১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শ্রদ্ধাঞ্জলি ॥ আশেক আলী খান শিক্ষাসেবী ও গ্রামোন্নয়নের কর্ণধার

  • নীলুফার বেগম

পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ আছেন যাঁরা ক্ষণজন্মা, ত্যাগী ও ব্যতিক্রমধর্মী। তাঁরা নিজের সুখ ও আরাম-আয়েশের চেয়ে পরের উপকার, বিশেষ করে নিজ এলাকাবাসীর জন্য কল্যাণকর কাজ করতে পছন্দ করেন ও ভালবাসেন। তেমন একজন ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন মরহুম আশেক আলী খান, চাঁদপুর জেলার প্রথম মুসলমান গ্র্যাজুয়েট (বাংলা একাডেমি, চরিতাভিধান, পৃঃ সংখ্যা-৭৬)। তাঁর জন্ম হয় ১৮৯১ সালে চাঁদপুর জেলার গুলবাহার গ্রামের একই বাড়ির দাদা ও নানার অভিন্ন পরিবারের ভরা সংসারে। তখন গুলবাহার গ্রাম গোয়ালভাওর নামে পরিচিত ছিল। তাঁর পিতার নাম আইনউদ্দিন খান ও মাতার নাম আলেকজান বিবি ওরফে টুনি বিবি। তিনি ১৯১১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চাঁদপুর বাবুরহাট হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাস করেন। এই প্রেক্ষিতে উল্লেখ্য, ১৯১০ সালে সর্বপ্রথম ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার প্রচলন হয় ব্রিটিশ ভারতে। ওই স্কুলে পড়াকালীন তাঁর ক্লাসে তিনিই একমাত্র মুসলমান ছাত্র ছিলেন এবং ক্লাসে সবার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করতেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ১৯১৩ সালে পাস করেন ইন্টারমিডিয়েট। এরপর ঢাকা কলেজে ইংরেজীতে অনার্সে ভর্তি হন। কিন্তু আর্থিক সঙ্কটে অনার্স কোর্স শেষ করতে পারেননি। পড়ায় বিরতি দিয়ে পর পর দুটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। পরে কলকাতায় সিটি কলেজে বিএ ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিএ পাস করেন।

সে সময় বিএ পাস হিসেবে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি পাওয়া লোভনীয় হওয়া সত্ত্বেও তিনি শিক্ষকতাকে বেছে নিলেন পেশা হিসেবে। বিটি পড়ে ফার্স্ট ক্লাস পেলেন ১৯১৯ সালে। প্রথমে চাঁদপুর গনি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করলেন। এই স্কুলের সরকারী মঞ্জুরি তিনি করিয়েছিলেন তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের সভাপতি স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মাধ্যমে। তখনকার দিনে স্কুলের সরকারী মঞ্জুরি পাওয়াটা ছিল কঠিন ও দুরূহ ব্যাপার। তিনি এই দুরূহ কাজটি সমাধা করে ওই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির কাছে আরও সুপরিচিত হলেন। সেইসঙ্গে শিক্ষা বিস্তারে তাঁর ধীশক্তি প্রমাণ করলেন। এরপর সাব-ইন্সপেক্টর অব স্কুল হিসেবে বৃহৎ বাংলার আনাচে-কানাচে ঘুরে শিক্ষাক্ষেত্রে অনগ্রসরতা ও সাধারণ লোকের আর্থ-সামাজিক করুণ অবস্থা স্বচক্ষে দেখেন। পরে সাব-ইন্সপেক্টরের চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষকতা করেন ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বরিশাল জিলা স্কুলে ও সর্বশেষ ঝালকাঠির সরকারী স্কুলে। শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তিনি এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থার সঙ্গেও নিবিড়ভাবে পরিচিত হলেন।

