২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছিটে উড়ছে ৬৮ ফুট লাল-সবুজ পতাকা

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ বিলুপ্ত ছিটমহলের নারী-পুরুষ-শিশু এখন ভাসছে আনন্দ জোয়ারে। বাংলাদেশের নয়া নাগরিকরা লাল-সবুজ পতাকা হাতে মুখে সেøাগান তুলেছে জয় বাংলা। নীলফামারী, পঞ্চগড় ও লালমনিরহাটের ছিটমহল থেকে ফিরে স্টাফ রিপোর্টার ও নিজস্ব সংবাদদাতাদের পাঠানো প্রতিবেদন।

নীলফামারী ॥ জয়বাংলা সেøাগান যেন বিলুপ্ত ছিটবাসীদের কাছে স্বপ্ন বারুদে পরিণত হয়েছে। ছিটের বর্তমান প্রজন্মের টগবগে তরুণদের সেøাগান আর প্রবীণদের আনন্দাশ্রুতে সিক্ত হয়ে চলেছে নতুন বাংলাদেশের বিলুপ্ত ছিটের মাটি। মুক্তির আনন্দে তারা তৈরি করেছে ৬৮ ফিট দীর্ঘ লাল-সবুজের বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ, জয়বাংলা বলতে পারার স্বাধীনতা অর্জনে মানুষগুলো পাগলপ্রায়। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা কাটিয়ে ১১১টি ছিটমহলের অধিবাসী পেলেন নতুন পরিচয়, নতুন সোনার বাংলাদেশ।

৬৮ বছরের বন্দীদশা থেকে ছিটবাসীর তকমা ঘোচার সেই ৩১ জুলাইয়ের মধ্য রাতের পর থেকে আনন্দধারা যেন থামছে না। কতদিন চলবে এই আনন্দ উৎসব তাও ঠাওর করতে পারছে না নিজেরাই। ঘরে ঘরে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা শোভা পাচ্ছে। আর এই জয়ের আনন্দকে তারা দেখছেন স্বাধীনতার বিজয়ের মতো। তাই নিজের পরিচয় খুঁজে বিলুপ্ত ছিটবাসীরা ভাসছে আনন্দের জোয়ারে। এ বিজয় তাদের কাছে ভিন্ন মাত্রার বলেই তারা সেøাগান তুলেছে আর নয় ছিটবাসী আমরা এখন বাংলাদেশী -জয়বাংলা- জয় বঙ্গবন্ধ- জয় শেখ হাসিনা।

বড়খানকী খারিজা গীতালদহের মিজানুর রহমান বললেন ভারত-বাংলাদেশের সেই সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হলো বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। আর তাকে সব থেকে বড় সহায়তা করেছে ’৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি। তাই আমাদের কাছে এই মহান মানুষগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সেøাগানে বারবার সেই কৃতজ্ঞতা থাকছে। ১১১টি ছিটের বর্তমানের প্রায় ৪২ হাজার মানুষ এখন বাংলাদেশী। তাই কোন কিছুর ভয় তাদের নেই। তাদের সেøাগানে দেশকে এগিয়ে নেয়ার স্বপ্ন। আর জয়বাংলা সেøাগান সেই এগিয়ে নেয়ার স্বপ্নবারুদ। পাটগ্রামের ছিটের নতুন প্রজন্মের টগবগে তরুণরা তাদের ৬৮ বছর পর মুক্তির উল্লাসে তৈরি করেছে দীর্ঘ ৬৮ ফিট লাল সবুজের বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। এই পতাকা যেন তাদের আগামী দিনের স্বপ্নের সিঁড়ি। পতাকা ছুয়ে শপথ নিয়েছে তারা মানুষের মতো মানুষ হয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে সুসঙ্গতভাবে বেঁচে থাকার। নগদ জিগাবাড়ির তোফাজ্জল হোসেন বললেন এ যে কত আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আমার পিতা মোফাজ্জল হোসেন ২০০৮ সালের ১ আগস্ট পৃথিবী ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে গেছেন। তিনি নাগরিকহীন আজাইরা হিসেবে পৃথিবী ছেড়েছেন। তার এই মৃত্যুর দিনটির ৭ বছর পর আমরা আজাইরা থেকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেলাম। আমার মৃত পিতা কবরে শুয়ে দেখছেন ছিটের বাড়িতে বাড়িতে উড়ছে বাংলাদেশের লাল সবুজের জাতীয় পতাকা। তোফাজ্জল হোসেন এসব ডুকড়ে কেঁদে ওঠেন। বললেন মানুষ হয়ে শুধু মানুষের জন্য নয়, পুরো ছিটমহলের নারীপুরুষ-শিশুকে কোলে তুলে নিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পঞ্চগড় ॥ মানিক চন্দ্র, জয়, দ্বিজেনরা পরিবার নিয়ে নিজের জন্মস্থান ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ভারতে। ৬-১৬ জুলাই পর্যন্ত জনগণনায় তারা ভারতে যাওয়ার আবেদন করায় তাদের পরিচয় এখন ভারতীয়। কিন্তু কেন জন্মস্থান ছেড়ে ভারতে যাচ্ছেন এসব প্রশ্নের কোন সদুত্তোর দিতে না পারলেও বলেছেন, আত্মীয়-পরিজন সকলেই ওই দেশে তাই যাচ্ছি। এছাড়া বাসস্থানসহ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকার কারণে ভারতে যেতে হচ্ছে। ভারতে গেলেও জন্মস্থানের জন্য মন কাঁদবে। হাজারো হোক নাড়ির টান। এরপরও ভাল সুযোগ-সুবিধা, সুন্দরভাবে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার কারণেই চলে যাচ্ছি।

জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী জেলার ৩৬টি ছিটমহল থেকে ৬-১৬ জুলাই পর্যন্ত ৪৬৭ এবং পরবর্তীতে আরও ৫৯ জন ভারতে যাওয়ার জন্য আবেদন করেন। তবে দু’দেশের জনগণনা প্রতিনিধি দলের সমন্বয়কারী অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্র্রেট গোলাম আযম জনকণ্ঠকে বলেছেন, পূর্বের ৪৬৭ জনই এখন পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে ভারতের অধিবাসী হতে যাচ্ছেন। পরে যারা আবেদন করেছিলেন তাদের যাওয়া না যাওয়ার বিষয়টি দু’দেশের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

লালমনিরহাট ॥ রবিবার সকাল ১১টায় ভারতের চ্যাংরাবান্ধা বন্দরে উভয় দেশের জেলা প্রশাসক পর্যায়ে অধুনাবিলুপ্ত ১১১ ছিটমহলের ভূমি নিয়ে যৌথ জরিপ পরিকল্পানার বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়নি। ৫ আগস্ট হতে পারে। অধুনাবিলুপ্ত ছিটমহলে বাংলাদেশের নাগরিকদের দেশের প্রচলিত আইন সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে। ছিটমহলে উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা। নৌকা প্রতীক। ’৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিজয় উল্লাস দেখেছে, তারা বলছে ৪৪ বছর পর লালমনিরহাট জেলাবাসী আরেকটি বিজয় উল্লাস উপভোগ করছে। রবিবার ১১১টি ছিটমহলে এখনও উৎসবের আমেজ চলছে। ছিটমহলগুলোতে বিয়ে, শুভেচ্ছা বিনিময় ও স্বজনদের ছিটমহলের আত্মীয়র বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার ধুম পড়ে গেছে।

বিলুপ্ত ছিটের নারী-পুরুষদের মধ্যে বিয়ের ধুম পড়ে গেছে। পাটগ্রামের অধুনাবিলুপ্ত ১৩২ নম্বর ছিটমহলে রতন মিয়ারসহ কয়েকটি ছিটমহলে নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ের ধুম পড়ে গেছে। এখন তাদের পরিচয় সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশের বিয়ে রেজিস্ট্রার আইনে কাজী সাহেব বিয়ে রেজিস্ট্রার করছে। জেলা সদর অভ্যন্তরে কুলাঘাটে অধুনাবিলুপ্ত বাঁশপেচাই ছিটমহলে রবিবার গিয়ে দেখা গেছে জনৈক বৃদ্ধ লালসবুজের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করছেন। এখন হতে প্রতিদিন এখানে পতাকা উত্তোলন হবে। কারণ এখানে সরকারীভাবে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা হয়েছে। যতদিন স্কুলের কাজ শুরু না হচ্ছে ততদিন এই বৃদ্ধ জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে রাখবেন। ছিটমহলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ঘুরতে যাচ্ছে। তারা স্থানীয় ছিটমহলের জনতাকে নানা উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা দিচ্ছে। ছিটমহলে মসজিদ, মন্দির, ঈদগাঁও মাঠ নির্মাণে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।