২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তাগাছার বিনোদবাড়ি মানকোন গণহত্যা

  • বাবুল হোসেন

২ আগস্ট ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার মানকোন বিনোদবাড়ি গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্থানীয় রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় পাকসেনারা মুক্তাগাছার মানকোন, বিনোদবাড়ি, দড়িকৃষ্ণপুর ও কাতলসার এই চার গ্রামের নারী ও শিশুসহ ২৫৩ বাঙালীকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। এর মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা নারীও ছিল। দড়িকৃষ্ণপুর গ্রামের বলবাড়িতেই হত্যা করা হয়েছিল একসঙ্গে ১৮ জনকে। গুলিবিদ্ধ হন অনেকে। স্বাধীনতার ৪৪ বছরে গণহত্যার এসব বধ্যভূমি শনাক্ত হলেও শহীদদের নামফলকসহ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভের নামে যা করা হয়েছে, তা হাস্যকর ও শহীদদের প্রতি অবমাননার শামিল। এছাড়া সেদিনের নিধনযজ্ঞ থেকে যারা প্রাণে বেঁচেছিলেন তাদের খোঁজ নেয়নি কেউ। এমনকি শহীদ পরিবারের সন্তান হিসেবে কারও স্বীকৃতিও মেলেনি। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ ও হতাশ অনেকে। দড়িকৃষ্ণপুর গ্রামের শহীদ পরিবারের সন্তান গুলিবিদ্ধ প্রত্যক্ষদর্শী জবান আলী (৭০) আক্ষেপ করে জানান, তঁাঁর পরিবারেই সেদিন শহীদ হন সাতজন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বধ্যভূমি শনাক্ত করে তাতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ সেই স্মৃতিস্তম্ভে শহীদদের কারও নাম তালিকায় না থাকলেও শ্বেতপাথরে বসানো রয়েছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য কেএম খালিদ বাবুর নাম! মুক্তাগাছার মানকোন বিনোদবাড়িসহ চার গ্রামের গণহত্যার সবকটি বধ্যভূমিতেই এরকম হাস্যকর নামফলক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

একাত্তরে পাকসেনাদের নারকীয় বর্বরতার প্রত্যক্ষ সাক্ষী দড়িকৃষ্ণপুর গ্রামের গুলিবিদ্ধ সত্তরোর্ধ নূর বানু বেওয়া এখনও সেদিনের নিষ্ঠুরতার কথা স্মরণ করে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। মনের অজান্তে গড়িয়ে পড়া চোখের জল মোছেন শাড়ির আঁচলে। তারপরও একাত্তরে স্বামীহারা শহীদ পরিবারের সদস্য নূর বানু বেওয়া বেঁচে যাওয়া সন্তানদের বুকে আঁকড়ে পাড়ি দিয়েছেন দীর্ঘ ৪৪ বছর। এ সময়ে শহীদ পরিবারের সদস্য কিংবা গুলিবিদ্ধ হিসেবেও কেউ খোঁজ নেয়নি তার। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সরকার মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার-পরিজনের জন্য অনেক কিছুই করছে। অথচ মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করার জন্য কিংবা আওয়ামী লীগ করার কারণে যারা শহীদ হয়েছে, স্বামী, সংসার, ঘরবাড়ি হারিয়েছে, গুলি খেয়েছেÑ তারা কিছুই পায়নি। মেলেনি প্রাপ্য মর্যাদাও। এ নিয়ে হতাশ গুলিবিদ্ধ এ নারী।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে স্থানীয় রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় পাকসেনারা মুক্তাগাছার গোটা বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামে নির্বিচারে গুলি করে মহিলা, শিশু ও সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যসহ অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যার পর অগ্নিসংযোগ করে গ্রামের বহু ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয়। একাত্তরে এটিই ছিল একদিনে মুক্তাগাছায় সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনা। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, একদিনে হত্যা করা হয়েছিল ২৫৩ জনকে।

