২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দাসিয়ারছড়ার শরীফা এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে

  • নতুন নাগরিকরা চায় সব সুবিধা

রাজু মোস্তাফিজ, ফুলবাড়ীর দাসিয়ারছড়া ছিট থেকে ফিরে ॥ শরীফা বেগম। ভারতীয় ছিটমহল দাসিয়ারছড়া কালীরহাট বাজারের পাশেই তার বাড়ি। বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্রী। গ্রামবাসীদের সঙ্গে সেও ৬৮টি মোমবাতি জ্বালানোর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিল। এতদিন পরিচয় গোপন রেখে এ দেশীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করছে। প্রতিমুহূর্তে চরম আতঙ্কে দিন কাটাত। কিছু সহপাঠি বিষয়টি জানলেও তারা নানাভাবে বিদ্রƒপ করত। কারণে-অকারণে ভয় দেখাত। নিরুপায় হয়ে সব কিছুই সহ্য করত। শুধু বন্দী জীবনের মতো নীরবে চোখের জল ফেলত শরীফা। শনিবার রাত ১২টা এক মিনিট পর স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। আর মিথ্যা পরিচয় দিয়ে চলতে হবে না। তাকে কেউ আর অবহেলা করবে না। এখন স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। এ কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখে আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। মানুষের স্বাধীনতার যে কি অনুভূতি তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। শুধু শরীফা নয়, তার মতো প্রায় তিন থেকে চার শতাধিক ছাত্রছাত্রী বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গোপন পরিচয়ে পড়াশুনা করছে। কালীরহাট গ্রামের দশম শ্রেণীর ছাত্রী আয়েশা, রাশেদা একই অনুভূতি জানান। তাদের মতে আমাদের নতুন জীবন শুরু হলো। এখন আমাদের দাবি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরকার যেন দাসিয়ারছড়াসহ বিভিন্ন ছিটমহলে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্মাণ করার ব্যবস্থা করে দেন।

রাত প্রায় দুটা। দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের কোন মানুষের চোখে ঘুম নেই। এখানকার গ্রামগুলো হচ্ছে উচাটারী, খরিয়াটারী, বালাটারী, পূর্বটারী, বানিয়াটারী, কালিরহাট, দোলাটারী, কামারপুর, ছোটকামাত, বড়কামাত, রাসমালা, কেরাটারী। এখানে এক হাজার ৯শ’ ৪৫ একর জমি রয়েছে। মোট পরিবার রয়েছে ৯শ’।

পুরো এলাকার নারী, পুরুষ, শিশু, যুবক, বৃদ্ধ কোন মানুষের চোখে ঘুম নেই। চারদিকে সাজ সাজ রব। যুবক, বৃদ্ধ, তরুণ, পুরুষ, মহিলা খ- খ- আনন্দ মিছিল করছে। ৬৮ বছরের বন্দী জীবনের মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করছে তারা। চরম আনন্দের কি যে এক অনুভূতি, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। দূর-দূরান্তের বিভিন্ন গ্রাম, পার্শ¦বর্তী জেলা এবং বিভিন্ন উপজেলার হাজার হাজার মানুষ ছিটের মানুষের সঙ্গে আনন্দে শরীক হতে এসেছেন।

কালীরহাট গ্রামের পঞ্চাশ-উর্ধ কৃষক মনির উদ্দিন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন পর আমাদের এ দাসিয়ারছড়া ছিটমহল বাংলাদেশ হওয়ায় ভীষণ খুশি তিনিসহ সকল ছিটবাসী। তিনি তার জীবনের করুণ কাহিনী বলেন। তখন ১৯৭০ সাল। তার বাবা সরিয়ত উল্লা এই ছিটের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানবিরোধী ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মানুষকে সংগঠিত করতেন। এটি ছিল তার অপরাধ। এ কারণে দুষ্কৃতরা তাকে জবাই করে হত্যা করেছিল। তখন তার বয়স ছিল ১০ বছর। কিন্তু ছিটেরবাসী হওয়ার কারণে তার বাবার হত্যার বিচার আজও পায়নি। এখন আমরা আইনের শাসন পাব। রাসমেলা গ্রামের কৃষক আবদুস সামাদ (৫৬)। তিনি জানান, এতদিন পর মনে হচ্ছে আমাদের মাথা গোজার ঠাঁই হলো। এখানে গড়ে উঠবে চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমার ভাইয়ের স্ত্রীকে এক প্রতিবেশী বিনা অপরাধে আহত করেছিল। শুধু ছিটের নাগরিক বলেই ফুলবাড়ী হাসপাতালে ভর্তি নেয়নি। বাধ্য হয়ে ঠিকানা গোপন রেখে কুড়িগ্রাম হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েছিলাম। এখন আর এমন সমস্যায় পড়ব না।

