১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মালয়েশিয়ায় ৫ লাখ কর্মী নিয়োগ ॥ ১০ আগস্ট প্রতিনিধি দল আসছে

ফিরোজ মান্না ॥ বাংলাদেশ থেকে ৫ লাখ কর্মী নিয়োগের জন্য দুই দফা তারিখ পরিবর্তন করে আগামী ১০ আগস্ট মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসছেন। বেসরকারী রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের বিষয়টি তারা চূড়ান্ত করবেন। বেসরকারী পর্যায়ে কর্মী নিয়োগের জন্য কি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে তা মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদল এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ঠিক করবেন। মন্ত্রণালয় বলছে, বিভিন্ন দেশে যাওয়ার জন্য যে সব কর্মী রেজিস্ট্রেশন করেছেন, যাদের স্মার্ট কার্ড দেয়া হয়েছে তাদের মধ্য থেকে কর্মী নিয়োগ হবে। এ রকম কর্মীর সংখ্যা ১৪ লাখের বেশি। মালয়েশিয়া কতসংখ্যক বেসরকারী জনশক্তি রফতানিকারক এজেন্সি দিয়ে এ সব কর্মী নেবে সেই সংখ্যা এখনও জানায়নি। ১০ আগস্ট এ সব বিষয় আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসি জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা কর্মী পাঠানোর বিষয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। এখন কাউন্টার পার্ট (মালয়েশিয়া) কবে নাগাদ কি প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগ করবে তা আগামী বৈঠকে চূড়ান্ত করা হবে। দেশের জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদল যদি বলে যেসব প্রতিষ্ঠানের সুনাম আছে তাদের দিয়েই জনশক্তি রফতানি করতে হবে। এসব বিষয় নিয়েও ভাবছি। মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদল এলেই সব কিছু চূড়ান্ত হবে। মালয়েশিয়ায় সরকারীভাবে কর্মী পাঠানোর জন্য আগ্রহীদের যে তালিকা আগে তৈরি করা হয়েছে, সেখান থেকেই বাছাই করে তাদের পাঠানো হবে।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমবিষয়ক কর্মকর্তা বলেন, এখানে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে যে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজনেস টু বিজনেস (বি টু বি) প্রক্রিয়া হবে অন্যতম প্রধান পদ্ধতি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ১৪ লাখ কর্মী যারা রেজিস্ট্রেশন করেছেন মালয়েশিয়া আসার জন্য, আমরা সেখান থেকে কর্মী নিয়োগ করব। তাছাড়া মালয়েশিয়াতে এ কর্মী নিয়োগ করা হবে অনলাইনের মাধ্যমে। উভয়পক্ষ একমত হয়ে এই পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ করলে খরচ অনেক কম হবে। মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের বিষয়ে সরকার যে সমালোচনার সম্মুখীন হয় তার পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া সরকারের প্রস্তাব অনুসারে বিটুবি পদ্ধতি মেনে নেয়া হয়েছে। বিটুবি পদ্ধতি যাতে প্রতারণা ও শঙ্কামুক্ত হয়, তা নিশ্চিত করতে উভয়পক্ষ মিলে বিষয়টি নিয়ে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি এ সব নিশ্চিত করবে। যাতে পরে কোন ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে না হয়। তবে সরকার টু সরকারের মাধ্যমেও কর্মী নিয়োগ চলবে। বেসরকারিভাবেও যাতে কম খরচেই কর্মীরা মালয়েশিয়া যেতে পারেন এ বিষয়টিও মাথায় রাখা হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, ডাটাবেজ পদ্ধতিতে নিবন্ধিত কর্মী থেকেই কর্মী নিয়োগ করবে দেশটির কর্তৃপক্ষ। জনশক্তি রফতানিকারকরাও নিবন্ধনের বাইরে থেকে কোন কর্মী পাঠাতে পারবেন না। নিবন্ধিত কর্মীদের মধ্য থেকে কর্মী নিয়োগ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বচ্ছতা। এটা হলে কোন কোন অসাধু আদম ব্যবসায়ী সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নিতে পারবে না। মালয়েশিয়া কর্মী নিয়োগে সোর্স কান্ট্রি হিসাবে বাংলাদেশকে ঘোষণা দিয়েছে। কর্মী নিয়োগ করতে হলে বাংলাদেশ থেকে তাদের কর্মী নিতে হবে। বর্তমানে ১৫টি দেশ থেকে মালয়েশিয়া কর্মী নিয়োগ করছে। এই ১৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম স্থানেই রয়েছে। বাংলাদেশের কর্মীদের কর্মদক্ষতা, নিষ্ঠা, পরিশ্রম, সততা রয়েছে। বাংলাদেশের কর্মীদের মধ্যে এমন গুণ থাকায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কয়েক বছরে ১৫ লাখ কর্মী নিয়োগ দেবে। গোটা দুনিয়াতেই বাংলাদেশী কর্মীদের সুনাম রয়েছে। ১৯৭৬ সালে ২ হাজার ৭২৫ নিয়োগের মাধ্যমে জনশক্তি রফতানি যাত্রা শুরু। বর্তমানে বাংলাদেশের জনশক্তির বাজার রয়েছে ১৬২টি দেশে।

