২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাকাচৌর রায় ও আদালত অবমাননা

  • মুনতাসীর মামুন

বিচারকরা যেদিন ঘোষণা করলেন সাকাচৌর মানবতাবিরোধী অপরাধের রায় ঘোষণা করা হবে ২৯ জুলাই, সেদিন থেকে মানুষ রায়ের জন্য একাগ্রচিত্তে অপেক্ষা করেছে। গোলাম আযমের রায়ের পর সম্ভবত সাকাচৌর রায় নিয়েই মানুষ উদ্বিগ্ন ছিল বেশি। প্রশ্ন উঠতে পারে, আদালতে হাই প্রোফাইল কোন মামলা হলেই সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ। কারণ, এ ধরনের হাই প্রোফাইল মামলার পক্ষে-বিপক্ষে থাকে রাজনৈতিক শক্তিÑ আওয়ামী লীগের পক্ষের আর বিপক্ষের মানুষজন।

প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন এই উদ্বেগ! উদ্বেগের কারণ, ১৯৭৫ সালে মোশতাক-জিয়া দেশটাকে দু’ভাগে ভাগ করে ফেলেছেন। মানুষের মনোজগত এত সফলভাবে পাকিস্তানীরা ছাড়া আর কেউ বিভক্ত ও প্রভাবান্বিত করতে পারেনি। জিয়া পাকিস্তানী বাঙালী জাতি সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন মনোজগতে অস্ত্রোপচার করে এবং তাতে সফলও হয়েছেন। বিচারক, সাংবাদিক, শিক্ষক, সরকারী কর্মচারী সবাই এখন দু’ভাগে বিভক্ত। আপনি বিষয়টি অস্বীকার করতে পারেন; কিন্তু সেটা হবে বাস্তবকে বা সত্যকে অস্বীকার। সে কারণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কোন বিষয় আলোচনায় এলেই দুটি ভাগ হয়ে যায়। টাকা পয়সার ক্ষেত্রে নয়।

জিয়াউর রহমান আরেকটি কাজ করেছিলেনÑ তা হলো টাকার খেলা। তার দর্শন ছিল, যে কোন মানুষকে টাকা দিয়ে, পদ দিয়ে কেনা যায়। এবং সেটা তিনি প্রমাণও করে গেছেন। এটিও কী অস্বীকার করবেন? এর ধারা কি এখনও চলছে না।

উচ্চ আদালতের অনেক রায় চরম বিতর্কিত হয়েছে, বিচারপতিরাও যখন পদ বা রাজনীতিমনস্ক হয়েছেন। বিচারপতিদের তো নিযুক্তি দেয় সরকার, সামরিক, বিএনপি-জামায়াত বা আওয়ামী লীগ। তারা যখন বিচারক নিয়োগ করেন তখন রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার থাকে না, এটি বলাও বাস্তবকে অস্বীকার। কিন্তু তারপর? এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করতে পারি। খালেদা জিয়া-নিজামী সরকার আমাকে ও শাহরিয়ারকে গ্রেফতার করে। মুক্তি পেয়ে আমি এবং শাহরিয়ার কবির ৫৪ ধারা, রিমান্ডের অপব্যবহার ও অন্যায় গ্রেফতার-নির্যাতনের জন্য হাইকোর্টে মামলা করি। আমাদের আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। তিনি চমৎকারভাবে শুনানি করেছিলেন এবং মনে হচ্ছিল বেঞ্চ আইনী যুক্তিগুলো মেনে নিচ্ছেন। যেদিন রায় দেয়া হবে সেদিন আদালত সম্পর্কে একটি বিবৃতি ছাপা হয়েছিল দেশের খ্যাতিমান শিল্পী-সাহিত্যিকদের। স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে আমার ও শাহরিয়ারের নামও ছিল। বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারক রায় দেয়ার ঠিক আগে জ্যেষ্ঠ বিচারক হামিদুল হককে জানালেন, তিনি বিব্রত বোধ করছেন। আমরা জানতাম বিএনপি আমলে তিনি নিযুক্ত, তখনও কনফার্মড হননি। কিন্তু, আমরা কখনও প্রশ্ন তুলিনি বা ভাবিনি যে তিনি বিচারের সময় কোন পক্ষ নেবেন। তখন কিন্তু বিএনপি আমল। বিচারপতি হামিদুল হক বলেছিলেন [যথাযথ উদ্ধৃতি নয়], আমরা সবাই তো রাজনৈতিক সরকার দ্বারা নিযুক্ত। তাতে কী হয়েছে। নিযুক্তির পর তো আমরা বিচারক, তখন তো আমাদের বিবেক অনুযায়ী বিচার করতে হবে। উক্তিটি যথাযথ আমরা মানি। সে মামলা আর আদালতে তোলা যায়নি। আমাদের আইনজীবী আর আগ্রহী ছিলেন না এই মামলায়। আমরা অনেকবার তাকে অনুরোধ করেছি। কারণ, আইনের কয়েকটি বিষয় সেখানে পরীক্ষিত হতো, মামলার শুরুতে তিনি তাই বলেছিলেন।

