২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পদচারণায় মুখর বিমান বাহিনী জাদুঘর

এমদাদুল হক তুহিন ॥ ‘এইটি বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত বাংলাদেশের প্রথম ভিআইপি হেলিকপ্টার’-একটি বাক্য, তবে এর গভীরতা ও নিহিত অর্থ অনেক! রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ের বিমানবাহিনী জাদুঘরে এমআই-৮ হেলিকপ্টারের জালানার কাচে সাদা কাগজে মোটা অক্ষরে বোল্ট করে এ বাক্যটি লেখা রয়েছে। প্রথমবারে মতো জাদুঘরটিতে প্রবেশ করা দর্শনার্থীকে এ বাক্যটি কাছে টানছে, ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ৭১ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে। যেন সকলের চোখে মুহূর্তেই ভেসে ওঠেন স্বাধীন বাংলার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান। আবেগঘন হয়ে ওঠে হেলিকপ্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষণ। বলতে শোন যায়, বঙ্গবন্ধু কোন সিটে বসতেন? সেটি কি এখানে নেই? শুধু বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিই নয়, মহান মুক্তিযুদ্ধে বিমান বাহিনীর গৌরবময় অবদানের নানা স্মৃতির সমাহারে পরিণত হয়েছে পুরোনো বিমানবন্দর রানওয়ের পশ্চিমে আইডিবি ভবনের বিপরীতে অবস্থিত এ জাদুঘরটি।

পাখা গুটিয়ে অলসে পড়ে থাকা বিমান দিয়ে সাজানো এ জাদুঘরটি চালু হয় গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর। প্রচার প্রচারণা কম থাকলেও দর্শনার্থীর কমতি নেই। দুপুরের পর থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট কেটে তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষ। তাদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এ জাদুঘরটি। তবে সাপ্তাহিক ও সরকারী ছুটির দিনে মানুষের ভিড় অতিমাত্রায় লক্ষ্যণীয়। হুমড়ি খেয়ে পড়েন মানুষ। টিকেটের লাইন মূল রাস্তা পর্যন্ত লম্বা হতেও দেখা যায়। জাদুঘর সূত্রে জানা যায়, জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য আছে ১০টি ফাইটার বিমান, ৫টি ট্রেনিং বিমান, ২টি হেলিকপ্টার, ২টি পরিবহন বিমান, ৩টি রাডার ও একটি ডাকোটা বিমান। এছাড়া শিশু কিশোরদের জন্যে নানা রাইড আয়োজনের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছে ‘চিলড্রেন হেভেন’, যা অনেকটা ছোট্ট শিশু পার্কের মতই।

বৃহস্পতিবার দুপুর দু’টায় বিমানবাহিনী জাদুঘর ঘুরে দেখা যায়, পরিবার পরিজনসহ নানা বয়সের নানা পেশার মানুষের আনাগোনা। চিলড্রেন হেভেনে শিশুরা খেলছে। প্রদর্শনীর জন্যে সাজিয়ে রাখা বিমানে উঠছেন কেউ কেউ, সেলফি ও ছবি তোলায় মত্তও ছিল একদল।

বিমানবাহিনীর জাদুঘরের মূল ফটক দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়বে নিলাদ্রি নামের একটি স্যুভেনির। সেখানে সাজানো আছে বিমান বাহিনীর নানা রকম দ্রব্যাদি। প্রবেশপথের অল্প দূরেই রয়েছে ডিজিটাল ম্যাপ। ঢুকার পথে ডানপাশে রয়েছে বিশালাকার চিল। বাস্তবের না হলে ভাস্কর্জে খচিত প্রতীকী এ চিলের মাধ্যমে আকাশপথে বিমানের ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে চলার কথাই ইঙ্গিত করে।

