১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জঠরে গুলিবিদ্ধ শিশু সুরাইয়াকে মাতৃদুগ্ধ পান করানো হয়েছে

  • মা-মেয়ে দুজনের অবস্থাই কিছুটা উন্নতির দিকে

শর্মী চক্রবর্তী ॥ আমি তাকে গর্ভে ধারণ করলেও এখন আপনারাই ওর মা। আমি জানি আপনাদের কাছেই আমার সোনামণি ভাল থাকবে। আমার মনটা তাকে দেখার জন্য আকুল হয়ে আছে তা ঠিক। কিন্তু আমার দেহ থেকে সন্তানের কোন ক্ষতি হোক তা আমি চাই না। আমার শরীরের অবস্থা ভাল না। আমি চাই না আমার জন্য আমার সন্তানের কিছু হোক। তাই একেবারে সুস্থ হয়েই আমি সোনামণিকে কোলে নেব। শনিবার দুপুরে নবজাতকের জন্য বুকের দুধ সংগ্রহ করতে যাওয়া চিকিৎসককে এসব কথা বলেন নাজমা। নবজাতককে না দেখতে পারলেও বুকের দুধ দিতে পেরেই শান্তি পাচ্ছেন মা। তিনি চান যে করেই হোক তার সন্তান যেন সুস্থ হয়ে উঠে। এতে যদি তাকে আরও কিছুদিন সন্তান থেকে দূরে থাকতে হয় তাতেও আপত্তি নেই। জন্মের ৯ দিন পর শুক্রবার রাতে প্রথমবারের মতো মায়ের বুকের দুধের স্বাদ পেল মাতৃজঠরে গুলিবিদ্ধ সেই শিশুটি। রাতে মায়ের বুকের দুধ সংগ্রহ করে ২ মিলিগ্রাম তাকে খাওয়ানো হয়।

ঢাকা মেডিক্যালের শিশু সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ কানিজ হাসিনা শিউলি বলেন, শুক্রবার ২৪ ঘণ্টা পরীক্ষামূলকভাবে শিশুটিকে তার মায়ের বুকের দুধ সিরিঞ্জ দিয়ে খাইয়ে দেখা হয়েছে শিশুটি তা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারে কিনা। তা সম্ভব হওয়ায় মাত্রা বাড়ানো হয়। শনিবার সকাল থেকে তিন ঘণ্টা পর পর জঠরে গুলিবিদ্ধ সুরাইয়াকে ৫ মিলিলিটার করে বুকের দুধ খাওয়ানো হয়। ঢাকা মেডিক্যালের ২১১ নম্বর নিওনেটোলজি বিভাগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) দায়িত্বরত নার্সরা শিশুটির মুখে মায়ের দুধ তুলে দেন। তাদের একজন জানান, নাজমার শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়েছে, তাই সন্তানের পাশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না। এছাড়া নাজমা নিজেও চান একেবারে সুস্থ হয়েই সন্তানকে কোলে নিতে। এ তথ্য নিশ্চিত করে তিনি আরও জানান, আজ তিনবার এভাবে মেয়েটিকে মাতৃদুগ্ধ করানো হয়েছে।

অন্যদিকে শনিবার শিশুটির চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড পুনর্বিন্যাস করে আরও দুই সদস্য বাড়ানো হয়েছে। শিশু বিভাগের (এনআইসিইউ) প্রধান প্রফেসর আবিদ হোসেন মোল্লাকে প্রধান করে মেডিক্যাল বোর্ড পুনর্বিন্যাস এবং এই বোর্ডে আরও দুই সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে ১০ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এ দুজন চিকিৎসক হলেনÑ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের ডাঃ সাদিকা ও ঢামেক প্লাস্টিক সার্জারির অধ্যাপক ডাঃ রায়না আওয়াল সুমী। এছাড়া রবিবার মাগুরায় গুলিবিদ্ধ শিশু ও তার মায়ের জন্য একটি যৌথ মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হতে পারে বলেও জানান চিকিৎসকরা।