সেদিন ছিল ১৫ শ্রাবণ, ২ আগস্ট, সোমবার-১৯৭১ সাল। মুক্তাগাছার বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামের অনেক নিম্নাঞ্চলের চারদিকে পানিতে থৈথৈ অবস্থা। মাঠভর্তি আউশ ধান ও পাটের আবাদ। অনেক বাড়িতে পানের বরজ। মুক্তাগাছা থানা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের বড়গ্রাম ইউনিয়নের গ্রাম বিনোদবাড়ি, মানকোন, দড়িকৃষ্ণপুর ও কাতলসার। মুক্তাগাছা জামালপুর সড়কের চেচুয়ার পথে ‘দড়িকৃষ্ণপুর’ এই মানকোন গ্রামেরই একটি পাড়া। ঘড়ির কাঁটা তখন বেলা ১০টা। মারাত্মক সর্দি জ্বরে আক্রান্ত তিন মাসের শিশুপুত্রকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন গৃহবধূ নূর বানু। এরই মধ্যে খবর রটে পাক আর্মি আসছে। অনেকের মতো নূর বানু স্বামীর সঙ্গে সন্তানদের নিয়ে ঘরের ভেতর আশ্রয় নেন। স্থানীয় রাজাকার জবেদ মুন্সি ২ পাক আর্মি নিয়ে বাড়িতে ঢোকে নূর বানুর স্বামী রহমত আলী ও দেবর মোতালেবকে ডেকে বাড়ির উঠানে নিয়ে আসে। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাক আর্মি গুলি করে লাশ ফেলে দেয় উঠানে। ভয়ে জড়সড় নূর বানুর ভাসুর কোরান শরীফ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাকেও গুলি করে হত্যা করে পাক আর্মি। চোখের সামনে স্বামী ভাসুর ও দেববের ওপর নির্মম গুলি ও পরে তাদের রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকার দৃশ্য দেখেও শিশুপুত্র ও দু’কন্যাকে আগলে ধরে ঘরের ভেতর লুকিয়ে থাকেন নূর বানু। এ সময় বাড়ির মহিলাদের চুলের মুঠি ধরে টেনেহেঁচড়ে বাইরে এনে বুকে, পেটে ও পিঠে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে পাক আর্মি লাশ ফেলে রাখে উঠানে। একপর্যায়ে পাক আর্মিরা ঘরে ঘরে তল্লাশির সময় ধরে ফেলে নূর বানুকে। এক হাতে তিন মাসের শিশুপুত্র, আরেক হাতে পবিত্র কোরান শরীফ। এর আগেই কুমারী দু’কন্যা মাকে ছেড়ে লুকিয়েছিল ঘরের এক কোণায়। রাজাকার জবেদ মুন্সি কোলের শিশুকে বিছানায় শুইয়ে বাইরে আসার কথা বললে নূর বানু শিশুকে নিয়েই বাইরে আসে। অনেকের সঙ্গে নূর বানুকে বাড়ির দু’ঘরের মাঝখানের ফাঁকে এক লাইনে দাঁড় করায় গোটা বাড়ির মহিলা ও শিশুদের। ভয়ে অনেকের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। অনেকে কাঁদছিল হাউমাউ করে। কেবল শিশুরা ছিল নির্বাক, ভয়শূন্য। নূর বানু লাইনে সবার সামনে। পাক আর্মি গুলির জন্য বন্দুকে চাপ দিচ্ছেÑ এ সময়ই কিছুটা নিচু হয়ে এক লাফে ফের ঘরের ভেতর গিয়ে উঠে নূর বানু। কিন্তু তারপরও নূর বানুর পিঠ গুলির আঘাতে রক্তাক্ত জখম হয়। পাক আর্মিদের গুলিতে সেদিন এই বাড়ির ১৮ জন শহীদ হন। গুলিবিদ্ধ লাশগুলো যখন রক্তের ওপর দাপাদাপি করছিল, তখনও পাক আর্মিদের গুলি চলছিল অনবরত। আর এই ফাঁকেই ঘরের পেছনের বেড়া ভেঙ্গে তিন সন্তানকে নিয়ে আউশ ধান ক্ষেতে লুকিয়ে থাকেন নূর বানু সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধার পর বাড়ি ফেরে রক্তে ভাসা এসব স্বজনের লাশ দেখে নির্বাক ও নিথর হয়ে পড়েন নূর বানু। প্রতিবেশী কমলা ও সুরুজের বাপ রাতভর লাশ পাহারা দিয়ে রাখেন। পরদিন গোসল, কাফন ও জানাজা ছাড়াই গণকবরে পুঁতে রাখা হয় ১৮ শহীদের লাশ।

