২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাগরের সঙ্গে একাকার কুতুবদিয়া ও শাহপরীর দ্বীপ

  • বসতি এলাকায় জোয়ারভাটা

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার থেকে ॥ এক মাস আগে সৃষ্ট বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এবার ঘূর্ণিঝড় কোমেনের প্রভাবে ঝড়ো হওয়ায় কুতুবদিয়া ও টেকনাফে শাহ্পরীরদ্বীপের বেড়িবাঁধ ছিঁড়ে খান খান হয়ে গেছে। পাশাপাশি পূর্ণিমার তিথিতে লোনাজলে বিস্তীর্ণ এলাকার আউশ ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসহ তলিয়ে গেছে বহু বসতঘর। বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ওই দুই উপজেলার ১০টি পয়েন্ট দিয়ে সরাসরি সাগর থেকে জোয়ারের পানি প্রবেশ করছে লোকালয়ে। আরও ৩-৪ দিন পূর্ণিমার তিথির জোয়ারে সমুদ্রে পানি বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন অভিজ্ঞমহল। জেলার টেকনাফ, শাহ্পরীরদ্বীপ, কুতুবদিয়া, রামু, চকরিয়া ও পেকুয়ার অধিকাংশ এলাকা বাঁকখালী-মাতামুহুরী নদী ও সাগরের সঙ্গে একাকার হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ঘূর্ণিঝড় কোমেনের প্রভাব ও পক্ষকালের টানা ভারি বর্ষণে এমনিতে পানিবন্দী হয়ে আছে শাহ্পরীরদ্বীপ ও কুতুবদিয়ার দুই লাখ মানুষ। তার ওপর পূর্ণিমায় সাগরের পানিতে জোয়ারের সময় এ দুটি দ্বীপের মানুষের অবস্থা কাহিল হয়ে ওঠে। দ্বীপ রক্ষার বেড়িবাঁধ নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কতিপয় কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছেন এলাকার অনেকে। কুতুবদিয়া রক্ষায় সরকার বেড়িবাঁধ নির্মাণে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও ঠিকাদার ও দুর্নীতিপরায়ণ ওই সব কর্মকর্তার পুকুরচুরির কারণে নামমাত্র বাঁধ তৈরি করা হয়েছে ওখানে। এ অবস্থায় সাগরের ঢেউয়ের ধাক্কায় বেড়িবাঁধ ছিঁড়ে খান খান হয়ে পড়েছে। অপার সম্ভাবনার দ্বীপ কুতুবদিয়াকে রক্ষায় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সেনা ও নৌবাহিনীর মাধ্যমে টেকসই বাঁধের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। কুতুবদিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মোঃ ইয়াহিয়া খান কুতুবী জনকণ্ঠকে বলেন, উত্তর ধুরুয়ের পূর্ব চরধুরুং, ফয়জানিপাড়া, লেমশীখালীর পেয়ারাকাটা, কৈয়ারবিলের মলমচর, বড়ঘোপের আমজাখালী, দক্ষিণ মুরালিয়াসহ ৭টি পয়েন্টে অন্তত পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় সরাসরি সমুদ্রের জোয়ারের পানি প্রবেশ করছে এবং ভাটায় বেরিয়ে যাচ্ছে। এতে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে দ্বীপের পূর্ব পাশের ১০-১৫ কিলোমিটার এলাকা। দুর্যোগ চলা অবস্থায় এবং পরবর্তীতেও পাউবোর কাউকে এলাকায় দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা। জরুরী ভিত্তিতে বেড়িবাঁধবিহীন এলাকাগুলোতে রিংবাঁধ দেয়া না হলে চলতি মৌসুমে চাষাবাদ করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মমিনুর রশিদ বলেন, সরেজমিন পরিদর্শন শেষে দ্বীপের ক্ষতির বিষয়টি তৎক্ষণাৎ সংশ্লিষ্ট বিভাগে জানানো হয়েছে। এ ছাড়াও পর পর দু’দফা বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় কোমেনের প্রভাবে জেলায় বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৬০ হাজার হেক্টর চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেড়িবাঁধ উপচে ও ভেঙ্গে প্রজেক্টে পানি ঢুকে ভেসে গেছে অন্তত ৪শ’ কোটি টাকার চিংড়ি মাছ। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত কমপক্ষে ২০ হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়ার সম্ভাবণা রয়েছে।

দেশের মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে টেকনাফের শাহ্পরীরদ্বীপ। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে দ্বীপের বিশাল একটি অংশ। জোয়ারের পানি প্রবেশ করে বীজতলা, ফসলী জমি, চিংড়ি ঘের ও ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। দুর্গত এলাকার লোকজন বর্তমানে শুকনা খাবার খেয়ে সময় কাটাচ্ছে। রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও। টেকনাফ সদর থেকে কোন ধরনের কাঁচামাল আনা-নেয়া করা যাচ্ছে না। ফলে অর্থনৈতিকভাবেও চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শাহ্পরীরদ্বীপের বাসিন্দারা। সেন্টমার্টিনের ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বলেন, কোমেনের আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেন্টমার্টিন দ্বীপের। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলী জমি। হারিয়ে গেছে দুটি ফিশিং ট্রলার, একটি সার্ভিস বোটসহ ছোট-বড় ৮টি নৌকা ডুবে গেছে। উড়ে গেছে অসংখ্য ঘরবাড়ির চালা। সব মিলিয়ে অন্তত তিন কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মহেশখালীর মাতারবাড়ি-ঢলঘাটার নিম্নাঞ্চল ব্যাপক আকারে প্লাবিত হয়েছে। অনেক স্থানে ঘরবাড়ি ও গাছপালা উপড়ে গেছে। বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়ে উপকূলের বিভিন্ন স্থানে ভাঙ্গা বেড়িবাঁধের অংশ দিয়ে লোনাপানি প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৬টি, রামুতে ১টি, চকরিয়া ৪টি, পেকুয়ায় ৪টি, কুতুবদিয়ায় ৭টি, মহেশখালীতে ৩টি, উখিয়ায় ১টি ও টেকনাফে ২টি ইউনিয়ন বৃহস্পতিবার কোমেনের প্রভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।