অল্পদূর এগুলোই চোখে পড়বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যবহৃত এম আই-৮ হেলিকপ্টারটি। যা ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে সংযোজিত হয়। ফলক সূত্রে জানা যায়, রাশিয়ার তৈরি এ হেলিকপ্টারটি বিমানবাহিনীর কাজে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কার্যকারিতা হারানোর ফলে বর্তমানে তা জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্যে উন্মুক্ত রয়েছে। হেলিকপ্টারটির জালানার কাচে সাদা কাগজে মোটা অক্ষরে বোল্ট করে লেখা রয়েছে ‘এইটি বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত বাংলাদেশের প্রথম ভিআইপি হেলিকপ্টার’। উৎসুক দর্শনার্থীরা বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত হেলিকপ্টারটি দেখতে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করেন। সেখানেই কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবিদের সঙ্গে। তিনি বলেন, জাতির পিতা এটি ব্যবহার করেছেন। হেলিকপ্টারের ভেতর প্রবেশের পর কেমন জানি ইতিহাসের গন্ধ আসছিল! বুঝিয়ে বলা যাবে না-এ কেমন অনুভূতি!

বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত হেলিকপ্টারের ঠিক পাশেই রয়েছে ইতিহাসের অপর একটি অংশ এন-২৪ পরিবহন বিমান। যা বলাকা নামেই অধিক পরিচিত। রাশিয়ায় তৈরি এ বিমানটি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে সংযোজিত হয়। বিমানটির পরিচয় দিতে গিয়ে নাম ফলকে কর্তৃপক্ষ লিখেছে, বিমানটি সরকারীভাবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ব্যবহার করতেন। এর যাত্রী ধারণক্ষমতা ছিল ৪৪ জন। দেশের প্রথম পরিবহন বিমান বলাকায় ওঠার সুযোগ রেখেছে কর্তৃপক্ষ, তবে তার জন্যে ৩০ টাকা মূল্যে বাড়তি টিকেটের প্রয়োজন রয়েছে।

অল্প দূরেই অনেকটা বিশাল ডিশের জালির মতো দেখতে পি-৩৫ এম রাডার। ১৯৭৪ সালে বিমানবহিনীতে ঘাঁটি বাশার এর ৭২ নং স্কোয়াড্রনে সংযোজিত হয় এটি। ৩৭০ কি.মি এলাকার মধ্যাকার শত্রু ও মিত্র পর্যবেক্ষণে সক্ষমতা ছিল রাডারটির, যা ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বিমানবাহিনীতে ব্যবহৃত হয়েছে। দর্শনার্থীদের কৌতূহলী চোখ রাডারে একবারের জন্যে হলেও পড়বেই।

সোজা রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে সামনে পড়বে অসংখ্য বিমান। সত্যিকার অর্থে অসংখ্য নয়, জাদুঘরে রয়েছে মোট ২০টি বিমান। তবে প্রবেশ করলে যে কারো মনে হতে পারে এ যেন এক বিশাল রানওয়ে। যে কোন মুহূর্তে আকাশে উড়ে যেতে পারে কোন একটি বিমান, এমনকি রকেটও!

মূল ফটক দিয়ে ঢুকে সোজা রাস্তায় শেষ প্রান্তে পৌঁছুলে তার ঠিক বামেই রয়েছে এয়ারটেক কানাডিয়ান ডিএইচই-৩/১০০ অটার। জানা যায়, ১৯৫২ সালে কানাডায় এ বিমানটি তৈরি হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দক্ষ টেকনিশিয়ান এটিকে বেমারু বিমানে রূপান্তর করেন। যার ফলশ্রুতিতে এ বিমান দ্বারা ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আকাশ থেকে আক্রমণের মাধ্যমে ইস্টার্ন তেল শোধনাগার এবং চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে সফল অভিযান পরিচালিত হয়। বোমারু এ বিমানের ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, টেলিভিশনের মনিটর স্ক্রিনে রকেট মিজাইলসহ আকাশপথের নানা যুদ্ধ দেখানো হচ্ছে। কচি-কাঁচা শিশুরা তা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে। তবে বোমারু এ বিমানেও প্রবেশ করতে ৩০ টাকা মূল্যের বাড়তি টিকেটের প্রয়োজন হয়।

