২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ নিষ্ঠুর নির্মমতা

  • বিশ্বজিত রায়

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করা তার সহজাত অভ্যাস। নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক, রীতিনীতি, আচার-আচরণ, সুষ্ঠু জ্ঞান-বিবেক-বুদ্ধি বিদ্যমান বলেই স্রষ্টা মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা পরিচয় ও সর্বোচ্চ সম্মান দান করেছেন। যে পরিচয়টুকু আমরা গর্বিতচিত্তে বহন করে চলেছি। সৃষ্টির সেরা তার সম্মান কি আমরা রক্ষা করতে পারছি। চারপাশের বিকৃত পরিবেশ, আকাশ-বাতাস ও প্রকৃতির বিমর্ষ কণ্ঠ সাফ জানিয়ে দিয়েছে ‘না’! তাহলে আমরা কী করছিÑ কেনইবা আমাদের অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে? শিশু রাজনের ওপর চালানো বীভৎস চিত্র এবং মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করা প্রাণের করুণ আর্তনাদ প্রমাণ হিসেবে অনুমেয়। এছাড়া নির্মমতার বর্বরোচিত হাজারও কাহিনীতো অহরহ ঘটছেই। মানুষ তার ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষায় মানব চরিত্র ভুলে নিজেকে আবিষ্কার করছে হিংস্র চরিত্রে। লোভ-লালসায় আসক্ত মানবরূপী নরপশুর দল অবাধে ধ্বংস করছে নিরীহ প্রাণ। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র এসব অনৈতিক কর্মকা-কে প্রশ্রয় দিয়ে অপরাধীদের অভয়াশ্রমে পরিণত করছে দেশকে। পত্রিকার পাতা ও টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠা পৈশাচিকতার বর্ণনা দেখে ঘুমন্ত বিবেক মনের অজান্তে প্রশ্ন করে বসেÑ আমরা কোন্ সমাজে বাস করছি? মানবতাবোধ মনুষ্য হৃদয় ছেড়ে কোথায় পালিয়েছে? আমরা এত নিষ্ঠুর কেন? দুঃখে ভারাক্রান্ত মনটা এতসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজে পায়নি। একদিকে অপরাধীরা অপরাধ করছে, অন্যদিকে আমরা সেগুলো দেখেও না দেখার ভান করছি। একটি শিশু বাঁচার জন্য ‘আমি মরি যাইয়ার! কেউ আমারে বাঁচাও রে বা’ বলে বিলাপ করেও ঘাতকদের কাছ থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেনি। কিন্তু এগিয়ে এসে শিশুটিকে বাঁচানোর প্রয়োজনবোধ মনে করিনি আমরা। তাহলে সমাজ, রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাই কি অপরাধ প্রবণতা বাড়ার মূল কারণ?

মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ও মানবিক মূল্যবোধ বিবর্জিত নানা কর্মকা- সমাজ, সভ্যতা ও সুস্থ সংস্কৃতিকে শুধু আঘাতই করছে না, জন্ম দিচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের। গণমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়তই সবার সামনে তুলে ধরছে বিপন্ন মানবতার অজস্র উদাহরণ। গত ৮ জুলাই সিলেটের কুমারগাঁওয়ে শিশু রাজনের ওপর চালানো বীভৎস চিত্র কাঁপিয়ে তুলে মানবদরদী সকল হৃদয়। শুধুই কি রাজন, নাÑ তার মতো অসংখ্য প্রাণ বলি হচ্ছে বর্বরতার কশাঘাতে। রাজনের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই কুমিল্লার মুরাদনগরে শামসুল ইসলাম মনির নামের এক যুবককে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। ঈদের আগের দিন ১৭ জুলাই সাভারের জিঞ্জিরায় যৌতুকের কারণে ২৪ বছর বয়সী সুখী আক্তারের এক চোখ উপড়ে ফেলে তার স্বামী ও স্বজনরা এবং ঈদের পরদিন নোয়াখালীতে পূর্ব বিরোধের জেরে তিন ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করে নরপশুরা। ১৩ এপ্রিল রাজধানীর খিলক্ষেতে কবুতর চুরির অভিযোগে কিশোর নাজিমকে হাত-পা বেঁধে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে ঘাতক দল তার নিথর দেহ ফেলে দেয় বালু নদীতে। ২৪ জুলাই রাজধানীর তুরাগে আবুল হাশেম নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করে তার মাদকাসক্ত ছেলে। ২০১৪ সালে টাঙ্গাইলে বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় একই পরিবারের চারজনকে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে বখাটেরা। একই বছরের ১০ অক্টোবর যাত্রাবাড়ীতে মায়ের পরকীয়ার কারণে নৃশংসভাবে খুন হয় ছয় বছরের শিশু মায়মুনা। ২০১৩ সালের আগস্টে রাজধানীর চামেলীবাগে একমাত্র কন্যা ঐশী রহমানের হাতে সস্ত্রীক খুন হয়েছিলেন পুলিশের বিশেষ শাখা এসবির পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান। ২০১১ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় মাদকাসক্ত ছেলে টিটুর হাতে খুন হন বাবা মোঃ সালাউদ্দিন, ১৭ জুলাই শবেবরাতের রাতে রাজধানীর আমিনবাজারে ডাকাত সন্দেহে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং একই বছরের অক্টোবরে পুরান ঢাকায় বাবা মনসুর আলীকে খুন করে মাদকাসক্ত সন্তান জাহিদুল ইসলাম।

কেন এই অবক্ষয়, কেন এই বর্বরতা? তার সঠিক কারণ খুঁজে বের করা কি এতই কঠিন! না অপরাধ প্রবণতার মূল গোড়ায় হাত দেয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার। অপরাধীরা তো আইনের উর্ধে নয়। দেশে যেভাবে অনৈতিক কর্মকা- বেড়ে চলছে তাতে মনে হয় অপরাধী ও অপরাধ আমাদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। যার প্রধান কারণ বিচারহীনতা এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। কতকাল দেখতে হবে এ নিষ্ঠুর নির্মমতা। আর কতজনকে বরণ করতে হবে এই অমানুষিক প্রাণদ-।