২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পোশাকে ভেষজ রঙের ব্যবহার

  • আবু সুফিয়ান কবির

বিশ্বব্যাপী আজ একটি সেøøাগান খুব জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে তা হলো ‘পরিবেশ বাঁচাও’। আর পরিবেশ দূষণের অনেক মাধ্যমের একটি হচ্ছে রং। অবশ্যম্ভাবীভাবে কেমিক্যাল রং। এই রং আধুনিক যুগে পাল্টে দিয়েছে সবই। চারদিকে শুধু চোখ ধাঁধানো রঙের জৌলুস। বিশেষভাবে পোশাকে রঙের ব্যবহারের ফলে ডিজাইনাররা যে বিপ্লবের সৃষ্টি করেছে তা সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

বিশ্বব্যাপী পোশাক শিল্পের রয়েছে বিরাট কদর। আর এই শিল্পকে মহিমাম্বিত করেছে রং। যুগ যুগ ধরে কেমিক্যাল রং ব্যবহার করে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এখন মানুষ পরিবেশ দূষণের হাত থেকে বাঁচতে কেমিক্যাল রঙের বিকল্প রং হিসেবে বেছে নিচ্ছে ভেষজ বা প্রাকৃতিক রং। ভেষজ রং ব্যবহারে রয়েছে নানা সুবিধা। যেমন এই রং দেশীয় গাছপালা থেকে পাওয়া যায়, এই রং ত্বকে কোন প্রকার এলার্জি করে না, ত্বক ঠা-া রাখে এবং এর বর্জ্য সহজে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। এই সব বিবেচনায় বিশ্বব্যাপী ভেষজ রং ও হাতে বোনা তাঁতের কাপড়ের কদর বাড়ছে। বাংলাদেশের ভেষজ রঙের ব্যবহার শুরু হয় ১৯৮১ সাল থেকে। তখন ভেষজ রং নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু হয়। বলা যায় রুবী গজনবী এই রং তৈরি ও ব্যবহার প্রক্রিয়া মানুষকে শিখাতে শুরু করেন। মূলত তিনিই বাংলাদেশে ভেষজ রং তৈরি ও প্রচলনের প্রধান উদ্যোক্তা। এখনও তিনি তার অরণ্য প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে ভেষজ রং দেশী বিদেশী ক্রেতাদের হাতে পৌঁছে দতে সক্ষম হয়েছেন। পরবর্তীতে অরণ্য বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের অধীনে চলে গেলে এর ব্যাপকতা আরও বেড়ে যায়। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা ভেষজ রং উৎপাদনকারী গাছ চিহ্নিতকরণ, গবেষণা ও রং তৈরির কাজে এগিয়ে আসেন। কিন্তু তখনকার প্রেক্ষাপটে সেই সহযোগিতা যথেষ্ট ছিল না বলেই কুমুদিনীর মিসেস জয়াপতী প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার, পণ্য তৈরিতে উদ্বুদ্ধ ও তৈরি পণ্যের বাজারজাতকরণে এগিয়ে আসেন। এর ফলে ক্ষণিকে পাল্টে যায় প্রেক্ষাপট। অনেকে ভেষজ রং প্রক্রিয়াজাতকরণে ও ভেষজ রঙের পণ্য তৈরিতে আগ্রহী হলেন। কেননা কুমুদিনী সেই সব পণ্য কিনতে আগ্রহী ছিল। শুধু বাজারজাতকরণে নয়, বিভিন্নভাবে পণ্য তৈরিকারকদের উৎসাহ দেয়া হতো। ১৯৮৬ সালে ভেষজ রঙের তৈরি পণ্যের একটি প্রদর্শনী হয় শিশু একাডেমিতে। সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রয়াত বেগম সুফিয়া কামাল সেই প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন এবং অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের সার্টিফিকেট প্রদান করেন। সেই মেলা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ভেষজ রঙের বিষয়টি তখন থেকেই মানুষের সামনে উন্মোচিত হয় ব্যাপকভাবে। কুমুদিনী তখন ভেষজ রঙের পণ্য বিপণনের একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে। সৃষ্টি করে বিদেশের বাজার। পরিবেশবান্ধব বলে বাংলাদেশের তৈরি ভেষজ রঙের পোশাক বিদেশেও বেশ বাজার করে নেয়।

