১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ রাজন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

  • লিয়াকত হোসেন খোকন

লেখার ইচ্ছে ছিল দ্বিতীয় প্রসঙ্গটি নিয়ে। কিন্তু লিখতে বসেই প্রথম প্রসঙ্গ অর্থ্যাৎ সিলেটের শিশু সামিউল ইসলাম রাজনের নির্মম নিষ্ঠুর নির্দয় হত্যাকা-ের ঘটনাটি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। মন কুঁকড়ে কুঁকড়ে কেঁদে উঠে। এই নিষ্ঠুরতম হত্যাকা-টি আমাকে খুব ব্যথিত করেছে। বার বার মনে হচ্ছিল এই জন্য, এই দৃশ্য দেখার জন্যই কি দেশ স্বাধীন হয়েছিলো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গে আমিও খালি হাতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। আমার বাবাসহ ৩০ লাখ মানুষ অকাতরে শুধু স্বাধীন সার্বভৌম একটি বৈষম্যহীন, শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের জন্য জীবন দিয়েছে। নয় মাস এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এ জন্যই কি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। শিশু রাজনকে যখন নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয় তখন আমি মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে। টিভির পর্দার শিশু রাজনের হত্যার কথাটি শুনলাম তখন নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলাম না। নীরবে কখন যে চোখ দিয়ে টলমল করে পানি পড়ছে তা আমি নিজেও জানি না। কোন মৃত্যুজনিত কারণে আমি আমার জীবনে চার বার কেঁদেছি। অথচ যুদ্ধের সময় অনেক কাছে থেকে মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছি কিন্তু চোখের পানি পড়েনি। সে মৃত্যু ছিল মানুষের হাতে পৈশাচিক পশুর মৃত্যু। সেটা ছিল পাকিস্তানী পিশাচ ও এ দেশের বিশ্বাস ঘাতক নরপিশাচ রাজাকারদের মৃত্যু। আগেই বলেছি জীবনে মৃত্যুজনিত কারণে চার বার কেঁদেছি, আর তাহলো আমার প্রাণপ্রিয় বাবাকে যখন রাজাকাররা হত্যা করেছিল, যখন ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে বিশ্বাসঘাতক নরপিশাচরা হত্যা করেছিল, যখন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যার অক্লান্ত পরিশ্রমে এবং বিচক্ষণতা জাতির জনককে পাকিস্তানীদের কারাগার থেকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিল সেই ভারতের মহীয়সী নারী ইন্দিরা গান্ধীকে ১৯৮১ সালে যখন একদল বিশ্বাসঘাতক হত্যা করেছিল এবং শেষবার সিলেটের রাজনের মতো একজন নিরীহ শিশুকে নিষ্ঠুর-নির্মমভাবে গাছের সঙ্গে বেঁধে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছিল। আমি একজন অতি দুর্বল মনের মানুষ। রাজনের হত্যার ২৮ মিনিটের নিষ্ঠুর হত্যাকা-টি ভিডিও চিত্রটি দেখার সাহস করিনি। শুধু ভেবেছি এই রাজন যখন এই পৃথিবীর সমস্ত মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে এক অচীন দেশে পাড়ি জমায় তখন সে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তার মনের ভেতর ঠিক কি চিন্তা কাজ করেছিল তা আমরা হয়ত কোন দিন জানব না। কি নিষ্ঠুর ও নির্মম পৃথিবীর প্রতি গভীর অভিমান তার বুকের ভেতর হাহাকার করছিলো। আমরা কি কখনও এই হাহাকার থেকে মুক্তি পাব?

এবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা কিছু লিখে পাঠকের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিজে একটু হাল্কা হওয়ার প্রয়াস করছি। আমার গ্রামের বাড়ি বাগেরহাট। তাই ঢাকা-মাওয়া রোড দিয়ে বাড়িতে যাওয়া-আসা করি। একবার মাওয়া ফেরিঘাট গিয়ে আমার গাড়ি একটা ভিআইপি ফেরিতে উঠতে গেছি। দেখি ফেরিতে একটি মাত্র গাড়ি ওঠার জায়গা আছে। ফেরির লোকদের অনুরোধ করে আমি ফেরিতে উঠতে গেছি। ফেরিতে ওঠার সময় মাঝখানে দেখি লাল সবুজের পতাকা পত পত করে উড়ছে একটা গাড়িতে। ফেরির লোকদের কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ফেরিতে একজন মন্ত্রী যাচ্ছেন এবং তিনি একজন সর্বজনবিদিত রাজাকার। তখন আমি ফেরির লোকদের বললাম ভাই আমার সঙ্গে আরও লোক এবং গাড়ি আছে আমি এই ফেরিতে যাব না। গাড়ি ঘুরালাম এবং পরবর্তীতে তিন ঘণ্টা পর অন্য ফেরিতে মাওয়া ঘাট অতিক্রম করি।

আমরা কি একজন রাজাকারের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। বাংলার ৩০ লাখ মানুষের রক্তস্নাত লাল সবুজের পতাকাটি কি একজন রাজাকার মন্ত্রীর গাড়িতে পত পত করে উড়তে দেয়ার জন্য যুদ্ধ করেছিলাম। তাই বিবেকের তাড়নায় সেদিন ওই ফেরিতে উঠিনি। এটাই আমার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আমাকে যদি বলা হয় একজন রাজাকারকে ভোট দিলে তোমাকে বাংলাদেশের মন্ত্রী বানানো হবে আর ভোট না দিলে তোমাকে ফাঁসি দেয়া হবে, আমি হাসতে হাসতে জীবনের জয়গান গেয়ে ফাঁসির মঞ্চে উঠবো। জাতির জনকের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলে যাবÑ আমি বাঙালী, আমি মুসলমান একবার মরে দু’বার নয়। এটাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

দুঃখ হয় আমাদের রণাঙ্গনের কিছু সাথী সামান্য অর্থ আর ক্ষমতার লোভে সেই রাজাকার মন্ত্রিসভার সদস্য হতে দ্বিধাবোধ করেনি। অথচ তারা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জীবনবাজি রেখে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই আমরা তো রাজাকার-আলবদরদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি। বাংলার ৩০ লাখ মানুষের রক্তস্নাত লাল সবুজের পতাকা রাজাকার-আলবদরদের গাড়িতে তুলে দেয়ার জন্য বাংলার ৩০ লাখ মানুষ তাদের বুকের রক্ত ঢেলে দেয়নি। আমি চোখের সামনে দেখেছি মুক্তিযুদ্ধ আর বাংলাদেশকে ভালবেসে পুরো একটি প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। তাহলে মানুষকে ভালবেসে কেন একটি প্রজন্ম গড়ে উঠতে পারে না।

লেখক: আইনজীবী ও মুক্তিযোদ্ধা, বাগেরহাট