কালীহাট বাজারের ছোট্ট চায়ের দোকানের মালিক মনির উদ্দিন (৬২)। উচাটারী গ্রামে তার বাড়ি। সামান্য জমি জমা আছে তার। এর কাগজপত্রগুলো ভারতের ভূমি অফিসে। এগুলো কিভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে এসে এদেশের দলিলপত্র তৈরি করবে বুঝতে পারছি না। সরকার যেন এ সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করে দেয়। দাসিয়ারছড়া এলাকায় শতাধিক হিন্দু পরিবারের বাস। এর মধ্যে মাত্র ১৫৮ জন হিন্দু নাগরিক ভারত যাবার নিবন্ধন করেছে। হরেকৃষ্ণ বাবু জানান, যে সব হিন্দু নাগরিক ভারতে যাবার ইচ্ছা পোষণ করেছে তারা জমি সংক্রান্ত কিছু সমস্যায় পড়ার অভিযোগ শুনেছি। অনেকে নাকি তাদের জমি সস্তা দামে কিনতে চাচ্ছে। তাদের নানা রকম হুমকি দিচ্ছে। কালীরহাট গ্রামের সাবেক পঞ্চায়েত সদস্য আবদুল মোন্নাফ (৫৪) জানান, আমাদের দাসিয়ারছড়া এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটু বেশি নজরদারি করার অনুরোধ জানান পুলিশ প্রশাসনের কাছে। সময়ের সঙ্গে এখানকার কিছু মানুষ তাদের আধিপত্য তৈরি করার চেষ্টা করছে। এছাড়া যে সব জমি-জমা শুধু স্ট্যাম্পের ওপর লিখিত ডিডে বিক্রি হয়েছিল সেই জমির মালিকদের অনেকেই আবারও তাদের জমি দাবি করার পাঁয়তারা করছেন বলে তিনি জানান। দেবীরপাঠ বাজারের ব্যবসায়ী মোঃ ফারুক শেখ (২৯), শাহজামাল (৩৬), গোলজার হোসেন (৪২), বড়কামাত গ্রামের মোজাফ্ফর আলী (৬৫) জানান, জরুরীভিত্তিতে নীলকমল ছড়ার ওপর একটি ব্রিজ দরকার। এটি হলে ফুলবাড়ী উপজেলার সঙ্গে ছিটমহলের দূরত্ব মাত্র তিন কিমি হবে। এখানকার যুবক লাভলু, জাহানারা, খোরশেদ, মোকসেদ, হায়দার, লিটন, কুদ্দুসসহ প্রায় ২ হাজার মানুষ কাজের সন্ধানে ভারতের দিল্লী গিয়েছিল। তারা ফিরে আসছে। তারা এখন সরকারের কাছে স্পেশাল কোঠায় বিভিন্ন চাকরি চায়। ছিটবাসীদের চাকরির জন্য আলাদা কোঠার দাবি জানায়।

বানিয়াটারী গ্রামের খবির উদ্দিন (৭০) তার রয়েছে প্রায় ৪৮ বিঘা জমি। এত সম্পত্তির জন্য খুব দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তার বিশাল এই জমির দলিলপত্র ভারতের ভূমি অফিসে। এগুলোর এখন কি ব্যবস্থা হবে তিনি জানেন না। তিনি সরকারের কাছে অনুরোধ করেন তাদের দলিলপত্রগুলো যেন সঠিকভাবে পায় এ ব্যবস্থা নেবে সরকার। একই সমস্যা মহির আলী, জাহিদুল হকসহ অনেক বড় গৃহস্থের। দেবীরপাঠ শরিফুল (২২), কামালপাড়া গ্রামের লিটন শেখ, মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, কৃষি নির্ভরই এই ছিটমহলের লোকজন ধান, পাট, আখ, গম, সবজি, কলাসহ সব ধরনের আবাদ করে।

কুড়িগ্রাম পুলিশ সুপার মোঃ তবারক উল্লা জানান, কুড়িগ্রামের ভারতীয় ছিটমহলের ভূখ-গুলো এখন আমাদের দেশের ভূখ-। এখন আমরা আমাদের মতো করে আরও নিরাপত্তা দেব।

স্বাধীন দাসিয়ারছড়া ছিটমহল ঘুরে দেখা গেছে সড়কগুলো কাঁচা খানা-খন্দকে ভরা। স্কুল, হাটবাজার ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। শুধু দাসিয়ারছড়া ছিটের মানুষের এ সমস্যা নয়, এটি কুড়িগ্রামের ১২টি ছিটমহলের একই অবস্থা। তারা সকলে চায় আমরা এখন বাংলাদেশের নাগরিক। আমরাও সারাদেশের মানুষের মতো সমান অধিকার পাব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেন আমাদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করার ব্যবস্থা নেয় এটা সকলের প্রত্যাশা।