বর্তমান পেক্ষাপটে পরিবেশ রক্ষার তাগিদে আবার সচেতন মানুষ ভেষজ রঙের প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে বাংলাদেশের তাঁত বস্ত্র ও প্রাকৃতিক রঙের কদর বাড়ছে। কেননা হাতে বোনা তাঁতের কাপড়ে কোন তেল বা বিদ্যুত ব্যবহার করা হয় না। ফলে বস্ত্র উৎপাদনে পরিবেশের ওপর কোন ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে না। তাছাড়া প্রাকৃতিক রং যেমন গাছের কা-, ফল, ফুল, পাতা, ফলের বিচি, শিকড়, বাকল ও নির্যাস থেকে পাওয়া যায় এবং পরিবেশবান্ধব ও এর বর্জ্য মাটিতে মিশে যায় বলে আস্তে আস্তে মানুষ কেমিক্যাল রঙের পরিবর্তে ভেষজ রঙের প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে এখন পোশাকে ভেষজ রং ব্যবহারে বুটিক হাউসগুলো বেশ উদ্যোগী হচ্ছে। ভেষজ রং নিয়ে চলছে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা। বাংলাদেশে ভেষজ রং উৎপাদন ও প্রচলনের ২৫ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে উদ্যোক্তারা গবেষণা করে যে সব গাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের রং পেয়েছে তার কিছু নমুনা এখানে তুলে ধরা হলো। গাছের অংশ থেকে প্রাপ্ত রংগুলোর মধ্যে আছে খয়ের গাছের কাঠের কষ থেকে মেরুন/খয়েরী, কাঁঠাল কাঠের ভুসি থেকে হালকা হলুদ, লটকন বীজ থেকে কমলা, ডালিম ফলের খোসা থেকে খাকি, গাব ফল থেকে গোলাপী, শিউলী ফুল থেকে হলুদ, গাঁদা ফুলের পাপড়ি থেকে গাড় সোনালী, বাবলা গাছের ছাল থেকে বাদামী, হরীতকী গাছের ছাল থেকে এ্যাশ/সোনালী, মনজিৎ গাছের কা- ও মূল থেকে লাল, অর্জুন গাছের ছাল থেকে ফলসাই গোলাপী, গোরান গাছের ছাল থেকে গোলাপী, পাওয়া কাঠের ভুসি থেকে হালকা গোলাপী, সুন্দরী গাছের ছাল থেকে গাঢ় গোলাপী, নীল পাতা থেকে গাঢ় ও হালকা নীল ও সবুজ, সুপারি থেকে গাঢ় গোলাপী, শিলকড়াই কাঠের ভুসি থেকে গাঢ় সোনালী, ইউক্যালিপ্টাস পাতা থেকে এ্যাশ, এলাচি পাতা থেকে গোলাপী, ঝাউ গাছের ছাল থেকে গাঢ় গোলাপী, লেবু ঘাস পাতা থেকে হালকা সবুজ, পেঁয়াজ খোসা থেকে গাঢ় সোনালী, মেহেন্দী পাতা থেকে সোনালী, কৃষ্ণচূড়া পাপড়ি থেকে হালকা সবুজ, গর্জন কাঠের ভুসি থেকে হালকা বাদামী, ডালিয়া পাপড়ি থেকে কমলাই সোনালী, তুলসী পাতা থেকে হলদে সবুজ, চাপা পাতা থেকে হালকা জলপাই, চা পাতা থেকে হালকা বাদামী রং পাওয়া গেছে। এছাড়া কাঠবাদামের কাঠ, তেঁতুল কাঠের ছাল, পলাশ ও শিমুল ফুল দিয়ে আবিষ্কার হয়েছে আরও কয়েকটি রং।

বাংলাদেশে কিছু প্রতিষ্ঠান ভেষজ রঙের পোশাক ও পণ্য প্রদর্শনী করছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে কুমুদিনী, অরণ্য, টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির, প্রবর্তনা, প্রশিকা, বনজ, কে ক্র্যাফটস, অঞ্জনস, সেলাইকন, শিশু পল্লী, অয়ন, পিরান, বুলন, ঝিনুকসহ কিছু প্রতিষ্ঠান।

যে সব প্রতিষ্ঠান ভেষজ রং ব্যবহার করে তাদের মূল লক্ষ্য দেশের মানুষকে ভেষজ রঙের পোশাক সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করা, এবং কেমিক্যাল রঙের ক্ষতিকারক দিকটি সবার সামনে তুলে ধরা। ফ্যাশন হাউসগুলোর পোশাক ও অন্যান্য ভেষজ পণ্যের মধ্যে আছে সুতি, হাফসিল্ক, সিল্ক, মসলিন ও জামদানি শাড়ি। পোশাকের মধ্যে আছে সালোয়ার কামিজ, টপস, স্কার্ফ, স্কার্ট, পাঞ্জাবি, শর্ট পাঞ্জাবি, ফতুয়া, শার্ট, লং ড্রেস, শাল ও সাড়ং। হাউসহোল্ড সামগ্রীগুলোর মধ্যে আছে বেড কাভার, কুশন কাভার, পিলো কাভার, শোফা কাভার, সোফাব্যাক, টেবিল ক্লথ, টি কাভার। অন্যান্য সামগ্রীর মধ্যে আছে কোস্টার, নকশিকাঁথা, ওয়াল হেগিং, ওয়াটার ক্যারিয়ার, হট ক্যারিয়ার, চাবির রিং, কি প্যাড, জুয়েলারি বক্স, হেয়ার হোল্ডার, চশমার কাভার, লেডিস পার্স, মেয়েদের জুতা, টি কাভার, ওয়াল ম্যাট, পেন হোল্ডার, টাই, পাশপর্ট হোল্ডারসহ অন্যান্য প্রায় এক শ’টির বেশি আইটেমে ভেষজ রং ব্যবহার করেছে। কুমুদিনী কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রায় দশ বছর আগে শিমুল ফুল, পলাশ ফুল ও কাঠবাদাম ফল, গাছের বাকল থেকে কিছু আকর্ষণীয় রং আবিষ্কার করেছে। প্রতিনিয়ত তারা নিত্য নতুন ভেষজ রং তৈরিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। তছাড়া গ্রীষ্মে যেসব রং চোখে আরাম দেয় সে সব প্রাকৃতিক রং দিয়ে ফ্যাশন হাউসগুলো পোশাক তৈরি করছে। এই ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে মৌসুমী ফুল ও ফলের নির্যাস থেকে তৈরি রং। বাংলাদেশে ভেষজ রং ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দেশীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি বিদেশী ক্রেতাদের জন্য পণ্য তৈরিতে আগ্রহী হচ্ছে।

ছবি : কে ক্র্যাফট