২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পেনশন পাবেন না অবৈধ রাষ্ট্রপতিরা

  • নতুন আইন হচ্ছে, মন্ত্রিসভায় খসড়া অনুমোদন

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ অবৈধ ও অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা দখলকারীদের অবসরভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার পথ বন্ধ করার বিধান রেখে নতুন একটি আইন করতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ‘রাষ্ট্রপতির অবসরভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা আইন, ২০১৫’ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। এছাড়া মন্ত্রিসভা বাংলাদেশ মুদ্রা আইন সংশোধনেরও অনুমোদন দিয়েছে। এতে পাঁচ টাকার মুদ্রা (কয়েন ও নোট) ইস্যু করার কর্তৃত্ব পাচ্ছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবর্তে অর্থ বিভাগ এ মুদ্রা ইস্যু করবে।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পর অবসরভাতা, আনুতোষিক বা অন্যান্য সুবিধার বিষয়টি নির্ধারিত হয় ১৯৭৯ সালের ‘প্রেসিডেন্টস পেনশন অর্ডিনেন্স’ অনুযায়ী। ১৯৮৮ সালে অধ্যাদেশটি একবার সংশোধন করা হয়েছিল।

সামরিক শাসনামলের জারি করা প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর ‘রাষ্ট্রপতির অবসরভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা আইন’ এর খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করে। সে সময় মন্ত্রিসভার দেয়া ‘অনুশাসন’ অনুযায়ী নতুন করে খসড়া প্রস্তুত করে সোমবার বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।

তিনি বলেন, অধ্যাদেশে শুধু ছিলÑ যদি কোন রাষ্ট্রপতি নৈতিক স্খলন বা অন্য কোন অপরাধে আদালতে দ-িত হন তাহলে তিনি অবসরভাতা পাবেন না। নতুন আইনে এর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে- ‘অসাংবিধানিক পন্থায় অবৈধ উপায়ে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন বা হয়েছিলেন মর্মে আদালত কর্তৃক ঘোষণা হলে তিনি অবসরভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন না।

২০১০ সালে সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের এক রায়ে বলা হয়, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম এবং জিয়াউর রহমানের মতো এইচএম এরশাদও অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী। পরের বছর আপিল বিভাগেও ওই রায় বহাল থাকে; আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করা হয়।

আইন সংশোধনের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মূল অধ্যাদেশে বলা ছিল বেতনের ৭৫ শতাংশ হারে মাসিক পেনশন পাবেন রাষ্ট্রপতি। তখন রাষ্ট্রপতির বেতন ছিল ১০ হাজার টাকা। সেই হিসেবে রাষ্ট্রপতির পেনশন কমপক্ষে হবে সাত হাজার ৫শ’ টাকা। এখন আইনে আর এটির প্রয়োজন নেই। কারণ, এখন রাষ্ট্রপতির বেতন ৬১ হাজার ২শ’ টাকা। আর অবসরভাতা ৪৫ হাজার ৯শ’ টাকা। কাজেই অনাবশ্যক বিষয়টি বাদ দেয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি যে কয় বছর দায়িত্ব পালন করেছেন তার সেই পরিমাণকে বছর দিয়ে গুণ করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আট বছর ধরা হয়। তবে কেউ যদি আট বছরেরও বেশি দায়িত্ব পালন করেন, তাও আট দিয়ে গুণ করেই পেনশনভাতা ও আনুতোষিক পেতেন। মন্ত্রিপরিষদ মনে করে, এটি থাকার দরকার নেই। তাই আইন সংশোধন করে যে সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন সে সময়েরই অবসরভাতা ও আনুতোষিক পাবেন। এছাড়া দেশ স্বাধীনের পর থেকে যারা রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, তারা সবাই অবসরভাতা ও আনুতোষিক পাবেন। মন্ত্রিসভার নির্দেশনা অনুযায়ী আইনে এটি করা হয়েছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। ১৫ আগস্ট থেকে ৬ নবেম্বর পর্যন্ত অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

ওই বছরই ৩ ও ৬ নবেম্বর সামরিক অভ্যুত্থানের পর বিচাপতি সায়েমকে দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

