২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছোটদের ডিজিটাল ও স্যাটেলাইট আসক্তি

  • শামীম হাসান

আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে কোন দেশের সংস্কৃতিই ভৌগোলিক সীমারেখা মানে না। ভিসা পাসপোর্ট লাগে না। সহজেই এক দেশের সংস্কৃতি অন্যদেশের সংস্কৃতিতে প্রবেশ করে। অনেক ক্ষেত্রেই হুমকির মধ্যে ফেলে দেয় যে দেশে প্রবেশ করে সেই দেশের নিজস্ব সংস্কৃতিকে। আবার হয়ত অনেক ক্ষেত্রে জীবন মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহায়কও হয়। ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের কল্যাণে আমরা সহজেই অন্যদেশের টিভির অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারি। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। বিরোধিতা করার কিছু নেই। সুযোগও খুব একটা নেই যুগের চাহিদা। কিন্তু অন্যের সংস্কৃতির কারণে যখন আমার সংস্কৃতি হুমকির মুখে পড়ে, অন্যের চাল-চলন, আচার-আচরণ যদি আমার আচার আচরণের ওপর প্রভাব ফেলে, তখন ভাববার কি কিছু নেই?

আগে আমরা শুনেছি মাদকাসক্তি, জুয়া খেলার আসক্তি, নারী আসক্তি, মদ খাওয়ার আসক্তি ইত্যাদি। এখন ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট টিভির কারণে যোগ হয়েছে কিছু নতুন ডিজিটাল আসক্তি। যেমনÑ ফেসবুক আসক্তি, ইন্টারনেট আসক্তি, মোবাইল আসক্তি, ডরিমন আসক্তি এবং ভয়াবহ আসক্তি ইন্ডিয়ান টিভি চ্যানেলের সিরিজ নাটক আসক্তি।

এসব আসক্তির কারণে বই পড়া তো শিকেয় উঠেছে। একটা সময় ছিল যখন বই পড়া, বই দেয়া-নেয়া তরুণ-তরুণীদের মাঝে ফ্যাশন ছিল। আলাপ-আলোচনা, গল্প-গুজবের অনেকাংশে থাকত বইয়ের প্রসঙ্গ। তখন শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্র, নজরুল ছাড়াও বুদ্ধদেব গুহ, সমরেশ মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নীহারঞ্জন গুপ্ত, মৈত্রীয় দেবী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রমুখ উপন্যাসিক এবং কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, পূর্ণেন্দ্রপত্রী প্রমুখের গল্প, উপন্যাস ও কবিতার বইয়ের নাম মুখে মুখে ফিরত, হাতে হাতে শোভা পেত। শঙ্খনীল কারাগার, নন্দিত নরকে উপন্যাসের মাধ্যমে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বিস্ফোরক আবির্ভাব, ইমদাদুল হক মিলন ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখক জাফর ইকবালের বই তো রীতিমতো বই পড়ার জোয়ার সৃষ্টি করে ফেলল। এছাড়া কাজী আনোয়ার হোসেনের সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন থ্রিলার, ওয়েস্টার্ন সিরিজ, গোয়েন্দা কাহিনী, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী এবং বিদেশী বিভিন্ন বিখ্যাত লেখকদের ভাবানুবাদ, রূপান্তর গ্রন্থ এসবেরও বিশাল পাঠকগোষ্ঠী ছিল। তখন বই পড়ার নেশা ছিল। নেশার মধ্যে সবচেয়ে ভাল নেশা এই বই পড়ার নেশা। বই পড়লে নিজের ভেতরে একটা জগত সৃষ্টি হয়। সেই জগত মানুষকে কোন না কোনভাবে সমৃদ্ধ করে। এখন তরুণ-তরুণীরা ব্যস্ত ফেসবুক ও ইউটিউবে। চোখে রঙিন দুনিয়া দেখে। উপভোগ করে। মনোজগতে কোন নতুন জগত সৃষ্টি হয় না। এখন সবাই নিজেকে বন্দী করে রেখেছে ডিজিটাল ও স্যাটেলাইট জগতে।

স্যাটেলাইটের কল্যাণে বর্তমানে আমাদের দেশে প্রতিবেশী দেশসহ দূরের কয়েকটি দেশের অনেক টিভি চ্যানেল চালু আছে। নিয়মিত আমরা সেসব চ্যানেলের অনুষ্ঠানও দেখি। এতে দোষের কিছু নেই। নতুনের প্রতিকার না আকর্ষণ থাকে। নিজেদের ভাল কিছু থাকলেও তা ভাল লাগে না। ভাল লাগে অন্যেরটা। সমস্যা এখানেই। গ্রামে একটা প্রবাদ আছে- ‘পরের বাড়ির পিঠা, খেতে লাগে মিঠা’। যাই হোক অন্যেরটা ভাল লাগে, লাগুক। কিন্তু সেই ভাল লাগা যদি আসক্তিতে পরিণত হয় তখনই সমস্যা।

