাসত রং বেরঙের পাল তোলা অসংখ্য নৌকা। বাতাসের সাহায্যে এসব নৌকার গতি বাড়াতে ব্যবহার করা হতো ছোট বড় নানা আকৃতির ও নানা বৈচিত্র্যে ভরা পাল। মাঝি-মাল্লারা পাল তুলে নৌকার হাল ধরে বসে থাকত। আর পানির ওপর বাতাসের অনুকূলে ধেয়ে চলত নৌকা। মাঝিদের গলায় তখন থাকত জারি-সারি কিংবা ভাটিয়ালী গানের সুর। সে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। তিনি বলেন, কুষ্টিয়ার কুমারখালী, খোকসা, জানিপুর, মাগুড়া জেলার লাঙ্গলবাঁধ ও ঝিনাইদহ জেলার কাতলাগাড়ী ও খুলুমবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন ব্যবসা কেন্দ্রে ও হাট-বাজারে মালামাল আনা-নেয়া হতো পাল তোলা নৌকায়।

Ñএমএ রকিব, কুষ্টিয়া থেকে