জাতীয় সংসদের জাতীয় পার্টির সাবেক স্পীকার ও মুসলিম লীগের সাবেক নেতা মরহুম শামসুল হুদা চৌধুরীর মুক্তাগাছার বিনোদবাড়ি গ্রামের বাড়িটি ছিল একাত্তরে অনেকের নিরাপদ ও ভরসার আশ্রয়স্থল। হিন্দু মালিকের কাছ থেকে কেনা ‘বলের বাড়ি’ নামে পরিচিত এই বাড়িতে তখন থাকতেন শামসুল হুদার ভাই আলী আকবর মুক্তার। পাক আর্মি আসছে খবর পেয়ে এলাকার মহিলা ও শিশুরা আশ্রয় নিয়েছিল এই বলের বাড়িতে। বিনোদবাড়ি গ্রামের জবান আলী (৭৫) জানান, রাজাকার হাক্কু ও আমজাত পাক আর্মিদের কাছে এই বলবাড়িতে মহিলা ও শিশুদের আশ্রয় নেয়ার কথা বলে দেখিয়ে দেয়। পাক আর্মিরা বাড়ির ভেতর থেকে মহিলা ও শিশুদের বাইরে এনে এক কাতারে দাঁড় করায়। এর মধ্যে প্রতিবেশী ম-ল পরিবারের নবীজান, কন্যা জুলেখা (২), মালেকা, কন্যা ফেরদৌসী (৪), রহিতন, বোন খালেতন ও কন্যা হামিদা (৩) এই সাত সদস্য ছিল। পাক আর্মিদের গুলিতে সেদিন এই বলবাড়িতে তিন শিশুসহ ১৭ মহিলা শহীদ হন। সেদিন রাজাকার ও পাক আর্মিদের বন্দুকের নল থেকে বরাত গুণে বেঁচে যাওয়া জবান আলী আরও জানান, বলবাড়িতে এই হত্যাকা-ের পর মহিলা ও শিশুদের নাড়িভুঁড়ি ছিটকে গাছের ডালে ও ঘরের বেড়ায় ঝুলে ছিল। গোসল ও কাফন ছাড়াই পরনের রক্তাক্ত কাপড়ে ১৭ জনকে সেদিন এক কবরে পুঁতে রাখা হয়। স্থানীয়রা জানান, হিন্দু বাড়ি আক্রমণ করে পাক আর্মি এদিকে আসছে খবর পেয়ে পালাতে গিয়ে রাজাকার ও এক পাক আর্মির একদম সামনে পড়ে যান জবানসহ মুসলিম লীগের রহমত, খালেক ও মতোলা এ চারজন। প্রথমেই জবানের সঙ্গীয় তিন মুসলিম লীগার পাক আর্মি ও রাজাকারের কাছে চলে গেলে একা হয়ে পড়েন জবান আলী। রাজাকার জবেদ মুন্সি চিনিয়ে দেয় জবানকে। এ সময় পাক আর্মির কাছ থেকে তিন দফা বন্দুক কেড়ে নেন জবান। কিন্তু গুলি চালাতে না পারায় ফের কেড়ে নেয় পাক আর্মি। এক পর্যায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি চালালে জবান পড়ে যান মাটিতে। মৃত ভেবে জবানকে ফেলে পাক আর্মি চলে গেলে ঘাটুরিয়া মামার বাড়িতে পৌঁছে চিকিৎসা নেন গুলিবিদ্ধ জবান।

এই গ্রামেরই হাফিজা খাতুন (৫৯) জানান, পাক আর্মিদের ভয়ে অনেকের সঙ্গে স্বামী কুমেদ আলী আশ্রয় নিয়েছিলেন স্থানীয় বাইয়া বিলে। পাক আর্মিরা সেখানে গিয়ে গুলি চালিয়ে হত্যা করে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে। খবর পেয়ে পরদিন বাইয়া বিলের শত লাশের স্তূপ থেকে শহীদ স্বামীর লাশ নিয়ে বাড়িতে আসেন হাফিজা। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৪ বছরেও এই শহীদ পরিবারের কেউ খোঁজ নেয়নি বলে অভিযোগ হাফিজার। পাক আর্মিরা একই দিন সামনের উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে কাতলসার গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে ধরে নেয় ২৮ জনকে। এর মধ্যে এক বাড়ির ছিল সাতজন। রাজাকার করিম মুন্সির সহায়তায় পাক আর্মিরা সেদিন ২৮ জনকে ধরে নিয়ে স্থানীয় কৈয়ার বিলপাড়ে জড়ো করে বসিয়ে রাখে। তাঁদের পাহারায় থাকে রাজাকার করিম মুন্সি ও অজ্ঞাত আরেক রাজাকার। এ সময় পাক আর্মিরা কাতলসার গ্রামের বাড়ি বাড়ি অগ্নিসংযোগ করে পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে ছারখার করার পর ২৮ জনকে এক লাইনে দাঁড়াতে বলে। ভয়ে এ সময় অনেকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। এরই মধ্যে গুলি চালায় পাক আর্মি। গুলির আগে লাইনে থাকা শহীদ মন্নেছ আলী পাক আর্মিদের অনুরোধ করে দু’রাকাত নামাজ আদায়ের সুযোগ পেয়েছিলেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে যারা দাপাদাপি করছিল পাক