স্যাটেলাইট টিভির সিরিজ নাটক আসক্তি এখন ঘরে ঘরে। বিশেষ করে এই রোগে গৃহিণীরাই বেশি আসক্ত। সঙ্গে সঙ্গে শিশুরাও। বাংলা ও হিন্দি মাধ্যমের এই চ্যানেলগুলোতে সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিন প্রচারিত হয় অনেকগুলো সিরিজ নাটক। যদি কেউ একবার কোন সিরিজ দেখা শুরু করল, তাহলেই সর্বনাশ হলো। সে সিরিজ দেখা বন্ধ করতে পারবে না। মনে হয় এই সিরিজগুলোতে আফিম জাতীয় কোন নেশার বস্তু মেশানো থাকে। কেউ যদি এরূপ পাঁচ-ছয়টি সিরিজে আসক্ত হয় তবে তার সারাদিনের সিডিউল টাইট ফিট। এখন কথা হলো কেউ অবসর সময়ে নাটক দেখে সময় কাটাল তাতে অসুবিধা কোথায়। অসুবিধা হলো নাটকের বিষয়বস্তুতে, অভিনয়-অভিব্যক্তিতে। কারণ এ নাটকগুলোতে যা দেখায় তা হিংসা-বিদ্বেষে ভরপুর থাকে। নাটকে দেখা যায়, কোন একটা যৌথ পরিবারের সকল সদস্যরা সারাদিন সাজুগুজু করে জমকালো পোশাক পরে থাকে। তাদের বেশির ভাগেরই কাজকর্ম দেখা যায় না। একজন কিভাবে আর একজনকে ক্ষতি করবে সেই চিন্তায় বা ¯œায়ুচাপে থাকে। স্বামী-স্ত্রী, ভাইয়ে-ভাইয়ে, জা’য়ে-জা’য়ে, বোনে-বোনে, প্রতিবেশী, অফিসে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সর্বত্রই কূটনামি-বদনামি এবং ঘায়েল করার প্রচেষ্টায় রত। কেউ অন্যায় করেই যাবে প্রতিকার নেই। সবার সামনে একরূপ, মায়া কান্নায় চোখ দিয়ে পানি পড়ে। কিন্তু ভেতরে অন্য ভয়ঙ্কর চেহারা, যা দর্শকদের ফোকাস করে বিশেষ ভঙ্গিমায় দেখানো হয়। মমতাময়ী মা বা শাশুড়ি হয় ডাইনিতুল্য, বউ হয় একেবারেই অবলা, সর্বংসহা অথবা এর বিপরীত। বাপ-ছেলে বা মা-মেয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে ছেলে মেয়েরা বাবা-মাকে নাম ধরে ডাকে। সবার সামনে অপমান অপদস্থ করে। এমনভাবে কথা বলে যেন বাবা-মায়ের মতো ঘৃণিত দুনিয়াতে আর কেউ নেই। এমনও দেখা গেছে একটি শিশুও মাকে হত্যার চেষ্টা করে। পরগাছা কোন আত্মীয় আবির্ভূত হয়েই সংস্কারের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে। ভাল-মানুষ হঠাৎ ভয়ঙ্কর খারাপ হয়ে যায়। অনেক সিরিজ নাটকে দেখানো হয় বিবাহ পূর্ব সন্তানের জন্ম এবং লিভিং টুগেদার সাধারণ ব্যাপার মাত্র। নাটক সব সময়ই অতি নাটকীয় হয়। বিষয়বস্তু না থাকলেও নাটকের ঘটনাকে রাবারের মতো টেনে লম্বা করা হয়।

আরব্য রজনীর এক হাজার এক রাত্রির মতো। যেখানে দেখা যায় প্রেমে প্রতারিত এক রাজার নিষ্ঠুর কর্মকা-। সে প্রতি রাতে একটি করে কুমারী মেয়ে বিয়ে করে এবং রাত শেষ হলে নববিবাহিতা স্ত্রীকে কতল করে। এভাবে রাজ্যের সকল কুমারী মেয়ে যখন শেষ হলো তখন এলো উজির কন্যার পালা। উজির কন্যা ছিল বিদুষী। রাজার কাছে আবদার করল মৃত্যুর আগে গল্প শুনানোর। রাজা সম্মত হলে সে গল্প বলা শুরু করল। ভোর হয়ে যায় গল্প আর শেষ হয় না। সে ভোরের দিকে গল্পের এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যাতে রাজা শেষ টুকু শোনার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। অগত্যা রাজা তাকে কতল না করে পরের রাতে গল্প শোনার জন্য বাঁচিয়ে রাখে। এভাবে চলে রাতের পর রাত। এক হাজার এক রাত।

আরব্য রজনীর ঐ গল্পের তো একটা উদ্দেশ্য ছিল। পরে রাজা তার ভুল বুঝতে পারে। কিন্তু স্যাটেলাইটের ঐসব নাটক তো উদ্দেশ্যবিহীন। আমাদের দেশেও কত সুন্দর সুন্দর বাস্তবসম্মত নাটক হয়। কিন্তু আমরা সে নাটকে মুখ ফিরিয়ে পরদেশী সিরিজে আসক্ত। এই আসক্তিতে কি পরিবার, সমাজ বা ব্যক্তি জীবনে প্রভাব পড়ছে না। আমরা ঘরে জানালা রাখি যেন মুক্ত আলো-বাতাস অবাধে ঘরে ঢুকতে পারে। জানালা দিয়ে আলো-বাতাসের সঙ্গে কিছু পোকা মাকড়ও ঢুকতে পারে, তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু যদি অবাধে ময়লা-আবর্জনা ঢুকে ঘর নষ্ট করে ফেলে, তাহলে ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজন আছে বৈকি।

ছবি : নাসিফ শুভ

মডেল : ঐশি ও নাবিল