যা হোক সে কথা, কিন্তু আমরা যদি বলি রাজনৈতিক কারণে বিচারক বিব্রত হয়েছিলেন তা কি আদালত অবমাননা হবে? কারণ, সুযোগ তো তিনিই করে দিয়েছেন। বিচারপতি মুনএমের পর প্রায় সব [ব্যতিক্রম আছে] প্রধান বিচারপতিই বিতর্কিত হয়েছেন। কেন? সেটি কি বিচারকরা ভেবে দেখেন কখনও।

সাংবাদিক ও বিচারকরা এখন সবচেয়ে ক্ষমতাবান। সাংবাদিকরা যা খুশি লিখতে পারেন, কোন অসত্য সংবাদ ছাপলেও কিছু করার নেই। মাহমুদুর নামে বিএনপি নেতা সম্পাদক হয়ে মিথ্যার পর মিথ্যা ছেপে মানুষজনকে প্ররোচিত করেছেন দাঙ্গা-হাঙ্গামায়। কী হয়েছে? বরং তাকে আইনী প্রক্রিয়ায় গ্রেফতার করা হলেও ১৫জন শক্তিশালী সম্পাদক তার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলেন। কারণ, সংবাদপত্রগুলোর মালিকদের স্বার্থ ভিন্ন, তারাও কোন না কোনভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত [অন্তত মানসিকভাবে]।

বিচারকরাও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদালত অবমাননার জন্য যে কাউকে ডাকতে পারেন, শুনানিতে সন্তুষ্ট না হলে দ- দিতে পারেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সবাই ক্ষমা চেয়ে নেন। কারণ, আদালতের হাঙ্গামায় গেলে শান্তি, অর্থ সবই নষ্ট হয়। কিন্তু কিসে আদালত অবমাননা হয়? সেটি নির্ধারণ খালি বিচারকরাই করবেন? সেটি কি একতরফা হয়ে যায় না? আমেরিকায় রাজনৈতিকভাবে বিচারক নিযুক্ত হন। সেখানেও শুনানি ও রায় নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক হয়; কিন্তু আদালত অবমাননা করা হয়েছে তা তারা মনে করেন না। আরেকটি বিষয় আমরা বলিÑ সাবজুডিস। ধরা যাক, ক নামক মানবতাবিরোধীর বিচার চলছে। অনেক খুনের সঙ্গে সে জড়িত। তার মামলা ধরা যাক চলল পাঁচ বছর। এই পাঁচ বছর কি আমরা তার খুনখারাবি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করতে পারব না? এটি কি স্বাভাবিক! আজ যে ১১/১২ জন কুখ্যাত পরিচিত মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত তাদের কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা সাবজুডিস হলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করা যাবে না পাঁচ বছর? এটি কি স্বাভাবিক?

ভুল করে না থাকলে বলি, ফয়সল মাহমুদ ফায়েজি নামে এক বিচারপতির পরীক্ষা সংক্রান্ত নম্বর জালিয়াতি নিয়ে দৈনিক ভোরের কাগজ রিপোর্ট করেছিল। রিপোর্টারকে ‘মানহানিকর বিষয় ছাপার জন্য’ নানা হেনস্থা হতে হয়েছে। বলা হয়েছিল, বিচারকের এসব নিয়ে রিপোর্ট করা অনুচিত। আমার অপরাধ নিয়ে রিপোর্ট ছাপা হলে যদি মানহানিকর না হয়, তা হলে বিচারকের অপরাধ জনসমক্ষে তুলে ধরলে অপরাধ হবে কেন? একটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া উচিত। হার্ড এভিডেন্স না থাকলে বিচারক নিয়ে কেউ কোন মন্তব্য করেন না, তা কাগজে ছাপাও হয় না। এসব বিষয় নিয়ে রাজনীতিবিদ,আইনজ্ঞ, বিচারকদের ভাবনাচিন্তা করা দরকার।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ট্রাইব্যুনালেই শেষ হওয়া উচিত ছিল, সেটি ছিল স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক হলো, তাদের সুপ্রীমকোর্টে যাওয়ার অধিকার দেয়া। এই অস্বাভাবিকতার উৎস ডিফেন্স মেকানিজম। জিয়া-খালেদা-এরশাদ-নিজামী এমন অবস্থার সৃষ্টি করেছিলেন, রাজনীতিকে টাকা দিয়ে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিলেন, ক্রিমিনালদের এমন শক্তিশালী করে তুলেছিলেন যে, তারা যখন যার বিরুদ্ধে যে কোন ব্যবস্থা নিতে পারতেন এবং তা যৌক্তিক বলে মনে করা হতো। আওয়ামী লীগ আমলে কোন কিছু করার আগে ভাবা হতো বা এখনও হয় যে, এটি কি যৌক্তিক মনে হবে, মানুষজন কি তা গ্রহণ করবে? জিয়া, খালেদা, নিজামী ও এরশাদ ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’কে দলীয় সেøাগান বলে তুলে ধরেছেন। যে কারণে কোন সভায় কেউ যদি জয় বাংলা বলেন তখন ধরে নেয়া হয় যে, তিনি দলীয় ব্যক্তি। এবং এখনও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেকে খোলা গলায় জয় বাংলা বলতে পারেন না। শিল্পী হাশেম খান আমাকে বলেছিলেন, বিএনপি আমলে এক ‘টকশো’তে বক্তব্য শেষে বলেছিলেন ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’। সঞ্চালক বলেছিলেন, ‘হাশেম তুমি তো ঝামেলায় ফেললে।’ সঞ্চালক সজ্জন ব্যক্তি, সবার শ্রদ্ধার পাত্র, আওয়ামী লীগ তাকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেছে। এই হলো আমাদের অবস্থা।

