২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঠিকাদারের ভুলে মংলার সাইলো নির্মাণ ব্যয় বাড়ছে

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ মংলা বন্দরের জয়মনিতে নির্মিতব্য অত্যাধুনিক নৌবন্দরভিত্তিক খাদ্যগুদাম নির্মাণ প্রকল্পের সংশোধন আনা হচ্ছে। এতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে এক বছর। পাশাপাশি অনুমোদিত নকশায় ঠিকাদার পাইলআপলিফট হিসেবে ভুল করায় প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।

একই সঙ্গে প্রকল্পের সময় ও কাজ বেড়ে যাওয়ায় ঠিকাদারকে চুক্তি মূল্যের চেয়ে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। এরই মধ্যে মংলা বন্দরে আনুষঙ্গিক সুবিধাদিসহ ৫০ হাজার মেট্টিক টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন কনক্রিট গ্রেইন সাইলো নির্মাণ (২য় সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পের প্রস্তাবনা পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেয়া হয়েছে। তবে প্রস্তাবনায় ঠিকাদারের চুক্তি মূল্য অপেক্ষা ব্যয় শতকরা কতভাগ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়নি। যদিও কমিশন বিষয়টি প্রস্তাবনায় উল্লেখ করতে বলেছে।

একই প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। কমিশন বলছে, খাদ্য মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির মতামত অনুযায়ী ঠিকাদারের মূল চুক্তিমূল্য ৪৪৩ কোটি ৩৬ লাখ ৩৪ হাজার টাকা থেকে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বাড়বে। এতে প্রকল্পের সার্বিক ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ২ দশমিক ৯৯ শতাংশ। কিন্তু সংশোধিত প্রস্তাবনায় ব্যয় ৪৮ কোটি ৮ লাখ ৪৭ হাজার টাকা বা ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা সম্পর্কে মন্ত্রণালয়কে জানাতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিমূল্য বাড়ানোর বিষয়েও মতামত চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ধরা পড়ে ঠিকাদারের পাইলআপলিফট হিসেবে ভুল। ফলে নকশায় পরিবর্তন আনতে হয়। বেড়ে যায় কাজের পরিমাণ ও প্রকল্প ব্যয়। ফলে তৃতীয় দফায় এসে ব্যয় ও সময় বাড়ানো হয়। শেষ দফায় ব্যয় বাড়ল ৪৮ কোটি ৮ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হলো টিসিসিএল-এএসসি-জেভি।

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ভুলের বিষয়টি পরোক্ষভাবে মেনেও নিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। প্রকল্পের সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প-সংক্রান্ত প্রস্তাবে (আরডিপিপি) প্রকল্প সংশোধনের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, পাইলআপলিফট হিসাবসহ বিস্তারিত নকশা পুনরায় সংশোধন করার ফলে কাজের পরিমাণ ও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ বিষয়ে আরডিপিপিতে আরও বলা হয়েছে, সাইলো নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারের অধিকাংশ পূর্ত কাজ বাস্তবায়ন সমাপ্ত হলেও স্টিল ও ইলেকট্রোম্যাকানিক্যাল যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ, কনভেয়ার বেল্ট স্থাপন ও আনুষঙ্গিক পূর্ত কাজ সম্পাদন কারিগরিভাবে সম্ভব হয়নি। এ কাজগুলো পরবর্তীতে সম্পাদন করার সময় ভ্যারিয়েশন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখনও প্রকল্পের বেশকিছু পূর্ত কাজ শুরু করা যায়নি। জানা গেছে, ঠিকাদারের ভুলের জন্য পাইল সংখ্যা ৮০টি থেকে এখন ১২৫টিতে দাঁড়াল। এ জন্য চুক্তি মূল্য সাড়ে ৭ শতাংশ, প্রকল্পের সার্বিক ব্যয় বাড়ছে ২ দশমিক ৯৯ শতাংশ। পরামর্শক ব্যয় বাড়ছে দুই কোটি টাকার বেশি।

প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে ৭৫ শতাংশ। আর আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৭৮ দশমিক ১১ শতাংশ। প্রকল্প প্রস্তাবনার ওপর গত ২৭ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগে পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিভাগের সদস্য এ এন সামসুদ্দিন আজাদ চৌধুরী বলেন, প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবনার ওপর কমিশন মতামত দিয়েছে। এসব মতামতের ওপর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উত্তরের ভিত্তিতে পরবর্তীতে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত একটি প্রকল্প এবং তাঁর পরিকল্পনা অনুসারেই এটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

২০০৯ সালের মে মাসে খুলনা ও বাগেরহাটসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় আইলা। এতে ঘরবাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ভবিষ্যতে এমন ঝড় পরবর্তী সঙ্কট মোকাবেলায় এবং অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল না থেকে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্য মজুদের পরিকল্পনা নেয় সরকার।

তখন সারাদেশে খাদ্য গুদাম নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। নতুন খাদ্য গুদাম, সাইলো ও অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিদ্যমান খাদ্য গুদাম ও অন্যান্য অবকাঠামো মেরামত ও আধুনিকায়নকে বর্তমান সরকার তৃতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করছে। এরই অংশ হিসেবে মংলাতে এ সাইলো নির্মাণ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। পরে প্রকল্পের মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়। এটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। বর্তমানে ব্যয় বাড়িয়ে ৫৮৪ কোটি ৮৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।

মংলা সাইলো নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম-সচিব) গাজীউর রহমান জানান, উপকূলের ১৯টি জেলার খাদ্য নিরাপত্তা দেবে নির্মাণাধীন এ সাইলো। পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে। এতে মংলা বন্দরের কাজের গতিশীলতা ফিরে আসবে এবং খাদ্যশস্য খালাসে অপচয় হ্রাস পাবে। সাইলোর নির্মাণ শেষ হলে মংলার রূপ বদলে যাবে।