২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বেহাল দশার সড়ক আর যানজটে নাকাল অন্তহীন সমস্যার নগর রংপুর

মানিক সরকার মানিক, রংপুর ॥ অন্তহীন সমস্যায় রংপুর মহানগর। স্বস্তিতে নেই মহানগরবাসী। এছাড়া সিটি কর্পোরেশন ঘোষণার আগে যেসব ইউনিয়নকে নিয়ে বর্ধিত সিটি করা হয়েছে, ওই সব এলাকার মানুষের দুর্ভোগ আরও চরমে। সুযোগ-সুবিধা একবিন্দুতো বাড়েইনি বরং তাদের ওপর আরোপিত হয়েছে নতুন করে সিটি কর আর বন্ধ হয়ে গেছে আগে ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে কাবিখা, টাবিখা, কর্মসৃজনসহ সরকারী দারিদ্র্যতা দূরীকরণ কর্মকা-। এতে চরম বেকায়দায় পড়েছে নগরীর বর্ধিত এলাকার ওই সব মানুষ।

মাত্র চার বর্গকিলোমিটার এলাকা আর সাত হাজার জনসংখ্যা নিয়ে ১৮৬৯ সালে যাত্রা শুরু করেছিল রংপুর মিউনিসিপ্যালিটি। কালের বিবর্তনে তা ২০১২ সালের জুলাইয়ে ২০৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে সিটি কর্পোরেশনে রূপ নিয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় এখন মোট জনসংখ্যা প্রায় সাত লাখ। কিন্তু বাড়েনি বিন্দুমাত্র নাগরিক সুযোগ-সুবিধা। সম্প্রতি নগরীর সড়কসমূহ চার লেনে উন্নীত করা হলেও বাড়েনি জনগণের সহজ পথচলা। মহানগরবাসীর সবচেয়ে বড় দুঃখ-কষ্ট ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার দৌরাত্ম্যের কারণে নগরীর যানজট। কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না এসব রিক্সাকে। ফলে নগরীতে পথচলা দায় হয়ে পড়েছে। অটো মালিক-চালক এবং কতিপয় ব্যবসায়ীর কারণে কোনভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না এর অবাধ বিচরণ। নগরবাসীর বাড়তি জ্বালা এই অটো নিয়ে সিটি মেয়র এবং পুলিশ প্রশাসন বহুবার নানা উদ্যোগ নিলে তারাও ব্যর্থ হয়েছেন ওই চক্রের কাছে। ফলে প্রশাসনসহ নগরবাসী জিম্মি এখন তাদের কাছে। অদক্ষ অপ্রশিক্ষিত এমনকি ক্ষৌরকার, চর্মকার, আর ফুটপাথের চা দোকানি থেকে শুরু করে বেকার বখাটে নেশাখোরেরাও বাড়তি কাঁচা পয়সার আশায় এখন এর চালক। এতে একদিকে যেমন নগরময় সৃষ্টি হয়েছে স্মরণকালের মহাযানজটের, অন্যদিকে মানুষজনকে চলাচল করতে হচ্ছে জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে। অদক্ষ চালকদের চালনায় গত দেড় বছরে নগরীতে তিন শিশুসহ ঝরে গেছে চারটি তাজা প্রাণ। প্রতিনিয়তই ঘটছে ছোটবড় দুর্ঘটনা।

নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ছাড়াও পাড়া মহল্লার অলিগলির অধিকাংশ সড়কই এখন খানাখন্দে ভরে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ঈদকে সামনে রেখে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে রাবিশ ফেলে সাময়িকভাবে সেসব খানাখন্দ বন্ধ করার চেষ্টা করা হলেও বৃষ্টির কারণে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসছে। এটাতো গেল পুরাতন পৌর এলাকার সড়কসমূহের অবস্থা। এছাড়া তিন বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও বর্ধিত এলাকাগুলোয় এখনও তৈরি হয়নি এক ইঞ্চি পাকা সড়ক। ফলে এই বর্ষা মৌসুমে কাদামাটিতে নাকাল হতে হয় দুর্ভাগা নতুন নগরবাসীদের। মহানগর লাগোয়া অনেক গ্রামেই এখনও স্থাপন করা হয়নি বিদ্যুত সংযোগ। ফলে একদিকে যেমন প্রচ- গরমে বিদ্যুতবিহীন চরম কষ্টে জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে আলোর অভাবে লেখাপড়া থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা। এলাকাবাসীরা বলছেন, এটি এক ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। এ অবস্থা মহানগরীর অন্তত দুই শ’ গ্রামের কয়েক লাখ মানুষের। এ সব সমস্যার কথা অবলীলায় স্বীকার করে সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর নাজমুন নাহার নাজমা এবং নজরুল ইসলাম নজু জানালেন, তারা এখন অসহায়। না পারছেন এলাকাবাসীর মন যোগাতে, না পারছেন উন্নয়ন করতে। এ অবস্থায় অনেকটাই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। নগরীর ৯নং ওয়ার্ডের মনাদর গ্রামের ফটো সাংবাদিক ফুলন চক্রবর্তী, কৃষিজীবী সাগর মিয়াসহ অনেকেই জানান, সিটি করপোরেশন হওয়ার আগেই তারা ভাল ছিলেন। এখন তাদের উচ্চহারে কর দিতে হয়, যা আগে ছিল না। শুধু তাই নয়, আগে ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে থাকায় নিয়মিত টিআর কাবিখাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। সিটি কর্পোরেশন হওয়ায় সেসবও বন্ধ হয়ে গেছে। তারা জানান, মাত্র পাঁচটি বিদ্যুতের পিলার স্থাপন করা হলেই তাদের মনাদর গ্রামসহ আশপাশের বেশকিছু এলাকায় বিদ্যুত সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব। এ বিষয়ে বারংবার পল্লী বিদ্যুতের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও ব্যবস্থা নেয়নি তারা।

এ সব বিষয়ে নগরপিতা মুক্তিযোদ্ধা সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু নিজেও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ৫২ বর্গকিলোমিটারের রংপুর পৌরসভাকে ২০৭ বর্গকিলোমিটারে উন্নীত করে সিটি কর্পোরেশন করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দেশী-বিদেশী বিশেষ সহযোগিতা ছাড়া বর্ধিত অংশে উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। নগরীর যানজট প্রসঙ্গে তিনি জানান, কতিপয় মালিক-চালক এবং ব্যবসায়ীর কাছে তারা জিম্মি। ঈদের আগে নগরকে যানজটমুক্ত রাখার জন্য সিটি কর্পোরেশন এবং জেলা পুলিশ যৌথভাবে অটোরিক্সাকে নগরীতে ঢুকতে না দেয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ শুরু করলেও ওই মালিক চালক এবং কতিপয় ব্যবসায়ীর জন্য সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, এতবড় এই সিটি কর্পোরেশনের সমস্যা মাস্টার প্ল্যান করে সরকারী সহায়তার মাধ্যমেই দূরীকরণ সম্ভব। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং নিজে রংপুরকে সাজিয়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন এবং তিনি তা করবেন এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে এজন্য নগরবাসীর কাছে কিছুটা সময় চেয়ে নেন।

নির্বাচিত সংবাদ