আপনাদের মনে হতে পারে আমি প্রসঙ্গ থেকে অনেক দূরে সরে এসেছি, তা নয়, পরবর্তী আলোচনা যাতে স্পষ্ট হয় তার জন্য পটভূমি হিসেবে প্রসঙ্গগুলো তুলে ধরলাম।

দেশটি ছোট, পরস্পর সবাইকে চেনেন, তার মন জানেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার যখন সুপ্রীমকোর্টে যায় তখনই মানুষ নানা প্রশ্ন করতে থাকে। কে কোন্ বিষয়ে রায় দেবেন সেগুলো আগেই আলোচিত হতে থাকে। বিশেষ করে প্রভাবশালী ও অর্থশালী হলে সন্দেহ বাড়তেই থাকে। যেমন, গোলাম আযমের মৃত্যুদ- হবে না এ বিষয়টি সবাই আলোচনা করেছিলেন। আদালত সে রায়ই দিয়েছিলেন, কারণ হিসেবে যা দেখিয়েছেন তা মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশে বিবেচিত হয় না। সাঈদীর ফাঁসি হবে না, এটিও আলোচিত হয়েছে। হয়নি। কারণ, বিচারকরা মনে করেছেন, যথেষ্ট প্রমাণ ছিল না। আমরা বলতেই পারি, তাদের বিবেচনা যথার্থ নয়। ট্রাইব্যুনালের আইনটিই এমন যে, সেখানে এভিডেন্স এ্যাক্ট প্রযোজ্য নয়। ফৌজদারি মামলার মানসিকতা থেকে বিচারকরা বেরুতে পারেননি। যুদ্ধের সময় ধর্ষণের সাক্ষী কোথায় পাওয়া যাবে? বা গণহত্যার? তবুও রায় তো আমরা মেনে নিয়েছি।

মানবতাবিরোধী অপরাধে গ্রেফতারকৃতদের সবাই যত সুযোগ দিয়েছেন, দেন, এমনকি সরকারও, সেটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কেউ পায়নি, পায় না। গোলাম আযম কি আমিরি হালে বন্দীজীবন কাটাননি? সরকার থেকে বলা হলো, ছয় মাসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি বাঞ্ছনীয়। আদালত তা মানেনি। রিভিউর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আমরা তো কিছু বলিনি। কিন্তু ক্ষুব্ধ হয়েছি এ কারণে, মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত বিষয়কে আদালত অন্য দশটা পাঁচটা মামলার মতো বিবেচনা করেনি। হয়ত ডিফেন্স মেকানিজম থেকেই বিবেচনাটি এসেছে। আমরা মানবতাবিরোধী সর্বোচ্চ দ- চেয়ে অবশ্যই বিবৃতি দিতে পারি, সেøাগান দিতে পারি, মিছিল করতে পারি। তা কেন সাবজুডিস বা ইন্টারফেয়ারেন্স হিসেবে বিবেচিত হবে। আদালত কি এতই ঠুনকো যে, আমাদের একটি সেøাগান বা মিছিলে ব্যতিব্যস্ত বা প্রভাবিত হবে? বিভিন্ন সময় এসব বিষয় আলোচনায় এসেছে, তাই প্রসঙ্গগুলো আলোচনা করলাম।

(চলবে)