২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শিশুমৃত্যু রোধে ভারতের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ ॥ আরেক সাফল্য

শিশুমৃত্যু রোধে ভারতের  চেয়ে এগিয়ে  বাংলাদেশ ॥ আরেক সাফল্য
  • বিশ্বব্যাংক ও সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রশংসা ;###;স্বাস্থ্য খাতে উন্নতি ও অপুষ্টি দূর অন্যতম কারণ

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ শিশু মৃত্যুরোধে বিশেষ সফলতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। স্বাস্থ্যখাতে উন্নতি, অপুষ্টি দূর করা ও সচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানারকম পদক্ষেপের ফল মিলতে শুরু করেছে। ২০০৯ সালে যেখানে পাঁচ বছরের নিচের প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে ৫০ জন শিশু মৃত্যুবরণ করতো, সেখানে ২০১৩ সালে এসে এ হার কমে দাঁড়িয়েছে ৪১ জনে। শুধু পাঁচ বছরের নিচে শিশুর ক্ষেত্রেই নয় সকল বয়সের শিশুর ক্ষেত্রেই মৃত্যুর হার কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপের ফলাফলে এ চিত্র উঠে এসেছে। এর আগে চলতি বছরের শুরুতেই বাংলাদেশের এ অর্জনের প্রশংশা করেছিল বিশ্বব্যাংক। তাছাড়া আন্তর্জাতিক শিশুবিষয়ক দাতব্য সংস্থা সেইভ দ্য চিলড্রেন এক প্রতিবেদনে বলেছে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর হার কম।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বিশেষ করে তিনটি ভিন্ন নির্দেশক যথা- ৫ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যু হার, ১ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যু হার ও হামের টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে। শিশু মৃত্যুহার হ্রাসের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে সম্প্রসারিত টীকাদান কর্মসূচী, ডায়রিয়া নিরাময় ও সম্পূরক ভিটামিন-এ সরবরাহ কর্মসূচীও প্রভুত অবদান রেখেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মনিটরিং দি

সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্টাটিসস্টিকস অব বাংলাদেশ প্রকল্পের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পাঁচ বছরের নিচে শিশুর ক্ষেত্রে ২০০৯ সালে ছেলে মৃত্যুর হার ছিল প্রতিহাজারে ৫২ জন, সেটি কম ২০১৩ সালে হয়েছে ৪২ জন। অন্যদিকে, মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়, ২০০৯ সালে ছিল হাজারে ৪৮ জন, সেটি ২০১৩ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ জনে। তাছাড়া গ্রামে পাঁচ বছরে মোট শিশু মৃত্যুর হার হাজারে ৫২ জন থেকে কমে ৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে এবং শহরে ৪৭ জন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫ জনে।

প্রকল্প পরিচালক একেএম আশরাফুল হক জানান, প্রকল্পটির কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শুমারি মধ্যবর্তী বছরগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির উপাদানসমূহ যথা- জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, আগমন, বহির্গমন এবং আর্থ-সামাজিক তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং নিয়মিতভাবে প্রকাশের মাধ্যমে পরিকল্পনাবিদ ও নীতি নির্ধারকগণকে সুষ্ঠু ও তথ্যভিত্তিক জনসংখ্যা পরিকল্পনায় সহায়তা করা।

প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এক মাসের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হার ২০০৯ সালে ছিল ২৮ জন, সেটি কমে ২০১৩ সালে দাঁড়িয়েছে ২১ জনে। এক্ষেত্রে গ্রামে গত পাঁচ বছরে হয়েছে হাজারে ২৯ জন শিশু থেকে কমে ২৩ জনে। শহরে হাজারে ২৮ জন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে।

এক থেকে ১১ মাস বয়সী শিশু মৃত্যুর হার অপরিবর্তিত রয়েছে জাতীয়ভাবে ২০০৯ সালে প্রতিহাজার শিশুর মধ্যে মারা যেত ১১ জন, সেটির কোন পরিবর্তন হয়নি, ২০১৩ সালেও একই রয়েছে। এক থেকে চার বছর বয়সের শিশুর ক্ষেত্রে দখা যায় ২০০৯ সালে প্রতিহাজারে এ বয়সের শিশু মারা যেত ২ দশমিক ৭ জন, সেটি কমে ২০১৩ সালে হয়েছে ২ দশমিক ২ জন।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল বলেন, ইাতোমধ্যেই শিশু মৃত্যু কমাতে সফলতা এসেছে। তবে যেসব অসুখ প্রতিরোধ করা যায় সেগুলোর কারণে যাতে কোন শিশুর মৃত্যু না হয় সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। ফলে আগামীতে শিশু মৃত্যু আরও অনেক কমে যাবে।

শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর সূত্র জানায়, দেশে শিশুমৃত্যুর হার বিগত বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যু (প্রতি হাজার জীবিত জন্মে) অর্ধেকেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। এ সফলতার পিছনে সরকারী নানা কার্যক্রমগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সারাদেশে প্রতিমাসে ৩০ হাজার স্যাটেলাইট ক্লিনিক আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর আজিমপুরের এমসিএইচটিআই, মোহাম্মদপুর জনউর্বরতা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ১০১টি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, ৪২০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা ইউনিট এবং ৩ হাজার ৮২৭টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র মা ও শিশু এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।