প্রসূতি বিভাগের বিছানায় শুয়ে নাজমা বেগম আশায় বুক বাঁধছেন তার গুলিবিদ্ধ সন্তানটি দেশবাসীর দোয়ায় সুস্থ হয়ে উঠবে। আবার মাঝে মাঝে সন্তানের অসুস্থতার কথা শুনলে আঁতকে উঠেন। যে মেয়েকে নিয়ে নাজমার এই ভয় আর আতঙ্কে থাকা, সেই মেয়ের ছবি দেখেছেন চিকিৎসক ও নিরাপত্তারক্ষীদের মুঠোফোনে। সেই ছবি দেখেই মেয়েকে না দেখার দুঃখ ভুলে আছেন।

বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ কানিজ হাসিনা শিউলির তত্ত্বাবধানে আছে শিশুটি। শনিবার শিশুটির শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ডাঃ কানিজ হাসিনা বলেন, শিশুটির অবস্থা আগের থেকে এখন কিছুটা উন্নতির দিকে। তবে এখনও আশঙ্কামুক্ত নয়। শিশুটির কিছু জটিলতা আছে। শিশুটির শরীরে জন্ডিসের মাত্রা কমে এসেছে। বৃহস্পতিবার নবজাতক বিভাগে আনার সময় বিলিরুবিনের মাত্রা ছিল ১৭ এখন ১৩। এখনও ফটো থেরাপি দেয়া হচ্ছে।

১০ দিনের মেয়ের চিকিৎসার জন্য গত মঙ্গলবার নবজাতক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লাকে প্রধান করে ৯ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। ওই বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুধবার নবজাতকের অস্ত্রোপচার করা হয়। শিশুটির বুক, হাত, গলা ও চোখে জখমের চিহ্ন রয়েছে। চোখের আঘাত গুরুতর। এসব স্থানে আঠারোটি সেলাই দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার শিশুটিকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। ছোট্ট শরীরে গুলির জখম আর অস্ত্রোপচারের ধকল সামলে উঠতে শিশুটির জন্য মায়ের বড় প্রয়োজন-চিকিৎসকদের এ কথা শুনে বৃহস্পতিবার মাগুরা থেকে রাজধানীতে ছুটে এসেছেন নাজমা বেগম। তিনি নিজেও এখনও পুরোপুরি সেরে উঠেননি।

গুলিবিদ্ধ শিশুটির বাবা জানান, তার মেয়ের শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে তা তিনি চিকিৎসকের কাছে জানতে পেরেছেন। সারাদিন শুধু আল্লাহর কাছে একটাই প্রার্থনা করছেন মা ও শিশু সন্তান যেন সুস্থ হয়ে উঠে। তাদের নিয়ে যেন বাড়ি ফিরতে পারেন। তিনি আরও বলেন, ১০ দিন পার হয়ে গেলেও এখনও প্রধান আসামিরা গ্রেফতার হয়নি। তিনি চান খুব তাড়াতাড়ি যেন তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নেয়া হয়।

যে নবজাতককে ঘিরে সবার এত উৎকণ্ঠা, সে এই পৃথিবীর আলো দেখার আগেই চরমতম নৃশংসতার শিকার হয়েছে। গত ২৩ জুলাই মাগুরার দোয়ারপাড় এলাকায় আধিপত্য নিয়ে যুবলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হন শিশুটির মা নাজমা বেগম। তাঁর পেট ফুঁড়ে গুলি গিয়ে লাগে গর্ভের শিশুটির শরীরে। হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার করে পৃথিবীর আলোয় নিয়ে আসেন মেয়েটিকে। উন্নত চিকিৎসার জন্য গত শনিবার তাকে পাঠানো হয়েছে ঢামেক হাসপাতালে। মা নাজমা বুধবার পর্যন্ত মাগুরাতেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। সংঘর্ষের ওই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মমিন ভুঁইয়া নামে এক ব্যক্তি নিহত হন।