এক সময় তাঁর ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শেষ করে চাকরি-বাকরি নিয়ে শহরে বাস করতে শুরু করলেন। তিনি পারিবারিক-সাংসারিক দায়িত্ব পালনের পর অবসর জীবনযাপনের চিন্তা না করে দৃষ্টি ফেরালেন নিজের গ্রামের দিকে। ছেলেমেয়েরা তাঁকে শহরে নিজেদের কাছে যতœ-আত্তির মধ্যে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারলেন না। তিনি নিজ গ্রামের উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কাজে উঠে-পড়ে লাগলেন যুবকের ন্যায় অমিত তেজে। এরপর নিজ গ্রামে, নিজ বাড়িতে প্রথমে প্রাইমারী স্কুল, পরে আশেক আলী খান হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন নিজের ধন-সম্পদ, জায়গা-জমি ও শ্রম দিয়ে। ১৯৬৫ সালে এই স্কুল সরকারী অনুমোদন পায়। এই স্কুল প্রতিষ্ঠার পেছনে তিনি বহু আত্মত্যাগ করে স্থানীয় লোকজনকে শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই কাজটি ছিল ভীষণ কষ্টকর ও দীর্ঘস্থায়ী। তাঁর স্থাপিত আশেক আলী খান হাইস্কুল হতে তাঁর জীবিতাবস্থায় বহু ছেলেমেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পায়। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে স্থানীয় লোকদের উদ্বুদ্ধ করে যে শিক্ষার আলো তিনি জ্বালিয়েছিলেন তা সত্যিই শ্রদ্ধার উদ্রেক করে। তৎকালীন এই বিষয়ে তাঁকে যথেষ্ট বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তবুও তিনি থেমে থাকেননি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আশেক আলী খান প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় শুধু গুলবাহার নয়, কচুয়া থানার নামী স্কুল, এমনকি এটা বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে একটি উন্নত গ্রামীণ স্কুল। আশেক আলী খান সাহেব শুধু স্কুলই প্রতিষ্ঠা করেননি, স্কুলের ছেলেমেয়েদের সুবিধার জন্য তাঁরই প্রচেষ্টায় কচুয়া থানায় মাধ্যমিক পরীক্ষার কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল। বর্তমানে তাঁর স্থাপিত স্কুলেও মাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। শিক্ষা বিস্তার ছাড়াও যোগাযোগের জন্য তাঁর একান্ত প্রচেষ্টায় গুলবাহার গ্রামে স্কুলের পাশে ডাকঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাস্তাঘাট উন্নয়নের ব্যবস্থা করেছেন। ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত রাখার জন্য মসজিদ গড়েছেন। হাঁস-মুরগি পালনের জন্য উন্নত পদ্ধতি, কৃষিক্ষেত্রে ভাল ফলনের জন্য বিভিন্ন জৈবসারের ব্যবহার, উন্নতমানের বীজের সরবরাহ, পল্লী বিদ্যুত আনয়ন, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, রাস্তার পাশে গাছ রোপণ, মৎস্য চাষে উদ্বুদ্ধকরণ, স্বাস্থ্য সচেতনতাÑ এ সবই সরকারী আয়োজনের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের কাছে যাতে সহজে পৌঁছায় সে ব্যবস্থাও তিনি করেছেন।

আশেক আলী খান সাহেবের চার মেয়ে ও চার ছেলে এবং তাঁদের নাতি-নাতনির সবাই জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং সমাজে স্ব স্ব কর্মকা-ে সুপরিচিত। নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাসেবী, গ্রামপ্রেমিক, সমাজ সংস্কারক ও মানবদরদি আশেক আলী খান ১৯৭৪ সালের ২ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাঁর আরাধ্য কাজ এগিয়ে চলে সুযোগ্য সন্তানদের সহায়তায়। এ প্রেক্ষিতে তাঁর তৃতীয় পুত্র ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের গ্রামোন্নয়নের অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে ১৯৮৫ সালে আশেক আলী খান হাইস্কুলকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সাহায্যে আরও উন্নত স্কুলে পরিণত করেছেন। এটি কলেজে সম্প্রসারিত হয়েছে ১৯৯৪ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়েও রূপান্তরিত হবে সামনে। বর্তমানে আশেক আলী খান হাইস্কুল চট্টগ্রাম বিভাগের একটি বিশিষ্ট আদর্শ গ্রামীণ স্কুল ও কলেজ হিসেবে উন্নত স্কুল-কলেজের প্রায় সব রকম উপকরণসহ শিক্ষার উজ্জ্বল বর্তিকা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তাছাড়া কচুয়া থানায় পৌরসভাসহ নানাবিধ ক্ষেত্রে উন্নয়নের জোয়ার এনেছেন তাঁর পুত্র ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর। পাঠক, আপনারা কেউ চাঁদপুর জেলার কচুয়া থানায় যাওয়ার সুযোগ পেলে একটু পশ্চিমে এগিয়ে গিয়ে আশেক আলী খান হাইস্কুল ও কলেজ দেখে আসবেন, যেখানে শিক্ষার অনির্বাণ শিখা জ্বলছে। স্কুল-কলেজের কাছেই নিজ বাড়িতে চিরনিদ্রয় শায়িত রয়েছেন গ্রামবাসীর আপনজন সেকালের ইংরেজী জানা বাঙালী সাহেব আশেক আলী খান।

লেখক : সাবেক যুগ্ম সচিব