১৯৭৬ সালের ২৯ নবেম্বর তিনি জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন এবং ১৯৭৭ এর ২১ এপ্রিল স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ওইদিনই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন জিয়া। অবশ্য তার আগে ৩০ মে জিয়ার সামরিক শাসনকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টায় একটি গণভোটের আয়োজন করা হয়, যাতে ৯৮.৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে।

পরে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন নির্বাচন দিয়ে রাষ্ট্রপতি হন জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। জিয়ার মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল এইচএম এরশাদ। তার ক্ষমতা দখলের ধরন ছিল জিয়ার মতোই।

সামরিক প্রশাসক হিসেবে দেশ শাসন শুরু করে তিনিও জিয়ার মতো গণভোটের মাধ্যমে নিজের কর্তৃত্বকে বৈধ রূপ দেয়ার চেষ্টা করেন। ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ ওই গণভোটে তিনি পান ৯৪.৫ শতাংশ ভোট। পরে ১৯৮৬ সালে এরশাদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দেন এবং নির্বাচিত হন। ৯ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। অবসরভাতার এ আইন এরশাদ বা জিয়া কিংবা তাদের উত্তরাধিকারদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, তারা রাষ্ট্রপতি হিসেবে অবসরভাতা নেন না। তারা সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ভাতা নিয়ে থাকেন। আরেক প্রশ্নের জবাবে মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার কখনও পেনশন নেয়নি। আইন অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারীরা তা পাবেন। নিবেন কি না সেটা ভিন্ন কথা।

মুদ্রা আইন

পাঁচ টাকার মুদ্রা (কয়েন ও নোট) ইস্যু করার কর্তৃত্ব পাচ্ছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবর্তে অর্থ বিভাগ এ মুদ্রা ইস্যু করবে। এ লক্ষ্যে সোমবার মুদ্রা আইন (সংশোধন) ২০১৫ (‘দ্য বাংলাদেশ কয়েনেজ (এ্যামেন্ডমেন্ট) এ্যাক্ট, ২০১৫) এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বর্তমান আইন অনুযায়ী দুই টাকা পর্যন্ত মুদ্রা ইস্যু করে সরকার। আর এর উপরের সকল মুদ্রা ইস্যু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির পর সরকারের ইস্যুকৃত মুদ্রা ছিল মোট মুদ্রার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, এখন হার কমতে কমতে গত নবেম্ব^রে এসে শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ হয়েছে। এটা অনেক কম।

তিনি বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সরকার ইস্যু করা মুদ্রার হার এক দশমিক ৩৬ শতাংশ। নতুন আইন কার্যকর হলে সরকার ৫ টাকার মুদ্রা ইস্যু করবে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের ইস্যু করা ৫ টাকার মুদ্রা বাজার থেকে যখন উঠে যাবে তখন সরকারের মুদ্রা ইস্যুর হার হবে এক দশমিক ৫ শতাংশ।

১৯৮৯ সালের অধ্যাদেশে বলা আছে দুই টাকা, এক টাকা, পঞ্চাশ পয়সা, ২৫ পয়সা, ১০ পয়সা, এক পয়সা সরকার ইস্যু করবে।

তিনি বলেন, সরকার ৫ টাকার মুদ্রা ইস্যু শুরু করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫ টাকার নোট পাশাপাশি চলবে এবং আস্তে আস্তে তা তুলে নেয়া হবে। এর ফলে কোন মুদ্রাস্ফীতি হবে না জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘কারণ মোট কারেন্সির পরিমাণ যেটা সেটা বাড়বে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের যে পরিমাণ টাকা বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়া হবে সে পরিমাণ টাকা সরকার ইস্যু করবে। এতে সরকার একটি ছোট সুবিধা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সরকারের যে ৭৯০ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে তা পর্যায়ক্রমে হ্রাস পাবে’ বলেন তিনি। সরকার ২ টাকার মুদ্রা তুলে নেয়ার কোন সিদ্ধান্ত নেননি জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, তবে চাহিদা থাকায় অনেক মুদ্রা সরবরাহ থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, ‘মুদ্রা ইস্যু নিয়ে বর্তমানে ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ কয়েনেজ অর্ডার বহাল আছে, এটি ১৯৮৯ সালে সংশোধন হয়েছে।’