২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্ব দরবারে দেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হলো

  • ছিটমহল বিনিময় ঐতিহাসিক ঘটনা- বিশ্ব গণমাধ্যমে ফলাও প্রচার

তৌহিদুর রহমান ॥ প্রায় ৬৮ বছর প্রতীক্ষা শেষে ‘ছিটমহল’ সমস্যার সমাধান করায় বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এখন আরও উজ্জ্বল হলো। শুক্রবার মধ্যরাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়কে ‘ঐতিহাসিক ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেছে বিশ্ব গণমাধ্যম। দুই দেশের ‘ছিটমহল’ সমস্যার সমাধানকে তারা ‘অবিস্মরণীয়’ হিসেবেও বিবেচনা করছে। ছিটের ‘বিলুপ্তি’ নিয়ে বিশ্বের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে বাংলাদেশ।

১৯৭৪ সালের সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শুক্রবার মধ্যরাতে দুই দেশের মধ্যে ১৬২ ছিটমহল বিনিময় হয়েছে। আর শনিবার ভোরে অবলুপ্ত ছিটমহল এলাকায় জাতীয় পতাকাও উড়ানো হয়েছে। ছিটমহল বিনিময়ের ঘটনা শনিবার বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে বিশ্ববিখ্যাত গণমাধ্যমগুলো। আর এসব গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ৬৮ বছর পর ছিটমহল সমস্যা সমাধানের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে।

শনিবার হিন্দুস্থান টাইমস পত্রিকার প্রতিবেদনের শিরোনাম হয়েছে, ‘ঐতিহাসিক মধ্যরাত : বাংলাদেশ-ভারতের ছিটমহল বিনিময়’। এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ছিটমহল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে মশালডাঙ্গাসহ আরও ৫০ ছিটমহলের অংশ ভারতে সঙ্গে যুক্ত হলো। এসব ছিটমহলের নাগরিকরা ভারতের নাগরিকত্ব পেল।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় : প্রায় ১৪ হাজারের বেশি লোক নাগরিকত্ব পেলেন’। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, পহেলা আগস্ট বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য একটি অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হলো। আর এর মধ্য দিয়ে ভারতের ১৪ হাজারেরও বেশি নাগরিকের নাগরিকত্ব নিশ্চিত হলো।

বিবিসি’র প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল- ‘এখন নতুন নাগরিকত্ব নিয়ে জানতো বাঁচবে’। আরেকটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘বিনিময়ের পরে বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহলে আনন্দ’। এতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে ও ভারতের ভূখ-ের মধ্যে পরস্পরের ছিটমহলগুলো শুক্রবার মাঝরাত থেকেই মূল ভূখ-ের অংশ হয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে। ফলে সেখানকার বাসিন্দাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে। ভারত বাংলাদেশের ছিটমহলে চলছে আনন্দ উৎসব। বাংলাদেশে ও ভারতের ভূখ-ের মধ্যে পরস্পরের ছিটমহলগুলো শুক্রবার মাঝরাত থেকেই মূল ভূখ-ের অংশ হয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে। ফলে সেখানকার বাসিন্দাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে। ভারত বাংলাদেশের ছিটমহলে চলছে আনন্দ উৎসব। বিবিসি’র ইংরেজী ভার্সনের আরেকটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘ছিটমহল বিনিময়, বাংলাদেশ-ভারতের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ’। এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সীমান্ত চুক্তি হলেও গত জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফরের সময় বিষয়টি চূড়ান্ত হয়।

দি নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, ছিটমহল বিনিময়ের ঘটনাকে আনন্দদায়ক বলে উল্লেখ করেছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই)। দলটির কেন্দ্রীয় নেতা গুরুদাস দাশগুপ্ত শনিবার এক বিবৃতিতে এই আনন্দ প্রকাশ করেন।

ভয়েস অব আমেরিকার প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘হস্তান্তরিত হলো বাংলাদেশ-ভারতের ১৬২ ছিটমহল’। এতে বলা হয়, শনিবার প্রথম প্রহর অর্থাৎ শুক্রবার রাত ১২টা এক মিনিটে হস্তান্তরিত হয় বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তের ১৬২ ছিটমহল। আর এর মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হয় ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্ত সীমানা চুক্তি। গত মে মাসে ভারতীয় পার্লামেন্টে এই সংক্রান্ত বিলে অনুমোদন দেয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ পেল ১১১ ছিটমহল এবং ভারত পেল ৫১ ছিটমহল। ছিটমহল হস্তান্তরের ফলে বাংলাদেশ পেল ১৭ হাজার ১৬০ একর এবং ভারত পেল ৭ হাজার ১১০ একর জমি। আর এর মধ্য দিয়ে ছিটমহলবাসীর দীর্ঘদিনের নাগরিকত্ববিহীন পরিস্থিতির অবসান ঘটে।

জার্মানির ডয়েচে ভেলের অনলাইন বাংলা সংস্করণের প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল ‘নতুন ইতিহাস সৃষ্টির পথে বাংলাদেশ-ভারত’। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শুক্রবার মধ্যরাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১ ছিটমহলের নাম হয়েছে ‘বাংলাদেশ‘ আর সেখানকার নাগরিকদের পরিচয় হয়েছে বাংলাদেশী। ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশের ৫১ ছিটমহলও যুক্ত হয়েছে ভারতে, সেখানকার নাগরিকরা হয়েছেন ভারতীয়। বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সভাপতি মাইনুল হক ডয়েচে ভেলেকে বলেন, ‘এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের মূহূর্ত। আমি, আমরা, সব ছিটমহলবাসী এক মুক্ত জীবনের স্বাদ নিচ্ছি। এ যে কত আনন্দের তা শুধু অনুভূতিতেই ধারণ করা যায়, প্রকাশ করা যায় না। এছাড়া ডয়েচে ভেলের ইংরেজী সংস্করণের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘অবশেষে বাংলাদেশ-ভারতের ছিটমহলগুলোর অধিবাসীরা পরিচয় পেলেন।’

ভারতীয় সংবাদ প্রতিষ্ঠান জি নিউজের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘৬৮ বছর পর বাংলাদেশ-ভারতের ছিটমহলবাসীরা স্বাধীনতা পেল’। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬৮ বছর পর দুই দেশের ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছে। এর ফলে সেখানে ৫১ হাজার মানুষের নাগরিকত্ব নিশ্চিত হলো।

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি মানবিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘হাতে জাতীয় পতাকা, আজ থেকে ভারত ওবামারও’। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, মশালডাঙ্গার ছিটমহলের একজন সন্তান সম্ভাবা নারীকে কোচবিহারের একটি হাসপাতাল ভর্তি করতে চায়নি। পুলিশও হাজির হয়েছিলেন সেই মহিলাকে গ্রেফতার করতে। পরে আইনজীবীদের হস্তক্ষেপে তিনি আর গ্রেফতার হননি। তবে সেখানে জন্ম নেয়া সেই শিশুর নাম জেহাদ হোসেন ওবামা। সেই শিশু জেহাদকে নিয়ে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে আনন্দবাজার।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গ নিউজের খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে কয়েক দশক ধরে সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে এই ছিটমহল বিনিময় হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই খবর পাকিস্তানের ডন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে প্রকাশিত গালফ নিউজ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণেও প্রকাশিত হয়।