সূত্র জানিয়েছে, গত মাসের শেষ দিকে বিদায়ী প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিএমইটির কর্মকর্তা মিলে মোট সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল দেশটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকটি বিষয়েও আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে নিরাপত্তার বিষয়টিও রয়েছে। তিন দিনের এই সফরে ইতিবাচক সাড়া আসায় মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, মালয়েশিয়ার বাজারে দ্রুতই কর্মী নিয়োগ হবে। সাগর পথে মানবপাচারের ঘটনায় থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় গণকবর আবিষ্কার হওয়ার পর এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের কোন উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের মালয়েশিয়া সফর। জি টু জি পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগে ধীর গতির বিষয়টি আলোচনার বড় ইস্যু হিসাবে ছিল। যে কারণে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পথে মালয়েশিয়া পাড়ি দিচ্ছেন। যাতে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে আর কাউকে যেতে না হয় তার জন্য স্থায়ী একটি সমাধানে চলে এসেছে দুই দেশ।

সূত্র জানিয়েছে, দেশের অন্যতম শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। কিন্তু দেশের কতিপয় অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি এবং মালয়েশিয়ার আউটসোর্সিং কোম্পানি যেনতেন প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতে থাকায় দেশটি ২০০৯ সালে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে দেয়। ওই সময়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী হিসাবে গমনে ইচ্ছুক বহু মানুষ প্রতারণার শিকার হন। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে আড়াই লাখ থেকে চার-পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নিলেও ভাল কোন চাকরির ব্যবস্থা করতে পারেনি তারা। এই অসহনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে ২০১২ সালের ২৬ নবেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সরকার জিটুজি চুক্তি সই করে। জিটুজি চুক্তির অধীনে মালয়েশিয়ায় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় ৯০০ রিঙ্গিত (প্রায় ২১ হাজার ৬শ’ টাকা)। কর্মীরা মাত্র ৩০ হাজার টাকা খরচ করেই মালয়েশিয়া যেতে পেরেছেন। জিটুজি চুক্তি হওয়ার পর থেকে গত আড়াই বছরের বেশি সময়ে মাত্র পাঁচ হাজারের মতো কর্মী সরকারীভাবে মালয়েশিয়ায় পাঠানো সম্ভব হয়েছে। এসব কর্মী পাঠানো হয় শুধু প্লান্টেশন খাতে। বনায়ন বা পামগাছ রোপণ ও পরিচর্যা খাতে, যা অপেক্ষাকৃত কষ্টকর কাজ। তার বিপরীতে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে সমুদ্রপথে নৌকাযোগে ২০১৪ সালেই ৫০ হাজারের বেশি মানুষ মানবপাচারকারীদের হাত ধরে মালয়েশিয়া গেছে। এসব কারণ বিবেচনা করে মালয়েশিয়া বেসরকারীভাবে কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।