২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বঞ্চনা ও অধিকারহীনতায় ভুগছে চা জনগোষ্ঠী

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সামজের অবহেলিত চা জনগোষ্ঠী সীমাহীন বঞ্চনা ও অধিকারহীনতায় ভুগছে। তাদের অধিকার প্রশ্ন তোলার কেউ নেই। উচ্চকন্ঠ হয়েও কথা বলেন না কেউ। মাত্র ৬৯ টাকার বিনিময়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা কাজ করেন তারা। শ্রমিকদের সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মজুরী দেওয়া হয় না। চা জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের এসব চিত্র তুলে ধরে বক্তরা বলেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মজুরি না দেওয়া স্পষ্টত শ্রম আইনের লঙ্গন। সমাজে এমন কোন পেশা নেই যেখানে দৈনিক ৬৯ টাকা বেতন! শ্রমিকের মাসে ১৭০০ টাকারও কম বেতন পান। নূণ্যতম ৪ হাজার টাকা বেতন করতে হবে। চা বাগানের আশেপাশে কোন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে আন্দোলন করে তা প্রতিহত করা হবে।

রবিবার রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে চা-জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। সভার আয়োজন করে ইন্ডিজেনাস সোশাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন ও সার্বিক সহায়তায় ছিলো আদিবাসি বিষয়ক জাতীয় কোয়লিশন। অনুষ্ঠানে প্রধান অথিতি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান ও বিশেষ অতিথি হিসাবে ছিলেন আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক ফজলে হোসেন বাদশা এমপি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান বলেন, চাঁন্দপুরের ৫১১ একর চা জমির উপর স্পেশাল ইকোনোমিক জোন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। জমি অধিগ্রহণের পক্রিয়া চলছে। চা শ্রমিকদের বলবো আপনারা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে একটি আবেদন করুন। আমি কথা দিচ্ছি, আবেদন পত্র পাওয়ামাত্রই যেখানে যা করার দরকার আমারা করবো। আপনাদের ভ’মি রক্ষার্থে আমরা আন্দোলন করবো। তিনি বলেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিন চা শ্রমিকদের কোন মজুরী দেওয়া হয়। পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। এটা কোনভাবে গ্রহণযোগ্র নয়। প্রচলিত আইনে এটা শ্রম আইনের লঙ্গন। তিনি বলেন, অনেকেই বলেন ওই জমিগুলো খাসজমি। কিন্তু মনে রাখা উচিত কোন ভ’মি দীর্ঘকাল ধরে কোন ব্যক্তি যদি ব্যবহার করে তবে তা তাদের অর্জিত অধিকাররে পরিণত হয়। মালিকানায় পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক আইনেও চাবাগানের মালিকানা চা শ্রমিকদের এবং অন্য কেই এ ভ’মির মালিকানা দাবি করতে পারে না।

রাষ্ট্রের প্রতি অভিযোগ করে ড. মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের রাষ্ট্র শুধু কেড়ে নিতে চায়। তবে একটা জায়গায় রাষ্ট্র খুব দয়ালু। মাদক দ্রব্যের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ব্যবস্থার দয়া লক্ষ্যনীয়। রাষ্ট্রকে ঘুম পাড়ানির মাশি পিশির ভূমিকা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রকে তেলের মাথায় তেল দেওয়া মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, ভ’মি কেড়ে নেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়। তিনি আরও বলেন, পূজী বা মূলধনের পূজা নয়, রাষ্ট্রকে যদি পূজা করতে হয় শুধুমাত্র মানুষের পূজা করতে হবে। নাগরিকের পূজা করতে হবে। প্রন্তিক ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমার বিশ্বাস বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কানে দরিদ্র মানুষের কথা কানে পৌছালে তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেন। তাঁর কানে পৌছালে চা শ্রমিকের ক্ষেত্রেও তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন বলেই বিশ্বাস।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ফজলে হোসেন বাদশা এমপি বলেন, চা বাগান মূলত সিলেটেই বেশি। গত ৪০ বছর ধরে সিলেটের অর্থমন্ত্রী দিয়েই দেশ পরিচালনা হচ্ছে। অথচ ওই অঞ্চলের চা শ্রমিকেরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কোন মন্ত্রীকে যদি দিন প্রতি ৬৯ টাকা বেতন দেওয়া হতো তবে তারা চা শ্রমিকের দুর্দশার কথা বুঝতে পারতো। সিলেট শহরের পাশে পাহাড় কেটে গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে। অথচ তারা কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, একেকটি চা বাগানের সমস্যা একেক রকম। সবগুলোর সমস্যা একত্রিত করে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হোক। সরকার চা বাগানে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি হবে, কিন্তু কোথায়, যেখানে হতদরিদ্র মানুষ বসবাস করে। এতে করে উন্নয়ন হবে উন্নত মানুষের, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্থ হবে হতদরিদ্ররা। তা হতে পারে না, তা মেনে নেওয়া যায় না।

শ্রী কাঞ্চন পাত্রের সঞ্চলনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদের সভাপতি মেহন রবিদাস, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শ্রী নৃপেল পাল। এসময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ব্যারিষ্টার সারাহ হোসেন, বাংলাদেশ আধিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সজ্ঞীব দ্রং, প্রফেসর মেজবাহ কামাল, লেখক সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ ও পঙ্কজ ভট্টাচার্য প্রমুখ।