সূত্র জানায়, চলতি বছরের শুরুতেই বিশ্বব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের নিচে শিশু মৃত্যু হারে শিক্ষণীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে। গত ১২ জানুয়ারি প্রকাশিত ডেমোস্টিফাইং দ্য সাইন্স অব ডেলিভারি : লানিং ফ্রোম হাউ বাংলাদেশ রিডিউস চাইল্ড মর্টালিটি-শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের একটি ফিচারে এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে পাঁচ বছরের নিচে শিশু মৃত্যুর হার ছিল প্রতিহাজারে ১৮০ জন, সেটি কমে ২০১১ সালে দাঁড়িয়েছে ৫৩ জনে।

সর্বশেষ প্রকাশিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েক বছরে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে। ১৯৯০ সালে এ হার ছিল ৬৬ শতাংশ। ২০১৫ সালের মধ্যে শিশু অপুষ্টির হার ৩৩ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব কিছু নয় বলে তখন বলেছিল সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল প্রতিহাজারে এক বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হার ২০১১ সালে ৩৫ জনে নেমে এসেছে। ১৯৯০ সালে এর হার ছিল ৯২ শতাংশ। ২০১৫ সালের ৩১ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার ছিল প্রতিহাজারে ১৪৬ ছিল। সেটি কমে হয়েছিল ৪৪ অর্জিত। কমেছে প্রসূতি মৃত্যুর হারও। প্রতিলাখে প্রসূতি মৃত্যুর হার ৫৭৪ জন থেকে ১৯৪ জনে নেমে এসেছে। ১৪৩ এ নামিয়ে আনার লক্ষমাত্রা অর্জনের পথে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের টিকা দেয়ার হার ১৯৯০ সালে ছিল ৫৪ শতাংশ। তা সাড়ে ৮৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০১৫ সালের মধ্যে শতভাগ হবে বলে মনে করছে সরকার।

এর আগে আন্তর্জাতিক শিশুবিষয়ক দাতব্য সংস্থা সেইভ দ্য চিলড্রেন এক প্রতিবেদনে বলেছে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর হার কম। ভারতে প্রতিবছর জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যেখানে মারা যায় ৩ লাখ শিশু সেখানে বাংলাদেশে মারা যায় মাত্র দুই হাজার ৮শ’ শিশু। বলা হয়েছে ১৮৬টি দেশে জন্মের প্রথম দিনেই শিশু মৃত্যুর ওপর জরিপ চালিয়ে স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স মাদার রিপোর্ট’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্ব জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ ধারণকারী এশিয়ায় জন্মের প্রথম দিনেই মৃত শিশুর হার ৪০ শতাংশ। আর বিশ্বের শিশু মৃত্যুর ২৯ শতাংশ ঘটে ভারতে। ভারতে প্রতিবছর জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় তিন লাখ নবজাতক নানা প্রকার ইনফেকশন আর অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে থাকে। এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর সঙ্কট মোকাবিলার জন্য তহবিলের অভাবকেই দায়ী করা হয়েছে সেইভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিবেদনে। দাতব্য সংস্থাটির আঞ্চলিক পরিচালক মাইক নোভেল এ বিষয়ে বলেছিলেন, উন্নতি হচ্ছে তা ঠিক কিন্তু তবু প্রতিদিন প্রতিরোধযোগ্য কারণে ভারত, বাংলাদেশ আর পাকিস্তানে এক হাজারের অধিক শিশু জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মারা যাচ্ছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মহাপরিচালক মোঃ নূর হোসেন তালুকদার জনকণ্ঠকে জানান, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার রোধে ইতোমধ্যে অনেক সফলতা দেখিয়েছে বাংলাদেশ। সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের সু-ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে সারাদেশে মোট ১২ হাজার ৫৫০টি ক্লিনিক চালু আছে এবং এ সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া ৫৮১টি ক্লিনিকে স্বাভাবিক প্রসব পরিচালিত হচ্ছে। ২০০৯ সালের মার্চ থেকে ২০১৪ সালের মে পর্যন্ত ৯ হাজার ৮৮৭টি স্বাভাবিক প্রসব পরিচালিত হয়েছে। এ সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। কোথাও মা বা শিশু মৃত্যু বা জটিলতা দেখা দেয়নি। সরকারী ও বেসরকারী প্রচেষ্টায় প্রশিক্ষিত ধাত্রীর সংখ্যাও বেড়েই চলেছে। শিশু পুষ্টি কার্যক্রম আরও জোরালো করেছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদফতর ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারীদের উদ্দেশে দিক নির্দেশনামূলক চিঠি দেয়া হয়েছে। সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের শিশু পুষ্টি কার্যক্রমেও নতুন কর্মসূচী আসছে।