একটি পোশাক কারখানায় মার্চেন্ডাইজার হিসাবে কাজ করেন সিবনাথ মজুমদার। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ৭ বছরের শিশু সন্তান সুচেতা মজুমদার সিঁথিকে নিয়ে এসেছেন তিনি। দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া সিঁথির সঙ্গে বোমারু বিমানের ভেতর কথা হলে শিশুটি জানায়, খুব ভাল লাগছে। মজা করছি, মজা পাচ্ছি। বাক্য দু’টি শেষ হওয়ামাত্রই লজ্জা পেয়ে শিশুটি আর কথা বাড়ল না। তবে কথা বললেন তার পিতা। জাদুঘরে প্রবেশের টিকেট ছাড়াও বোমারু বিমানসহ কয়েকটি বিমানে চড়তে আলাদা টিকেট কাটার বিধান থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সিঁথির বাবা সিবনাথ জনকণ্ঠকে বলেন, জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে শিশু কিশোরদের পরিচয় করিয়ে দিতে। সেবা প্রদানের লক্ষ্যই এর মূল কারণ; ব্যবসা নয়। বিমানের ভেতরে চড়তে আলাদা টিকেট কাটতে হয়, এর মূল্য অতি বেশি। অনেকের জন্যে এটা অল্প হলেও অধিকাংশই বিমানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারছে না।

ঈদের ছুটিতে অনেকের হাতে এখনও ঢের সময়। আর তাদেরই একাংশ সময় কাটাতে ছুটছেন বিনোদন কেন্দ্রে। প্রকৃতির আবহে নিজেকে ভাসিয়ে দেয়ার পাশাপাশি ইতিহাসের অংশও পরখ করে দেখছেন। নিজেরা দেখার পাশাপাশি ইতিহাসের স্মৃতিবিজড়িত অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন সন্তানকে। ঠিক তেমনই এক পরিবার জুয়েল ও তানিয়া দম্পত্তি। শিশু সন্তান তন্ময়কে নিয়ে ঘুরতে এসেছিলেন জাদুঘরে। ডাকোটা বিমানে চড়ে মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ছবি উঠিয়েছেন সন্তানের সঙ্গে। এ পরিবারে সঙ্গে সেখানেই কথা হয়। পরিবারে কর্ণধার জুয়েল আনন্দ মিশ্রিত মুখে জনকণ্ঠকে বলেন, বলাকা বিমানটিতে বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট তাজ উদ্দিন আহমেদ উঠেছেন। সেখানে সন্তানকে নিয়ে চড়েছি। বাবুতো খুব খুশি। এমনকি আমিও। আর তাদের শিশু সন্তান তন্ময় মুচকি হাসি দিয়ে বলে, বাবা আরেকটা ছবি। এ সময় মা তানিয়ার চোখেমুখেও ছিল ঈদ আনন্দের খুশি খুশি ভাব।

নাম প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করে জাদুঘর রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত এক কর্মকর্তা বলেন, বিমানগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে আলাদা করে বিমান বাহিনী থেকে লিস দেয়া হয়েছে। ফলে প্রবেশ মূল্য ছাড়াও বিমানে ওঠার জন্যে আলাদা মূল্য পরিশোধ করতে হয়ে।

প্রবেশ মূল্য ছাড়াও বিমানে ওঠতে আলাদা মূল্য পরিশোধ ব্যতীত দর্শনার্থীদের অন্য কোন অভিযোগ নেই। নির্মল বিনোদন পাওয়ার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ইতিহাসের অংশ ছুঁয়ে দেখতে পেরে কিংবা স্মৃতির পাতায় লিপিবদ্ধ করতে পেরে অনেকেই আনন্দে আত্মহারা। সব মিলিয়ে জাদুঘরটি এখন যান্ত্রিক নগরীর অন্যতম বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।