আর্মিরা কেবল তাদেরই বার বার গুলি করে ঝাঁজরা করছিল। এতে যাদের গুলি লাগেনি তারা মরার ভান করে পড়ে থেকে সেদিন প্রাণে বেঁচে যান। সেদিন পাক আর্মিদের গুলিতে কৈয়ার বিলপাড়ে শহীদ হন ১৪ জন। এদের সাতজনকে কাতলসার শহীদস্মৃতি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ও অপর সাতজনকে বিলপাড়েই গণকবর দেয়া হয়। বরাত গুণে সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যান মাহমুদ (৬২), সোহরাব, সিদ্দিক, ওয়াহেদসহ ১৪ জন। এসব হত্যাযজ্ঞের আগে পাক আর্মিরা বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামে পাকিস্তানী বর্বরতার সূচনা করেছিল হিন্দু সংখ্যালঘু জীতেন্দ্র প্রসাদ ঠাকুরবাড়ি আক্রমণের মধ্য দিয়ে। এই গ্রামের অরুণ চন্দ্র দাস (৬৪) ও শহীদ পরিবারের সদস্য কায়া রানী দে (৭২) জানান, পাক আর্মিরা গ্রামে ঢুকেই প্রথমে ব্রাশফায়ার ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে। বাড়ি বাড়ি খুঁজে লোকদের ধরে এনে ঠাকুরবাড়ির সামনে জড়ো করে। পরে রাজাকাররা বেছে বেছে কয়েকজনকে ছেড়ে দেয়। ঠাকুরবাড়ির যতীন্দ্র কুমার রায়, দিলীপ কুমার ঠাকুর, নারায়ণ কুমার দে ও জীতেন্দ্র প্রসাদ ঠাকুর এ চারজনকে এক কাতারে গুলি করে হত্যা করে। পড়ে থাকায় নারায়ণের লাশ খেয়ে ফেলে শেয়াল কুকুরে। এই গ্রামের কাশেম আলী (৬৯) জানান, তার বাবা শহীদ আজগর আলী ও ভাই উসমানকে ক্ষেতে হালচাষ করা অবস্থায় পাক আর্মিরা গুলি করে হত্যা করে। বীরমুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য তাজ উদ্দিন (৬৭) জানান, ময়মনসিংহ থেকে সরাসরি পাক আর্মি স্থানীয় রাজাকার নঈম উদ্দিন মাস্টার, জবেদ আলী মুন্সি, করিম ফকির, আতিকুর রহমান, আবদুস সালাম, নজর আলী ফকিরের সহাতায় বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামে ঢোকে সকাল ৮টায়। ১০০-১৫০ পাক আর্মি ৮টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে হামলে পড়ে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রামে। অগ্নিসংযোগের সঙ্গে চলে নির্বিচারে গণহত্যা। বিনোদনবাড়ি মানকোন থেকে সকালে শুরু হওয়া এ বর্বরতা চলে মানকোন, দড়িকৃষ্ণপুর, বনবাড়িয়া, কাতলসার, মীর্জাকান্দা, কৈয়ার বিলপাড় ও বাইয়া বিলের পাড়ের প্রায় চার কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল কাশেমের (৬০) দাবি, একদিনে সকাল-বিকেলের এ নিষ্ঠুর বর্বরতায় শিশু ও মহিলাসহ ২৫৩ জন নিরীহ মানুষ শহীদ হন। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান সাবেক এমপি মৃত কেরামত আলী তালুকদারের পরামর্শে মুক্তাগাছা থানা সদরের রাজাকার ও আলবদর কমান্ডার দু’সহোদর চান ও সুরুজ এসব হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগে পাক আর্মিদের সহায়তা দেয়। মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকারদের বিচার শুরুর আগেই স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার সহায়তায় এলাকা ছেড়ে মানিকগঞ্জে পালিয়ে যায় রাজাকার কমান্ডার চান। রাজাকার আলবদরদের ক্যাম্প ছিল মুক্তাগাছা থানা সদরের বড়মসজিদ সংলগ্ন দু’তলায় ও মাড়োয়াড়ি পট্টিতে। একাত্তরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ ও চেতনা বিকাশ কেন্দ্র, মুক্তাগাছার আহ্বায়ক খোন্দকার আবদুল মালেক শহীদুল্লাহ জানান, বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামের শহীদদের তালিকা তৈরির পাশাপাশি বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে।